সহিংসতার সময় স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা কি?

Spread the love

বিগত এপ্রিল থেকে সারা দেশের মানুষের সমস্ত চিন্তা-চেতনা আচ্ছন্ন করে রেখেছে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা। গত মাসে ফেনীতে দিনে দুপুরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে যেভাবে গুলি করে হত্যা করে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হল- তা যেকোন বাণিজ্যিক সিনেমার গল্পকেও হার মানায়। আমরা অপরাধ সংঘটনের দিক থেকেও আধুনিক হচ্ছি। সারা দেশে গুম, অপহরণ, হত্যা, ধর্ষণ সবই এখন নতুন পদ্ধতিতে এবং অনেক বেশী মাত্রায় হচ্ছে। একসাথে অনেকে মারা যাচ্ছেন না বলে অনেক ঘটনাই আমাদের চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। আবার এসব হত্যার আড়ালে লঞ্চ ডুবে অনেক মানুষ মারা গেলেও তাই এবার আমাদের নৌপরিবহণ খাতে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি সারা দেশে আলোচনার বিষয় হয়নি। হায় রে প্রাণ। কত সস্তা এই দেশে। অস্বাভাবিক মৃত্যু কত স্বাভাবিক এই দেশে! মানুষের জীবন এখন কেবলই সংখ্যা। দলান্ধ কুতার্কিকগণ প্রায়শ আমাদের দুটি সরকারের সময়ের সাথে তুলনা করে বলেন- আগের আমলে যে সংখ্যায় মানুষ গুম বা খুন হয়েছেন তার তুলনায় এবার অনেক কম বা বেশী। এইসব নির্বোধদের কথায় মানবিক চিন্তার প্রতিফলন আশা করা বৃথা। তাজরিন গার্মেন্টস কিংবা রানা প্লাজায় নিহত শ্রমিকরা তাই মানুষ নয় সংখ্যা।

এসব পরিচিত অপরাধের পাশাপাশি চলছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘর-বাড়ী ও মন্দিরে অগ্নিসংযোগ। সম্পত্তি লুট। এটি এখন নিয়মিত অপরাধের রুপ ধারণ করছে। গত দুই বছরে এমন একটি মাস যায়নি যে মাসে বাংলাদেশের কোথাও না কোথাও ধর্মীয় অজুহাতে হিন্দু, বৌদ্ধ, আহমদিয়া সম্প্রদায় কিংবা জাতি বিদ্বেষের কারণে আদিবাসীরা সহিংসতার শিকার হননি। বিগত সেপ্টেম্বর ২০১২-তে কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলায় বৌদ্ধমন্দির পোড়ানোর ক্ষেত্রে যে অভিনব পদ্ধতিতে এলাকায় ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টি ও সংগঠিত করা হয়েছিল তার সফল প্রয়োগ করতে দেখা গেছে- পরের বছর পাবনার সাঁথিয়ায়, দিনাজপুরে এবং অতিসম্প্রতি কুমিল্লায়। হিন্দুঅধ্যুষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, যশোর, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নিয়মরক্ষার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে সহিংসতা হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের আর্থিকভাবে দুর্বল অংশটি ছিল মূলত টার্গেট। দেশের বিত্তশালী হিন্দুরা অনেক আগে থেকেই কোণঠাসা ধর্মীয় কারণে, কিন্তু “ইসলাম অবমাননা” ফর্মুলা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে দেখিনি। তাই এই বিত্তশালী অংশ একই ধর্মের দরিদ্র অংশটির বিপদে খুব একটা এগিয়ে আসেননি। সে নিয়ে নিজেদের মধ্যে খেদ থাকতে পারে কিন্তু যৌক্তিক সমাধান নয়। রাষ্ট্র তার নাগরিকের নিরাপত্তা প্রদানে যে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে তা কোন যুক্তিতেই মেনে নেয়া যায় না। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে রামুতে বৌদ্ধমন্দিরে হামলা হলে দেশ বিদেশে যে পরিমাণ প্রতিবাদ হয়েছে তাতে সরকার বাধ্য হয়েছে রামুতে সরকারী খরচে মন্দিরগুলো পুনঃনির্মাণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করতে। কিন্তু দেশের হিন্দু সম্প্রদায়, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের চেয়ে অনেকগুণ বেশী হওয়া সত্ত্বেও সংগঠিত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ দেখা যায়নি। সরকারের তরফ থেকে পুনর্বাসন দূরে থাক, কোন প্রকার আশ্বাসও শোনা যায়নি। ২০১৩ সালের ফেব্রিয়ারি থেকে যদি ধরি, তাহলে দেখা যায়- সারা দেশে যে পরিমাণ হিন্দু পরিবারের উপর হামলা চালিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে তাদের দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে, মন্দির ও প্রতিমা ভাংচুর করা হয়েছে তা গণনা করলে এবং সরকারের ভূমিকা পর্যালোচনা করলে বোঝা যাবে এর মধ্যে সরকারের একধরণের প্রশ্রয় ও নির্লিপ্ততা রয়েছে। রামুর ঘটনায় সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছিল তা হিন্দুদের বেলায় নয় কেন এই প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কে তুলবেন এই প্রশ্ন? হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের কর্তাব্যক্তিদের এসব সহিংসতার পর যে ভূমিকা ছিল তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। আমাদের ধর্ম পরিচয়ের আগে আমরা সমাজবদ্ধ মানুষ এবং মানুষ হিসেবে আমাদের যে চরিত্র তা হিন্দু আর মুসলিম বলে আলাদা করা কঠিন। পাবনার সাঁথিয়াতে গিয়ে দেখেছি- সেখানকার হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের যিনি বড় নেতা তিনি স্থানীয় আওয়ামীলীগেরও বড় নেতা। তিনি তার সামাজিক, ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার জন্যে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করছিলেন। বুঝতে বাকী থাকে না- তিনি সমষ্টির পরিবর্তে ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষায় অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। যেখান থেকে প্রতিবাদ আসার কথা সেখান থেকেই প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে আজ অবধি ঘটে যাওয়া এসব চরম অন্যায় নির্বিঘ্নে ঘটে চলেছে। এসব সহিংসতার পেছনে কারণ অনুসন্ধান করে যা জানা গেছে তাতে দেখা যায় এসবের পেছনে যতটা না ধর্মীয় কারণ তার চেয়ে বেশী ভূমিদস্যুতা জড়িত। অনেকে দলবাজির কারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবসা এর পেছনে খাটিয়েছেন। সেসব তথাকথিত কুবুদ্ধিজীবীদের নগদপ্রাপ্তি আমাদের বুঝতে বাকী নেই।

একটি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে, যারা ধর্মীয়ভাবে সংখ্যায় কম এবং দুর্বল তাদের উপর এসব হামলা চালানো হয় বলে আমরা খুব সহজেই একে সাম্প্রদায়িক হামলা বলে অভিহিত করি। ক্ষেত্রবিশেষে হয়ত সেটি সঠিক কিন্তু এতে বিপত্তি ঘটে অন্য জায়গায়- সেটি হল এতে অন্যায়কারীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। নব্বইভাগ মুসলিমের দেশে ইসলাম রক্ষার নামে কেউ যদি হিন্দু বাড়ী কিংবা মন্দিরে হামলা চালায় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া কোন রাজনৈতিক সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়। কেননা, আমরা মানি আর না মানি- ধর্মীয় আবেগ নির্বাচনের ক্ষেত্রে এখনও একটি মোক্ষম অস্ত্র। নির্বাচনের আগে সব দলই তাদের এই ধর্মীয় অনুভুতিকে কাজে লাগান। এছাড়াও, কোন ফৌজদারি অপরাধকে সাম্প্রদায়িক উগ্র ধর্মীয় উন্মাদনার কারণে সৃষ্ট বলে প্রতিষ্ঠা করতে পারলে- এক ধরণের লেজিটিমেসি তৈরি হয়- অর্থাৎ এতে করে বোঝানো যায় যে ব্যক্তিটি হটাৎ ধর্মীয় উন্মাদনার কারণে হিন্দু বাড়ীতে হামলা চালিয়েছে, সে সুস্থ অবস্থায় থাকলে এই হামলা চালাত না। কিন্তু বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এই যুক্তির বিপরীত চিত্র দেখা যায়। তাছাড়া, কোন হিন্দু পরিবার যদি সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হয়েছেন বলে দাবী করেন তাতে তিনি দেশের প্রচলিত আইনে বিশেষ কোন প্রতিকার পান না। এটি তার নিজের জন্যেও লজ্জার বটে। এই ভয়, লজ্জা অপমানে দেশত্যাগ করার ফলে দেশের ২২ শতাংশ হিন্দু কমে এখন ৮ শতাংশে ঠেকেছে। এসব সহিংসতার পেছনে দ্বিতীয় যে কারণকে দায়ী করা হয় তা হল- রাজনৈতিক কারণ। খুব সহজ সমীকরণ হল- জামাত শিবির এসব হামলার পেছনে দায়ী। কিন্তু, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ ঘটনার পেছনে আওয়ামীলীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা দায়ী। রামুর ঘটনায় সরকারী তদন্তেই এসব এসেছে। সাঁথিয়া নিয়ে সরকারের মাথাব্যাথা ছিল না। তাই সেরকম কোন তদন্তও হয় নাই। গত এপ্রিল মাসে নেত্রকোনা কিংবা কুমিল্লায় যে সহিংস হামলা হল তা নিয়ে সরকারের কেউ ঘটনাস্থল পরিদর্শন পর্যন্ত করতে যাননি। ধীরে ধীরে এসব হামলা অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে বলে সবার কেমন যেন গা সওয়া ভাব। ১২ মে বিডিনিউজ২৪ডটকম একটি সংবাদ ছেপেছে তাতে বলা হয়েছে, ১১মে সন্ধ্যায় নওগাঁর নিয়ামতপুর সদর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি বজলুর রহমান নঈম এর নেতৃত্বে ১৮-২০টি মোটরসাইকেলসহ অর্ধশতাধিক যুবকের বাহিনী মন্দিরে হামলা চালায়। সাবেক ইউপি সদস্য মহারাজপুর গ্রামের বসুদেব চন্দ্র বর্মন অভিযোগ করেন যে, শ্মশানের পুকুরসহ সম্পত্তির দখল নিতে আওয়ামী লীগের এ নেতা হামলা চালান। (http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article785834.bdnews)

১৩ মে ঢাকা ট্রিবিউন তাদের রংপুর প্রতিনিধির বরাত দিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করে তাতে বলা হয় মাত্র পাঁচ টাকা নিয়ে বিবাদের সুত্র ধরে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ধরাকান্দা গ্রামে একশ জনের বেশী লোক একটি হিন্দু পাড়ায় হামলা চালিয়ে বাড়ী ঘরে আগুন দেয় ও সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যায়। (http://www.dhakatribune.com/crime/2014/may/13/hindus-attacked-disagreement-over-tk5)

২৩ মে, ২০১৪, যুগান্তর পত্রিকার একটি শিরোনাম ছিল- “ছাতকে সংখ্যালঘু পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ।” সেখানে বলা হয়- “ছাতকে একটি হিন্দু পরিবারের বসতবাড়ির জায়গা জোরপূর্বক দখল ও গাছ কেটে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অবৈধ দখলদারদের বাধা দেয়ায় জায়গার মালিক সমীরণ সরকার ও তার স্বজনদের হত্যার হুমকি দিয়েছে সন্ত্রাসীরা।“ (http://www.jugantor.com/bangla-face/2014/05/23/102364#sthash.E2M1zX8J.dpuf)

২৮ মে, ২০১৪ প্রথম আলো পত্রিকায় “ ৪০ বিঘা জমি আঃ লীগ নেতাদের দখলে” এই শিরোনামে একটি সংবাদ ছাপে যাতে বলা হয়- “ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার দুধস্বর গ্রামে একটি হিন্দু পরিবারের পাকা বাড়িসহ ৪০ বিঘা জমি দখল করে রেখেছেন আওয়ামী লীগের দুই নেতা৷ তাঁরা সহোদর৷ আর সম্পত্তি উদ্ধারের মামলা করে ভয়ে পালিয়ে রয়েছেন পরিবারটির দুই সহোদর৷ তাঁরা এখন একটি ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন৷”

(http://m.prothom-alo.com/bangladesh/article/227242/%E0%A7%AA%E0%A7%A6_%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%98%E0%A6%BE_%E0%A6%9C%E0%A6%AE%E0%A6%BF_%E0%A6%86.%E0%A6%B2%E0%A7%80%E0%A6%97_%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0_%E0%A6%A6%E0%A6%96%E0%A6%B2%E0%A7%87)

উপরের নির্বাচিত সংবাদগুলো কেবল উদাহারণ দেয়ার জন্যে- বিগত একমাসের সব ঘটনার সংকলন করলে অন্য বিষয়ের অবতারনা করা যাবে না। সেটি ভবিষ্যতের জন্য তোলা রইল।

আজকাল এসব খবর আর পত্রিকার প্রথম পাতায় আসে না। তাই আমরা অনেক ঘটনা জানতেও পারিনা। কিন্তু, তাই বলে কোথাও সহিংসতা ও সম্পত্তি জবরদখল থেমে নেই। প্রতিরোধের কোন লক্ষণও এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। প্রতিরোধ নাগরিক এবং আইনি উভয়বিধ হতে পারে। নাগরিক প্রতিরোধ এদেশে সহজে গড়ে ওঠে না। বড় রকমের ধাক্কা লাগে। এটি আমাদের জাতীয় চরিত্র। আইনের সমস্যা কোথায়? আইন দিয়ে প্রতিরোধ করা না গেলে অন্তত প্রতিকারতো করা সম্ভব যা পরবর্তী ঘটনা ঘটার ক্ষেত্রে প্রতিরোধের ভূমিকা পালন করে। সেখানেও ঘাটতি আছে। পুলিশ কিংবা স্থানীয় প্রশাসন কি করে? স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কি ভূমিকা থাকে বা থাকা উচিত?

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নানান অজুহাত থাকে। তারা চাকুরে নন। কিন্তু যারা জনগণের টাকায় চাকুরি করেন, যাদের কাজের জবাবদিহিতা থাকতে হয় তারা ব্যর্থ হন কি করে? তাদের আদৌ কিছু করার আছে কিনা? এবার এসব প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজব।

বিগত সময়ে সংঘটিত এসব সহিংস হামলার ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কথা বলাই বাহুল্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধেই সহিংসতার মদতদাতা হিসেবে নাম উঠে এসেছে। যশোরের অভয়নগরে সংঘটিত হামলায় আমরা জেনেছি সহিংসতার আগে ও পরে অনেকবার প্রশাসনের সহায়তা চেয়েও পাওয়া যায়নি। পুলিশ গেছে সহিংসতা শুরুর চারঘণ্টা পর! নির্বাচনের আগে পাবনার সাঁথিয়াতেও ঘটে যাওয়া সহিংসতায়ও একই অভিযোগ ছিল অথচ এদের বিরুদ্ধে সেরকম কোন ব্যবস্থা নেয়ার কথা শুনিনি। অপরাধ, কেবল কোন কাজ করলে হয় তা নয়, যেখানে কারো কোন কাজ করার কথা সেটা না করাও অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। সেমতে, স্থানীয় প্রশাসনের সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থতা ফৌজদারি অপরাধ গণ্যে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কেবলমাত্র দায়িত্ব কেড়ে নিয়ে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা (ও,এস,ডি,) ফৌজদারি অপরাধের শাস্তি হতে পারে না। কিছুদিন লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে পরে এদের মূলত পুরস্কৃতই করা হয়। রামুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রামুর ঘটনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিলেও তিনি বর্তমানে বহাল তবিয়তেই আছেন। কক্সবাজারের তৎকালীন জেলা প্রশাসকও পদোন্নতি পেয়েছেন বলে শুনেছি। সবক্ষেত্রে একই অবস্থা। বিদ্যমান আইনে জেলা প্রশাসক কিংবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কি কি কাজ করবেন তা অনেক আগে থেকেই বলা আছে, সম্প্রতি ২০১১ সালে নতুন প্রজ্ঞাপনে তাদের কাজের প্রধি কি হবে তা আরও পরিষ্কারভাবে বলে দেয়া হয়েছে। এ সংক্রান্তে বাংলাদেশ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ২০১১ সালের প্রজ্ঞাপনটি পড়ে নিতে পারেন। সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি হিসেবে জেলা প্রশাসকের নিম্নলিখিত কাজের তালিকা পাবেনঃ

জনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা :

১) দাঙ্গা, হরতাল, রাজনৈতিক উত্তেজনা, শ্রমিক অসন্তোষ ইত্যাদি জরুরি পরিস্থিতির সময় জনশৃঙ্খলা বিধান;

২) বিবাদমান পক্ষের মধ্যে শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ১৮৯৮ সালের ফৌজদারী কাযবিধির ১৪৪ ধারা মতে ব্যবস্থা গ্রহণ;

৩) গুন্ডা, টাউট, সন্ত্রাস দমন এবং চোরাকারবার, মাদকব্যবসা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ;

৪) ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন মোতাবেক আটকাদেশ প্রদান;

৫) সরকারি সম্পত্তির ( জমাজমি, দালান কোঠা ইত্যাদি) দখল পুনরুদ্ধার সংক্রান্ত  কার্যক্রম;

৬) এসিডের অপব্যবহার রোধ;

৭) মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ;

৮) নারী ও শিশু নির্যাতন রোধ;

৯) বাল্য বিবাহ রোধ;

১০) যৌতুক নিরোধ;

১১) জঙ্গীবাদ দমন;

১২) নারী ও শিশু পাচার রোধ;

১৩) চোরাচালান প্রতিরোধ;

১৪) হুন্ডি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ;

১৫) জালনোট প্রচলন রোধ; এবং

১৬) যৌন হয়রানী (ইভ-টিজিং) প্রতিরোধ।

আইন-শৃঙ্খলা :

১) ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন এবং ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশনস্ অনুযায়ী অপরাধ দমন কার্যক্রমে পুলিশ বিভাগের উপর সাধারণ নিয়ন্ত্রণ;

২) জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন;

৩) অপরাধ প্রবণতা হ্রাসে কাযকর উদ্যোগ গ্রহণ;

৪) গুরুতর অপরাধ দমনে কাযকর উদ্যোগ গ্রহণ;

৫) জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাপূবক জনজীবনে স্বস্তি আনয়ন;

৬)বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্ভবের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কমকর্তা এবং  বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে সম্প্রসারিত আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভাঅনুষ্ঠান এবং কাযকর ব্যবস্থা গ্রহণ;

৭) আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে নতুন থানা, তদন্ত কেন্দ্র, পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনেরর প্রস্তাব প্রেরণ; এবং

৮)আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিশেষ পরিস্থিতি , প্রাণহানি, দুঘটনা, দুর্যোগইত্যাদি বিষয়ে সরকারের  আশু দৃষ্টি আকষণ করে তাৎক্ষণিক প্রতিবেদন প্রেরণ।

গোপনীয় প্রতিবেদন :

১ ) জেলার সার্বিক অবস্থার উপর পাক্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন সরকারে কাছে প্রেরণ;

২) বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর গোপনীয় প্রতিবেদন সরকারের কাছে প্রেরণ;

৩) বিশেষ গুরুত্বপূণ ঘটনার গোপনীয়  প্রতিবেদন প্রেরণ;

৪) বিশেষ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর গোপনীয় প্রতিবেদন প্রেরণ।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলার সর্বোচ্চ কর্মকর্তা হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে একই রকম দায়িত্ব রয়েছে। তিনিও জনশৃঙ্খলা, দাঙ্গা, হরতাল, পাবলিক পরীক্ষা ও সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধসহ অন্যান্য জরুরী ক্ষেত্রে শান্তি বজায় রাখার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করার ক্ষমতা রাখেন, অথবা নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা হিসেবে যে কারো বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সনের বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটকাদেশ দিতে পারেন।

উপরের আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে- জেলার সার্বিক ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক ও উপজেলার জন্যে বিশেষভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসব সহিংসতা প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখার বিধান আছে। তাহলে তাদের ব্যর্থতা বা নিস্ক্রিয়তা যা কিনা সহিংসতায় উৎসাহ যোগায় তা ফৌজদারি অপরাধ গণ্য করে কেন বিচারের মুখোমুখি করা হবে না? সেরকম বিধান প্রয়োজনে সংযোজন করে এদের বিচারের আওতায় আনা দরকার। ব্রিটিশ আমল থেকে সরকারী কর্মকর্তাদের কৃত কাজের ভিত্তিতে ফৌজদারি অপরাধের আওতায় আনা নিয়ে একধরণের বিধি নিষেধ আছে। এটি নাগরিকদের প্রতি অসাম্য তৈরি করে। অপরাধ কারো কাজের অংশ হতে পারে না। এখানে মনে রাখা দরকার- আইনের চোখে কোন কাজ করার কথা থাকলে তা না করাটাও অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

কারণ যাই হোক- এসব হামলার পর আইনী যেসব প্রতিকার আছে তা পাওয়া যাচ্ছে না। বাংলাদেশের সবকিছুই রাজনৈতিক। সাম্প্রদায়িক হামলাও রাজনৈতিক হতে সময় লাগে না। এতে স্থানীয় অপরাধীরা একধরনের সুবিধা পান- কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাদের বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন এবং আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে তাদের আইনি প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেন। এজন্য হয়ত প্রকৃত অপরাধীদেরও কিছুটা ছাড় দিতে হয়- অনেক ক্ষেত্রে তাদের দল বদলের ঝামেলাটুকু মেনে নিতে হয়। পাবনায় যে দু’শ জন শিবির কর্মী আওয়ামীলীগে যোগদান করেছেন তাদের ভবিষ্যতে কোন আইনি ঝামেলায় পড়তে হবে বলে মনে হয় না। এভাবে যে “কালচার অব ইম্পিউনিটি” চলছে তার ফলে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কোনভাবেই কমছে না বরং দিনে দিনে স্থায়ী ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। একজন ব্যক্তি ফৌজদারি অপরাধ করলে দেশের প্রচলিত আইনে যেটুকু আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন, তিনি রাজনৈতিক কিংবা সাম্প্রদায়িক কারণে একই অপরাধ করেছেন প্রমাণ করতে পারলে, তাকে ভিন্ন কোন আইনে বেশী শাস্তি দেয়ার কোন আইনি বিধান নেই। তাই একটি ফৌজদারি অপরাধকে যে নামেই ডাকি না কেন তার শাস্তি বাংলাদেশ দন্ডবিধির বিধি বিধান মোতাবেকই হয়। আক্রান্তরাও এই আইনে সাম্প্রদায়িক কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতা দাবী করলে আলাদা কোন সুবিধা পান না। তাই অপরাধীর শাস্তি হওয়াটাই বড় কথা এবং সেটি যদি প্রচলিত আইনে না হয় তবে আমাদের বিশেষ আইন প্রণয়নের কথা ভাবতে হবে। এটি দেশের সামগ্রিক প্রয়োজনেই করতে হবে। বর্তমান মাননীয় আইন মন্ত্রী ক্ষমতা গ্রহণের পর বলেছিলেন, সাম্প্রদায়িক হামালার ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলো “দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে” বিচার করবেন। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি তিনি এখনও বাস্তবায়ন করেননি। আমরা এসব মামলার দ্রুত নিস্পত্তি চাই, হোক সে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বা নতুন কোন ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। আমরা একটি স্থায়ী সমাধান চাই।

Leave a Reply