দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিকতাবাদ: একটি ধারণাগত বিশ্লেষণ*

Spread the love

দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিকতাবাদ দুটো ধারনাই একই সাথে সাম্প্রতিক এবং প্রাচীন। ফলে একজন বিশ্লেষক দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিকতাবাদকে রাজনৈতিকসহ অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, মনস্তত্ত্বিক এবং সভ্যতার আলোকে আলোচনা করতে পারেন। মোটের উপর মানুষ বহুমাত্রিক প্রাণি এবং সভ্যতার নিরিখে বলতে গেলে দক্ষিণ এশিয়রা বহু-প্রাজ্ঞ থাকতে চেয়েছে, যদিও কি তাদের এক বা বহু-বিভক্ত করেছে তা ভুলিয়ে দিয়ে উপনিবেশবাদ ও আধুনিকতা বা ঔপনিবেশিক আধুনিকতা তাদের এই প্রচেষ্টাকে কিছুটা অসাড় করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বড়জোর উত্তর-রাষ্ট্রবাদী (post-statist) বা দক্ষিণ এশিয়দের জীবন-জীবিকার উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রবাদী (statist) উপলব্ধিকে সম্পূরণ করার বিষয়টি তাত্ত্বিক এবং পদ্ধতিগত। দক্ষিণ এশিয়দের রাজনৈতিক সত্ত্বা (homo politicus) বিবেচনা করলে এই অঞ্চলে আঞ্চলিকতাবাদ সম্ভাবনাময় নাও মনে হতে পারে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়দের সাংস্কৃতিক (homo cultaricus) বা মনস্তাত্ত্বিক (homo psycholigicus) সত্ত্বা বিবেচনা করলে এই অঞ্চলে আঞ্চলিকতাবাদের সম্ভাবনা ভিন্ন মনে হতে পারে। এক্ষেত্রেই দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিকতাবাদের নূতন ধারার সম্ভাবনা নিহিত আছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিকতাবাদ একই সাথে একটি প্রয়াস (effort) এবং একটি ধারনা (idea)আঞ্চলিকতাবাদ’ ধারণাটি ‘দক্ষিণ এশিয়া’ ধারণার সাথে জড়িয়ে রয়েছে, যদিও কোনটিই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। অথবা, একটু ভিন্নভাবে বললে একটি ব্যতিরেখে অন্যটিকে অধিগত করা যায় না। এখানে আমি এই জোটবদ্ধতাকে ধারণায়ন এবং সম্ভাব্য ও অর্জনযোগ্য বিষয়সমূহের উপর আলোকপাতের চেষ্টা করব। ‘দক্ষিণ এশিয়া’ ধারণাটি একই সাথে সাম্প্রতিক এবং প্রাচীন। আমরা যদি আমাদের শুধু ‘দক্ষিণ এশিয়া’ পদটিতে সীমাবদ্ধ রাখি তাহলে এই ধারণাটি নূতন।  তখন এটি শীতলযুদ্ধ এবং পৃথিবীকে বিভিন্ন আঞ্চলিক দলভুক্ত করার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সীমা পেরোবে না। কিন্তু যদি আমরা এই ধারণা বিস্তৃত করি, যেখানে এই অঞ্চল গঠনকারী মানুষ ও বস্তুসমূহ অর্ন্তভুক্ত থাকবে তাহলে ‘দক্ষিণ এশিয়া’ ধারণাটি বেশ পুরানো। পূর্বতন ধারণাটি অধিকতর ভূগৌলিক ও রাজনৈতিক, অপরপক্ষে পরবর্তী ধারণাটি সভ্যতা-কেন্দ্রিক ও ঐতিহাসিক। এই দুইয়ের বিজড়ন দক্ষিণ এশিয়ায় বহুমাত্রিক আঞ্চলিকতাবাদকে স্বিকৃতি দিয়েছে। যাহোক, আমি শুধু পাঁচটি মাত্রার মধ্যে আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখবো।

প্রথমত, অশোকীয়। অশোক বর্ধন বা ‘মহান অশোক’ স্বরণ করলেই আমাদের কল্পণায় দক্ষিণ এশিয়ার একটি চমকপ্রদ ধারণা উঁকি দেয়। এর দুটি দিক রয়েছে।

প্রথমটি হচ্ছে ‘দর্শানা’ (দর্শন) যা অশোক খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে চর্চা করেছিলেন। তাঁর জীবনকালে সারা ভারত বর্ষে ছড়িয়ে থাকা শিলালিপি থেকে আমরা তাঁর সম্পর্কে সবচয়ে ভালভাবে জানতে পারি। কলিঙ্গের যুদ্ধের বিভিষিকার পর, অশোক বিজয়ের পন্থা হিসেবে যুদ্ধ পরিত্যাগ করেছিলেন এবং মৌর্য সাম্যাজ্যের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি হিসেবে অহিংসা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে গ্রহন করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, অশোকের সময়ে আমরাপ্রাচীন নীতি ‘দ্বিগবিজয়া’ (যুদ্ধের মাধ্যমে দখল) এর বর্জন এবং কর্তব্যনিষ্ঠার নীতির মাধ্যমে জয়ের নূতন নীতি গ্রহন দেখতে পায়। মজার বিষয়, কলকাতায় ৩০ নভেম্বর ১৯৫৫ সালে বুলগানিন ও ক্রুশ্চেভের সামনে যখস নেহেরু ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন তিনি এই নীতির কথা উল্লেখ করেছিলেন:

ভারতে, আমাদের জন্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কোন নূতন ধারণা নয়। এটা আমাদের জীবনজাপনের পন্থা এবং আমাদের চিন্তা ও সংস্কৃতির মতই প্রাচীন। প্রায় ২২০০ বছর আগে, ভারতে একজন মহান সন্তান, অশোক এটা ঘোষণা করেছিলেন এবং তা পাথর ও শিলার গায়ে খোদাই করে দিয়েছিলেন, যা এখনো আমাদের তাঁর বর্তা স্বরণ করিয়ে দেয়। অশোক আমাএর বলেছিলেন যে, আমাদের অন্যদের বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করা উচিত এবং একজন ব্যক্তি যে নিজের বিশ্বাসের প্রসংশা করে কিন্তু অন্যের বিশ্বাসের নিন্দা করে, সে পক্ষান্তরে নিজের বিশ্বাসকে আহত করে। এটা সহনশীলতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সহযোগিতার পাঠ যা ভারত বহুকাল ধরে বিশ্বাস করছে। পূর্বে আমরা ধর্ম ও দর্শনের কথা বলতাম, এখন আমরা অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার কথা বেশি বলছি। কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পূর্বের মত একই আছে।[i]

এটি একটি উত্তরাধিকার যা এখনো দক্ষিণ এশিয়া ধারণাকে প্রভাবিত করছে। যাহোক, অশোক সম্পর্কিত দ্বিতীয় মাত্রাটি আরো অধিক চমকপ্রদ এবং প্রায় প্রথমটির বিপরীত। এটি ছত্রিশ বা সায়ত্রিশ বছর যাবত শাসন করা একজন ব্যক্তির বিষয়ে শত শত বছরের নীরবতাকে নির্দেশ করে, যেমনটি চার্লস অ্যালেন উল্লেখ করেছেন,

ব্রাহ্ম ইতিহাস মতে এই অশোক গুরুত্বপূর্ণ নয়। পুরানের সঙ্কলকগণ অশোককে কেন ‘মহান’ অভিহিত কর উচিত তার কোন ব্যাখ্যা দেন নি। এমনকি অশোকের পরের মৌর্য সম্রাটদের সম্পর্কেও তারা নীরব। প্রকৃতপক্ষে, অশোকের পর মাগধার সিংহাসনে কে আরোহণ করেছিলেন এই বিষয়ে পুরান সঙ্কলকগণ একমত হতে পারেন নি…[ii]

এটা লক্ষ্য করা খুব সহজ যে ব্রাহ্ম ইতিহাস অশোকের চিন্তার বা জনসমক্ষে প্রচারিত তাঁর জ্ঞান তথা বুদ্ধধর্মের বিস্তৃতির ব্যাপারে অনুৎসাহি ছিলেন। এই ইতিহাস শুধু ‘অতীত’ নয় বরং অতীতের একটি অনুসন্ধান এবং এই অনুসন্ধানটি যদি কারো নির্দেশে হয়, তবে তা অতীতের অস্বস্তিকর দিকটির ব্যাপারে নীরব থাকবে, যা বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ প্রায়ই ভুলে যান! এই নীরবতা পালন আমাদের অতীতকে শুধু ভুতুড়েই করেনি, এটি আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশেও পরিণত হয়েছেএই অঞ্চলে এই রকম উদাহরণ ভুরিভুরি রয়েছে, যেমন- ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগকালীন গণহত্যা, ১৯৭১ এর গনহত্যা; দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রে নৃশংস হত্যাকান্ড যেমন- দখলদার বাহিনী কর্তৃক আফগানিস্তানে সংঘটিত হত্যাকান্ড, শ্রীলঙ্কায় তামিল টাইগারদের হত্যাকান্ড, পাকিস্তানে বেলুচিস্তান ও FATA প্রদেশে সংঘটিত আক্রমণ এবং ভারতে কাশ্মির ও মাওবাদীদের সাথে চলমান সংঘাত। এসব ঘটনা তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্রের সরকারি ইতিহাসে স্থান পায় নি।  নীরবতাও তাহলে দক্ষিণ এশিয়া ধারণার সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।

দ্বিতীয়ত, কৌটিল্যিয়। এর মাধ্যমে চাণক্য কৌটিল্যের প্রজ্ঞাকে নির্দেশ করা হয়, যা তার বই ‘অর্থসাস্ত্রে’ বিধৃত হয়েছে। কৌটিল্য তার নামের স্বীকৃতি পেয়েছেন ‘কুটিল’ (অসৎ) থেকে, যা আবার ‘diplomacy’ বা বহি:সম্পর্কের ঘটনাচক্রে ভুল অনুদিত সংস্কৃত শব্দ ‘কূটনীতি’র সঙ্গে সম্পর্কিত। তাছাড়া বাংলা ভাষায় প্রচলিত শব্দ ‘কূটলামি’র সাথে এর মিল পাওয়া যায়, যার অর্থ অসততা। অভিযোগ করা হয় যে কৌটিল্য ‘অসৎ’ বা ‘অনৈতিক’ পন্থা বাতলে দেওয়ার মাধ্যমে উত্তর-পূর্ব ভারতের ক্ষুদ্র মৌর্য্য রাজ্যকে প্রাচীন ভারতের অন্যতম বৃহৎ রাজ্যে পরিণত করতে সাহায্য করছিলেন।  তিনি ‘মন্ডল’ ( রাজ্যের বৃত্ত) তত্ত্ব উদ্ভাবনের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। এই তত্ত্ব মতে ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’। আধুনিক ভারতের নিকট প্রতিবেশীদের (চীন ও পাকিস্তান) সাথে অবন্ধু সুলভ সম্পর্ক এবং দূরবর্তী প্রতিবেশীদের (রাশিয়া ও আফগানিস্তান) সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আলোকে অশোক কাপুর দেখিয়েছেন কিভাবে নেহেরু কৌটিল্যের ‘রাজ্যের বৃত্ত’ ধারণার সাথে মিল রেখে পররাষ্ট্র কৌশল ঠিক করেছিলেন।[iii] একজন সিনিয়র ভারতীয় কূটনীতিক কে পি এস মেননের ১৯৪৭ সালে করা উক্তিটিও প্রায় অভিন্ন, তার মতে “কৌটিল্যের বাস্তববাদ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আমাদের আদর্শবাদের একটি উপকারি সংশোধনকারী”।[iv] আসলে এই ‘অসৎ’ বাস্তববাদ দক্ষিণ এশিয়া ধারণাটিকে এমনভাবে সংক্রমণ করেছে যে যখন পাকিস্তান পুরাতন সাম্রাজ্যিক প্রভু ইংল্যান্ডের সাথে ক্রিকেট খেলে তখন সকল ভারতীয়ই পুরাতন সাম্রাজ্যিক প্রভু ইংল্যান্ডকে সমর্থন করে এবং বিপরীত পক্ষে যখন ভারত-ইংল্যান্ড ক্রিকেট খেলে তখন পাকিস্তানিরাও প্রতিবেশীর পরিবর্তে উল্লাসের সাথে পুরাতন সাম্রাজ্যিক প্রভুকে সমর্থন জানায়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। পৃথিবীর বুকে আপনি এরকম অঞ্চল আর কোথাও খুঁজে পাবেন? সামুদয়িক হওয়া সত্ত্বেও যা অনন্য।

তৃতীয়ত, মোঘল। ইতিমধ্যেই ৫০০ বছেরর মুঘল শাসনকালে মোঘলদের অবদানকে প্রচ্ছন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। এখন মোঘলদের অবদানের স্বকৃতি প্রায়ই মমতাজের প্রতি শাহজাহানের ভালবাসা এবং মমতাজের সমাধি ক্ষেত্র তাজমহলের মধ্যে সীমাবদ্দ রয়েছে। কিন্তু তারপরও মোঘলদের লালন করা কিছু বিষয় ‘দক্ষিণ এশিয়া’ ধারণার উপর প্রভাব ফেলে চলেছেএই ধরনের একটি বিষয় হচ্ছে ’বিরিয়ানি’। ফার্সি শব্দ ‘বিরয়া’ (ভাজা, সেঁকা) থেকে এই শব্দের উৎপত্তি, যা প্রধানত সুভোজনীয়। এটি চাল, মাংস, ডিম, আলু এমনকি এক বা দুই রকমের ফলমূল সমৃদ্ধ এবং যা বিশেষ যত্নে বিভিন্ন মসলা দিয়ে দক্ষ বাবুর্চির তত্ত্বাবধানে রান্না করা হয়। কারো কারো মতে ইরানের ভ্রমনকারী ও ব্যবসায়ীরা ভারতে এই খাবার প্রচলন করেছিলেন।[v]এখন গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেইনানা ধরনের বিরিয়ানি পাওয়া যায়, যা বিভিন্ন স্থান বা বাবুর্চির নামে পরিচিত, যেমন- হাইদ্রাবাদি বিরিয়ানি, ভাটকালি বিরিয়ানি, কাচ্চি বিরিয়ানি, লৌখ্ন বিরিয়ানি, ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি, হাজী বিরিয়ানি ইত্যাদি। এটি এখন ভারতীয় তথা দক্ষিণ এশিয় রন্ধন প্রণালীর অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, আমরা যদি আকবরের ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’ (ঐশী বিশ্বাস) গ্রন্থের দিকে দৃষ্টি ফেরায় তবে সহজেই বিরিয়ানি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রথার মিশেলের প্রতি আকবরের আকর্ষণ দেখতে পাব। আকবরের চালু করা ‘তারিখ-ই-ইলাহী’র (প্রভুর দিনপঞ্জি) ক্ষেত্রেও একই বিষয় লক্ষ করা যায় যা পরবর্তীতে দৈবাৎ বাংলা সন ও পহেলা বৈশাখের জন্ম দিয়েছিল।[vi] প্রকৃতপক্ষে বিরিয়ানি ‘দক্ষিণ এশিয়া ‘ ধারণার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে এবং ভোজনবিদ্যার সীমানা উৎরে গিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে পররাষ্ট্রনীতি প্রনয়ণের ক্ষেত্রে ‘বিরিয়ানি’ দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলা যায়, যা অন্য রাষ্ট্রে সাথে সমঝোতার সময়- রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ঐতিহাসিক, নিরাপত্তা, পরিবেশ, এমনকি সাংস্কৃতিক উপাদান সমূহের অন্তর্ভুক্তি নির্দেশ করে। এর ভাল উদাহরণ হিসেবে জানুআরি ২০১০ সালে শেখ হাসিনার ভারত সফর কালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যেস স্বাক্ষরিত ৫০-অনুচ্ছেদ বিশিষ্ট যৌথ ঘেষণা পত্রের কথা উল্লেখ করা যায়। এই যৌথ ঘোষণায় ১৯৭৪ সালের স্থলসীমা চুক্তি, বিদু্যত সরবরাহ, ট্রানজিট, টিপাই মুখ বাঁধের পরিবেশগত প্রভাব, সন্ত্রাস দমন থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকি পালন- কোন বিষয়ই বাদ যায়নি। কিন্তু যেমন একটি উপাদানের অভাবে গোটা বিরিয়ানির স্বাদ নষ্ট হতে পারে,তেমন এখন মমতার অনুপস্থিতি হাসিনা-মনমোহনের বিরিয়ানিকে দৃশ্যত বিস্বাদ করে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ‘বিরিয়ানি’ দৃষ্টভঙ্গির প্রতি এই আসক্তির কারণেই দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রসমূহের মধ্যকার দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক প্রায়ই অচল হয়ে পরে।

চতুর্থত, গান্ধীয়। এটি লক্ষ্য ও পন্থা উভয়কে ঠিক রেখে বিভিন্ন মতের মধ্যে সামঞ্জস্যবিধানের গান্ধীর দর্শনকে নির্দেশ করে। ঊপনিষদের বাণী‘ইকো সাত ভিপ্রা বহুদা ভানডানতে’ অর্থাৎ যার অস্তিত্ব আছে তা এক- এর সূত্র ধরে গান্ধী ভগবত গীতার নতুন পুনর্গঠন ও ব্যাখ্যায় সফল হয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, প্রচলিত সামাজিক প্রেক্ষাপটে যেখানে বুদ্ধ ধর্মমতের পতন এবং নব্য-ব্রাহ্মবাদের উত্তান হচ্ছিল সেসময়ে ভগবত গীতার লেখক দৈপায়ন বেদব্যাস অনুভব করতে পেরেছিলেন যে বিভিন্ন চিন্তা ধারার ( বৈদিক ব্রাহ্মবাদ, ঊপনিশদিয় অদ্বৈতবাদ, শঙ্ক দ্বৈতবাদ, যোগশাস্ত্র, ভগবত আস্তিক্যবাদ)  সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে প্রাচীন বুদ্ধ ধর্মীয় ব্রাহ্মবাদ বিরোধী মতবাদকে সমাজ থেকে উপড়ে ফেলা যাবে এবং সমান্তরালভাবে নব্য-ব্রাহ্মবাদকেও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে। সামঞ্জস্যবিধানের এই দর্শনের প্রতি গান্ধী সারা জীবন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। একটি সার্বজনীন লক্ষ অর্জনের জন্য আপাত বৈরী সামাজিক শক্তিগুলোকে ধৈর্য্যের সাথে গ্রহণ করার বিষয়টি গান্ধী বেদব্যাসের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম।

কিন্তু এখানে দুই বা তিনটি ভিন্ন মতবাদের একটি সারগ্রাহী মিশেল থেকে দূরে সরে গিয়ে এটি গীতার আওতার মধ্যেই একটি নবধারার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে। গান্ধীর যুক্তি বিন্যাস এভাবে অগ্রসর হচ্ছে: সামঞ্জস্যবিধান যতটা সংঘাত বিহীন পরিস্থিতি নির্দেশ করে, একটি সংঘাতময় সম্পর্কের আশ্রয় অবলম্বন নিশ্চিতভাবে নিজেই ততটা সামঞ্জস্যবিধানের কাজে ব্যঘাত সৃষ্টি করে। সুতরাং গীতায় উল্লেখিত ন্যায় যুদ্ধের যুক্তি অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে এবং যেহেতু অহিংসা সামঞ্জস্যবিধানের প্রাকৃতিক ও যুক্তিযুক্ত উপায়, সেটাকে অহিংসা চর্চার মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে, গীতার নতুনতর ব্যাখ্যার মাধ্যমে গান্ধী এই বিশ্বাসে উপনীত হয়েছিলেন যে শুধু সামঞ্জস্যবিধানের অহিংস নীতি অবলম্বন করার মাধ্যমেই ‘স্বরাজ’ ও ‘রামরাজ্য’র প্রচারাভিযানে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বিভিন্ন আপাত বৈরী সামাজিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করার আশা করতে পারে।

তাঁর প্রতিপক্ষ, বিশেষত হিন্দু মৌলবাদীদের অসন্তোষ সত্ত্বেও গান্ধী সারা জীবন এই নীতি অনুসরণ করেন। একবার গুজরাটের এক হিন্দু প্রধান এলাকায় আধুনিক সময়ে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা অসম্ভব মনে করা একদল শ্রোতা গান্ধীকে রামরাজ্যের উদাহরণ দিতে বলেন। গান্ধী সবাইতে চমকে দিয়ে আধুনিক সময়ে রামরাজ্যের অস্থিত্ব আছে দাবি করেন এবং তিনি হযরত আবু বকর ও হযরত ওমরের (চার খলিফার প্রথম দুই জন)  সময়কালকে রামরাজ্যের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।[vii] দিপেশ চক্রবর্তী গান্ধী সম্পর্কে সঠিকভাবে বলেছেন, ‘তিনি হচ্ছেন বিরোধিতার ভদ্র ওস্তাদ’।[viii] তিনি শুধু কারাগারে শ্রমিক হিসেবে একজোড়া চটি তৈরী এবং তা জেনারেল স্মুটস কে উপহার দিয়ে দমে যান নি, তিনি রবীন্দ্রণাথ ঠাকুরকে  প্রকাশ্যে তাঁর মতামতের বিরোধিতা করা উচিত বলে উল্লেখ করেন। এর আগে ১৯৩৪ সালে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্পকে গান্ধী ‘অস্পৃশ্যের পাপে ঐশী শাস্তি’ বললে রবীন্দ্রনাথ তখন এর বিরোধিতা করেন।[ix] আবার যখন ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট গোটা জাতি ভারতের স্বাধীনতা উদযাপনে জাতীয় পতাকা উত্তলন করছিল গান্ধী তখন এই গনঘাতি বিভাজনের প্রাক্কালে এটি তাঁর চাওয়া ‘স্বরাজ’ নয় বলে বিলাপ করছিলেন এবং তাঁর আশ্রমে ভারতে জাতীয় পতাকা উত্তলনে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। গান্ধীর লালন করা  বৈরী শক্তিসমূহের সামঞ্জস্যবিধান বা বিশৃঙ্খল সামঞ্জস্যবিধান, সরল বা এককভাবে ইতিহাসের অনুধাবন সমর্থনকারী, যার মধ্যে আধুনিকতাবাদী এ মৌলবাদী উভয়ই রয়েছেন, তাদের বিপরীতে দক্ষিণ এশিয়া ধারণাকে প্রভাবিত করেছে। প্রকৃতপক্ষে, গান্ধী দক্ষিণ এশিয়ার জন্য উত্তর-আধূনিক চিন্তনের দ্বার খোলা রেখেছিলেন।

শেষত, ঔপনিবেশিক না পশ্চিমা। ‘এটা ছিল সবচেয়ে নির্দয় আঘাত’ ব্রুটাসের সিজারকে করা আঘাত সম্পর্কিত অ্যান্থনির এই উক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সভ্যকরণ বা কিপলিং এর ভাষায় ‘শ্বেতাঙ্গদের দায়’ প্রকল্পের নিকট পরবর্তী অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অন্যদিকে এই ‘সবচেয়ে নির্দয় আঘাত’র মাত্রাগত আধিক্য দক্ষিণ এশিয়ায় চালানো ঔপনিবেশিক দীর্ঘ্য মেয়াদি (বাংলায় ১৯০ বছর এবং ভারতে অন্য অংশে মাত্র ৯০ বছর) জুলুমের ফল নয়, দক্ষিন এশিয়াকে সম্মোহিত রাখতে ঔপনিবেশিক শক্তির প্রয়োজনীয় সামর্থের বহি:প্রকাশ, এত নৃশংসতা সত্ত্বেও যা এখনো চলছে। ১৯১৬ সালে এই অঞ্চলে ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার প্রভাব বুঝাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক বিচক্ষণ মূল্যায়ন উপস্থাপন করেছিলেন:

Before the Nation came to rule over us we had other governments which were foreign, and these, like all governments, had some element of the machine in them. But the difference between them and the government by the Nation is like the difference between the hand loom and the power loom. In the products of the hand loom the magic of man’s living fingers finds its expression, and its hum harmonizes with the music of life. But the power loom is relentlessly lifeless and accurate and monotonous in its production….

I am not against one nation in particular, but against the general idea of all nations. What is the Nation?

It is the aspect of a whole people as an organized power. This organization incessantly keeps up the insistence of the population on becoming strong and efficient. But this strenuous effort after strength and efficiency drains man’s energy from his higher nature where he is self-sacrificing and creative. For thereby man’s power of sacrifice is diverted from his ultimate object, which is moral, to the maintenance of this organization, which is mechanical….

Nationalism is a great menace. It is the particular thing which for years has been at the bottom of India’s troubles.[x]

জাতি ও জাতীয়তাবাদের ধারণা দক্ষিন এশিয়াকে এতটাই সংক্রমিত করেছে যে এটা শুধু নিজেকে ধর্ম-কেন্দ্রীক সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বিভক্তই করেনি, বরং এর কয়েক মিলিয়ন অধিবাসীকে জোরপূর্বক ছিন্নমূল ও বাস্তুচ্যুতও করেছে।  অন্যদিক থেকে মানুষের উপর দিয়ে যাওয়া অবিশ্বাস ও শত্রুতা দক্ষিণ এশিয়া ধারণার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।  এদিক থেকে দক্ষিণ এশিয়া বিগত বছরের বিভেদকারী ও হিংস্র ইউরোপ থেকে ভিন্ন। এখন পর্যন্ত পশ্চিম বিশেষ করে ভূতপূর্ব ঔপনিবেশিক শক্তি- ইউরোপ উত্তর-ঔপনিবেশিক বা জাতীয় রাষ্ট্রবাদী দক্ষিণ এশিয়াকে সম্মোহিত করে চলেছে। প্রকৃতপক্ষে, জাতিরাষ্ট্রের সাথে যুক্ত নীতি প্রনয়ণকারী, অ্যাকাডেমেশিয়ান ও রাজনীতিবিদরা সংশ্লিস্ট পক্ষসমূহকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বর্তমান অবস্থা ও সার্কের ভবিষ্যতের মধ্যকার সমরূপতাসমূহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। যদি ‘দক্ষিণ এশিয়া’ ধারণা এর মধ্যে আটকে যায়, এটি আঞ্চলিকতাবাদের ধারণাকেও বিকৃত করবে।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে পথনির্দেশ নিয়ে সার্ক প্রথম কয়েক বছরের ইতস্তত কালক্ষেপন ও কৌশলগত সহযোগিতার পর অর্থনৈতিকভাবে সংহত হলে অন্যান্য বিরোধগুলোও চুকে যাবে, এই বিশ্বাস নিয়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতায় সহমত হয়। প্রায় তিন দশক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পর সার্কের আন্ত:আঞ্চলিক বাণিজ্য ১৯৮০’র দশকের শতকরা ৩.২ ভাগ থেকে ২০০৯ সালে শতকরা ৫.৮ ভাগে উন্নিত হয়। যা পরিষ্কারভাবেই প্রতিশ্রুত ফলাফল নয়। এই ক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে অনূসরণ সর্বোত্তম পন্থা হবে না।  ইউরোপের মত দক্ষিণ এশিয়দের কিছু কৌশলগত পণ্য যেমন- কয়লা ও স্টিলে সহযোগিতার প্রয়োজন নেই এবং ইউরোপিয়ানদের ন্যায় দক্ষিণ এশিয়রা তাদের জীবন ও জীবিকাকে homo economicus বা অর্থনৈতিক সত্ত্বার দিক থেকে দেখতেও তৎপর নয়। এই কারণেই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য ‘বৈশ্য’ নামের একটি বর্ণ বা সম্প্রদায় আছে! এই ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের সভ্যতাগত ও ঐতিহাসিক পাঠ দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিকতাবাদ নিয়ে নূতন চিন্তনে সহায়ক হতে পারে।

একবিংশ শতাব্দির চ্যালেঞ্জ ও সুযোগসমূহ মোকাবেলা করতে একটি নব-সূচনা করতে হবে এবং এই ক্ষেত্রে সার্ক সনদ পূর্ণমূল্যায়ন করা যেতে পারে। ১৯৮৫ সালে যখন সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, রাষ্ট্রসমূহ আস্থার অভাব ও পারষ্পরিক সন্দেহের কারণে সার্ক সনদে দুইটি ‘নিশ্চয়তা’ সূচক ধারা অন্তর্ভুক্তকরণ জরুরি মনে করেছিল। প্রথমত, সকল সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করতে হবে।  অর্থাৎ, জাতীয় গণতান্ত্রিক চর্চার মত কোন সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ (majoritarianism ), এমনকি কোন বিষয়ে আট রাষ্ট্রের মধ্যে সাতটি সমর্থন করলেও তা সার্কের কর্মকান্ডে গ্রহণযোগ্য না। দ্বিতীয়ত, এই আঞ্চলিক ফোরামে কোন দ্বি-পাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যাবে না। একটি নূতন ও স্পর্শকাতর বিষয়ের শুরুতে তার কারণ বোধগম্য। কিন্তু এটা বোধগম্য নয় এবং কিছুটা অগ্রহণযোগ্য যে সার্ক প্রতিষ্ঠার ২৫ বছর পরেও এই শর্ত কেন এখন পর্যন্ত বিদ্যমান ও অক্ষত এবং এই ধরনের ধারা রদ করতে কোন নির্দিষ্ট সময় সার্ক সনদে উল্লেখ নেই।  আজকের বিশ্বায়ন ও সংযোগের এই সময়ে এই দুই শর্তই স্ব-পরাজিত না হলেও অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, যুক্তিসঙ্গতভাবেই মালদ্বিপের সাবেক রাষ্ট্রপতি মহাম্মদ নাশিদ এপ্রিল ২০১০ সালের থিম্পুতে অনুষ্ঠিত ১৬তম সার্ক সম্মেলনে সার্কের অগ্রগতির অন্তরায় হিসেবে ভারত ও পাকিস্তানের দিকে আঙ্গুল তুলেন। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘাতময় সম্পর্ক কিভাবে ‘দ্বি-পাক্ষিক’ হতে পারে, যখন সে একই সম্পর্ক এই অঞ্চলে সার্কের বিকাশে বাঁধা সৃষ্টি করেছে? দ্বান্দ্বিকতার একটি দ্রুত পাঠই আপনার কাছে এই দুই রাষ্ট্রের পরস্পর নির্ভরশীলতা পরিষ্কার করেব, দ্বি-পাক্ষিক ও বহু-পাক্ষিক দ্বান্দ্বিকভাবে সম্পর্কিত। একইভাবে, রাষ্ট্রীয় সীমানায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চার জন্য রাষ্ট্রীয় সীমানার বাইরেও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চার প্রয়োজন রয়েছে। নয়তো, একটি অন্যটিকে সীমাবদ্ধ ও বিনষ্ট কের দিবে!

দ্বিতীয়ত, যখন এটা এই অঞ্চলকে পুনরাবিষ্কার ওবং অর্থনৈতিক বিশ্বায়নকে প্রত্যেকের অগ্রগতির কাজে লাগানোর চিন্তা করে, তখন জয়রাম রমেশের ‘চীন্ডিয়া’ (Chindia) [চীন+ভারত] ধারণার গুরুত্ব রয়েছে। যৌথভাবে ২.৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা নিয়ে ভারত ও চীন কিভাবে ভিন্ন কিছু করতে পারে তা ভেবে দেখা যেতে পারে। এই বিষয়ে অভিহিত হওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে অবশ্যই এটা মাথায় রাখতে হবে যে অষ্টাদশ শতাব্দিতে চীন এবং ভারত(অখন্ড) যথাক্রমে পৃথিবীর প্রথম ও দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তি ছিল।[xi]তাই ভারত এবং চীন উভয়ই তাদের পারস্পরিক সীমানার বাইরের ও ভিতরের ক্রুটিসমূহ সংশোধন করবেএই শর্তে আমাদের বর্তমানে দেখা ভারত ও চীনের এই অগ্রগতি শুধু উত্থানই নয়, এটি এই অঞ্চলের পুনরূত্থানও। এক্ষেত্রে ভারতকে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিভক্ত দক্ষিণ এশিয়াকে শোধরাতে হবে।

এইক্ষেত্রে, চীনকে সার্কের পুর্ণ সদস্যপদ দেওয়া একটি গুরুত্বপুর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। এখানে উল্লেখ্য যে বর্তমানে চীন, জাপান, অস্ট্রলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, মরিশাস এবং ২৭ সদস্য বিশিষ্ট ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সার্কের পর্যবেক্ষকের মর্যাদা রয়েছে। চীনের পুর্ণ সদস্যপদ লাভের যোগ্যতার বাস্তব ভিত্তি চীনের বর্তমানে ভারতসহ দক্ষিন এশিয়ার প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশিদার হওয়ার মধ্যে নিহিত রয়েছে। চীন একই সাথে পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার বৃহত্তম উন্নয়ন সহযোগি। অন্যভাবে বলতে গেলে অর্থনৈতিকভাবে চীন একটি দক্ষিণ এশিয় রাষ্ট্র এবং চীনকে সার্কের পুর্ণ সদস্যপদ দেওয়া হলে তা শুধু সার্ককে অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে নবতেজদ্দীপ্তিই দিবে না বরং ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান মতানৈক্যসমূহ থেকে উদ্ভুত সীমাবদ্ধতাসমূহ থেকে সার্ককে মুক্ত হতেও সাহায্য করতে পারে। চীন ও ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যকার ‘বোদ্ধ ধর্মীয়’ ও ‘ভূ-সভ্যতাগত’ সম্পর্কসমূহ  বিবেচনায় যেমনটি Tan Chung[xii]তুলে ধরেছেন, এই ধরনের একটি পরিণতি আশোকবর্ধন সহ অতীতের বহু মহাত্মাকে অবশ্যই  স্বান্তনা যোগাতে পারে

পরিশেষে, চ্যালেঞ্জ ও সুযোগসমূহ মানসিকতার পরিবর্তন ও নূতনভাবে ভাবার মধ্যে নিহিত রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিকতাবাদের বহুমাত্রিকতায় নৈতিক ও রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত, অর্থনৈতিক ও সাংষ্কৃতিক, বিশৃঙ্খল ও ঐক্যবদ্ধ, এমনকি সু-ভোজনবিদ্যা সংক্রান্ত বিষয়গুলোর উপরও জোর দেওয়া হয়েছে। যদি আমরা এই আঞ্চলের পরিবর্তন চায় এবং এই অঞ্চলকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী করতে চায়, তাহলে আমার মতে (অনেকে ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন)  দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিকতাবাদের বহুমাত্রিকতা থেকে পাঠ নেওয়া ছাড়া আমাদের উপায় নেয়। আমাদের ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক সৃজনশীল প্রচেষ্টার উপরই এই আশা নিহিত রয়েছে।   

*মূল ইংরেজী লেখাটি ‘Regionalism in South Asia: A Conceptual Analysis’ শিরোনামে ‘International Journal of South Asian Studies, Pondicherry University, Pundicherry’ এর জানুয়ারি-জুন ২০১২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। অনুবাদের অনুমতি দেওয়ায়  প্রফেসর ইমতিয়াজ আহমেদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।


তথ্যসূত্র:

[i] Imtiaz Ahmed. State & Foreign Policy: India’s Role in South Asia ( New Delhi: Vikas Publishing House, 1993), pp.225-226. –এ উদ্ধৃত।

[ii] দেখুন,  Charles Allen, Ashoka (London: Little, Brown, 2012), p.35

[iii] দেখুন, Ashok Kapur, India’s Nuclear Option: Atomic Diplomacy and Decision Making ( New York: Praeger Publishers, 1976), p.47.

[iv] প্রাগুপ্ত, p.77

[v] Alan Davidson, The Penguin Companion to Food (London: Penguin Books, 2002), p.612.

[vi] Amartya Sen, The Argumentative Indian: Writings on indian History, Culture and Identity (London: Allen Lane, 2005), p.332.

[vii] MK Gandhi, The Indian States’ Problem (Ahmedabad: Navjivan Press, 1941), p.19. আরো দেখুন, Joan V. Bondurant, Conquest of Violence: The Gandhian Philosophy of Conflict (Princeton, New Jersey: Princeton University Press), p.151.

[viii] Dipesh Chakrabarty, “From civilization to globalization: the ‘West’ as a shifting signifier in Indian modernity”, Inter-Asia Cultural Studies, Volume 13, Number1, 2012, p.142

[ix] প্রাগুপ্ত।

[x] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, Nationalism (Madras: Macmillan India Limited, ১৯১৭ সালে প্রথম প্রকাশ, পুণর্মুদ্রণ Calcutta: Rupa, 1992), pp.57, 86-87.

[xi] Martin Jacques, When China Rules the World: The End of the Western World and the Birth of a New Global Order (New York: The Penguin Press, 2009), p.80. আরো দেখুন, Tan Chung, “Towards a Grand Harmony” in Ira Pande, ed., India China: Neighbours Strangers (Noida: HarperCollins, 2010), pp.2-18.

[xii] Tan Chung, “Towards a Grand Harmony” in Ira Pande, ed., India China: Neighbours Strangers (Noida: HarperCollins, 2010), pp.2-18.

About মুস্তাফা মুন্না

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী।

View all posts by মুস্তাফা মুন্না →

One Comment on “দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিকতাবাদ: একটি ধারণাগত বিশ্লেষণ*”

Leave a Reply