জঙ্গিবাদ মোকাবেলা : দরকার স্বচ্ছতা ও সমন্বিত কৌশল

বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের নির্মীয়মাণ সদর দপ্তরে একজন তরুণ আত্মঘাতী হামলা চালানোর অব্যবহিত পরই কথিত ইসলামিক স্টেটের (আইএস) পক্ষ থেকে এই হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছে। ঢাকার আশকোনায় সংঘটিত এই হামলা ঘটল কথিত ইসলামিক স্টেটের একটি ভিডিও প্রকাশের এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে। ওই ভিডিওতে ইরাকে আত্মঘাতী হামলায় নিহত বাংলাদেশি তরুণ নিয়াজ মোরশেদ রাজা বাংলাদেশিদের আহ্বান করেছিলেন দেশে আত্মঘাতী হামলা চালানোর জন্য। নিয়াজ রাজা ইরাকের তিকরিতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে মারা যান। তিনি আবু মরিয়ম আল বাঙালি নামে সাংগঠনিকভাবে পরিচিত ছিলেন।
লক্ষণীয় যে আত্মঘাতী হামলার এই ঘটনা এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বার ঘটল। সীতাকুণ্ডের পৌর এলাকায় ১৫ মার্চের নিরাপত্তা অভিযানের সময় জঙ্গিরা আত্মসমর্পণের বদলে আত্মঘাতী হওয়ার পথই বেছে নেয়। জঙ্গিদের মধ্যে কমপক্ষে একজন নারী ছিল। ওই অভিযানের পর একটি শিশুর মৃতদেহ পাওয়া গেছে, শিশুটি বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে বলেই অনুমান করা হচ্ছে। এর আগে ঢাকার আশকোনা এলাকায় গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর একটি বাড়িতে নিরাপত্তা অভিযানের সময় আত্মঘাতী বোমা হামলা চালায় একজন নারী জঙ্গি। সেটা ছিল বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নারী জঙ্গির আত্মঘাতী হামলা। বাংলাদেশে প্রথম আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে ২০০৫ সালে। সে সময় চারটি আত্মঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে আদালতের কাছে বিচারকদের ওপর, ২৯ নভেম্বর গাজীপুর ও চট্টগ্রামের আদালত প্রাঙ্গণে এবং ৮ ডিসেম্বর নেত্রকোনায় উদীচী কার্যালয়ের সামনে। জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ১৭ আগস্ট সারা দেশে বোমা বিস্ফোরণের পর তাদের অব্যাহত হামলার অংশ হিসেবেই এসব আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছিল। এতে দুজন বিচারকসহ কমপক্ষে ৩৪ জন মারা যান। ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ জেএমবির নেতা মোল্লা ওমরকে আটকের উদ্দেশ্যে অভিযানের সময় দুই সন্তান নিয়ে ওমরের স্ত্রী সাইদা নাঈম সুমাইয়া আত্মঘাতী হলেও তাঁর লক্ষ্য হামলা ছিল না।
এই সব তথ্য থেকে কয়েকটি বিষয় আমরা লক্ষ করতে পারি। প্রথমত, আত্মঘাতী হওয়া বা আত্মঘাতী হামলার ঘটনা আগের চেয়ে বেড়েছে। সংখ্যার বিবেচনায় তার বৃদ্ধি আমরা লক্ষ করি, যদিও তা এমন পর্যায়ে উপনীত হয়নি, যা থেকে একে অস্বাভাবিক বলে বিবেচনা করতে পারি। তবে এ বিষয়ে উদ্বেগের কারণ তাতে প্রশমিত হয় না। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে তিনটি ঘটনা ঘটেছে, যে ক্ষেত্রে আগের এক দশকে এ ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি। দ্বিতীয়ত, এ ধরনের ঘটনার পরপরই আন্তর্জাতিক একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এর দায় স্বীকার করছে। সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উপস্থিতির অস্বীকৃতির কথা সবারই জানা।
কিন্তু সাংগঠনিক যোগাযোগের বিষয়ে এ–যাবৎ আইএসের প্রচারিত তিনটি বাংলা ভিডিও এবং ১ জুলাই হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার সময়কার প্রচারিত ছবিগুলো আমাদের সামনে ভিন্ন প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়েছে। কিন্তু এই বিতর্কের বেড়াজালে নিজেদের আবদ্ধ না করলে এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে আইএসের আদর্শের অনুসারী আছে এবং তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে কারণে আমরা দেখতে পাই যে রমজান মাসে পশ্চিমাদের ওপর হামলা চালানোর জন্য আইসিসের মুখপাত্র আবু মুহাম্মদ আল-আদনানির আহ্বানের পরই হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় গত বছরের ১ জুলাই হামলা চালানো হয়। একইভাবে আশকোনার এই হামলার ঘটনা ঘটল নিয়াজ রাজার ভিডিও প্রকাশের পরপরই। প্রাসঙ্গিকভাবে স্মরণ করা দরকার যে ১ জুলাইয়ের হামলার পর যেসব নিখোঁজ ব্যক্তির তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল, তার মধ্যে নিয়াজ রাজাও ছিলেন। নিয়াজ রাজা সম্ভবত দেশের বাইরে অবস্থানের সময়ই এই আদর্শে দীক্ষিত হন।
তৃতীয় বিষয় হচ্ছে ১৭ মার্চের হামলার লক্ষ্যবস্তু। র্যাবের নির্মীয়মাণ সদর দপ্তর যে এখনো সম্পূর্ণ চালু হয়নি, সেটাকে ধর্তব্যের মধ্যে নিলেও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে যে এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার চেষ্টা। আল-কায়েদার অনুসারী বলে দাবিদার আনসারউল্লাহ বাংলা টিম ২০১৫ সালে পুলিশের চৌকিতে অন্তত দুটি হামলা চালিয়েছিল। ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর রাজধানীর গাবতলীতে চেকপোস্টে হামলা চালিয়ে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে এএসআই ইব্রাহিম মোল্লাকে; একই বছরের ৪ নভেম্বর আশুলিয়ায় জঙ্গিরা হত্যা করে পুলিশ কনস্টেবল মুকুল হোসেনকে। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় নৌবাহিনীর একটি মসজিদে বিস্ফোরণে অন্তত ছয়জন আহত হন। জুমার নামাজের সময় সংঘটিত এই ঘটনার পর পুলিশ একে গ্রেনেড বিস্ফোরণ বলে জানালেও পরে আন্তঃবাহিনী গণসংযোগ পরিদপ্তর এটিকে ককটেল বিস্ফোরণ বলে বর্ণনা করে। সময়ের বিবেচনায় বড় সময়ের ব্যবধানে এগুলো ঘটেছে এবং এগুলো পারস্পরিকভাবে যুক্ত নয় বলেই স্পষ্ট। কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে এর পরিবর্তন আমাদের বিবেচনায় রাখা দরকার। কেননা ২০১৫ সাল থেকে আমরা জঙ্গিদের কৌশলের পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছি। লেখক, পীর, বিদেশি নাগরিক, প্রকাশক, সমকামী অধিকার কর্মীদের ওপর বিচ্ছিন্নভাবে হামলার ঘটনাবলির পর শিয়া মাহজাবের অনুসারীদের মিছিলে এবং তাদের মসজিদের হামলার ঘটনা দেখতে পাই। তার সঙ্গে এখন আত্মঘাতী হামলার ঘটনা যুক্ত হচ্ছে।
জঙ্গি হামলার পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে জঙ্গিবিরোধী নিরাপত্তা অভিযান চালানো হচ্ছে। ১ জুলাইয়ের হামলার পর সরকারের পক্ষ থেকে যে জোর প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছে, সেটা অনস্বীকার্য। উপর্যুপরি এবং নিয়মিতভাবে জঙ্গিদের আস্তানা চিহ্নিত করা এবং জঙ্গিদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা অভিযান সরকারের প্রচেষ্টার প্রমাণ বহন করে। একই সঙ্গে আনসার-আল ইসলাম, যা আনসারউল্লাহ বাংলা টিমেরই নতুন নাম, তাকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তও উল্লেখ্য। সীতাকুণ্ডের সাম্প্রতিক অভিযানে নিহত চার জঙ্গিকে হিসাবে নিয়ে বলা যায় যে ১ জুলাইয়ের পর কমপক্ষে ৪৩ জন জঙ্গি নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে। এর মধ্যে বড় ধরনের নিরাপত্তা অভিযান যেমন আছে, তেমনি আছে আটক ব্যক্তিদের কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়ার ঘটনা।
শীর্ষ কয়েকজন নেতার নিহত হওয়ার ঘটনার পর জঙ্গি সংগঠনগুলো দুর্বল এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে অনেকে মনে করলেও গত কয়েক মাসের ঘটনাবলি ইঙ্গিত দেয় যে জঙ্গিরা পুনর্গঠিত হচ্ছে এবং তাদের শক্তি একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তদুপরি ভারতে আইএসের বিস্তার ঘটেছে এবং ইরাকে আইএসের ঘাঁটির পতনের পর সেখানকার বিদেশি জঙ্গিরা পৃথিবীর অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন অভিযানের সাফল্য সত্ত্বেও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সরকারের কৌশলের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। গত দেড় দশকে সারা পৃথিবীর অভিজ্ঞতা থেকে এটা স্পষ্ট যে কেবল নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান জঙ্গিবাদ মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। জঙ্গি বলে আটক ব্যক্তিদের নিয়েও অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে। যেমন সম্প্রতি জঙ্গিদের ‘আধ্যাত্মিক নেতা’ বলে আটক আবুল কাশেম আদালতে দাবি করেছেন যে তাঁকে অনেক আগেই আটক করা হয়েছে। জঙ্গি হিসেবে আটক করা ব্যক্তিরা যেকোনো ধরনের দাবি করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করবেন, সেটা মোটেই বিস্ময়কর নয়। কিন্তু তাঁরা এই দাবি করতে পারছেন, কেননা এই ধরনের ঘটনা আগে ঘটেছে। ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়ার ঘটনার বিষয়েও তা সত্য।
জঙ্গিবিরোধী অভিযানে যেসব বাহিনী যুক্ত, তাদের কাজের মধ্যেই কেবল সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে তা নয়, জঙ্গি সংগঠনগুলোর, এমনকি সরকার যাকে ‘নব্য জেএমবি’ বলে বর্ণনা করছে, তার কাঠামো, আদর্শিক অবস্থান এবং নেতৃত্বের বিষয়েও তথ্যে ঘাটতি রয়েছে বলেই মনে হয়। যে কারণে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) দেওয়া তথ্যের মধ্যে অসংগতি থাকে, যা আবুল কাশেমকে আটকের পরে দেওয়া বক্তব্যেই উঠে এসেছে। এগুলো সাধারণের মনে আস্থার অভাব তৈরি করে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে জঙ্গিবাদ অগ্রহণযোগ্য এবং আদর্শিকভাবে তার সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহী লোকের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। কিন্তু সরকারের কাজে স্বচ্ছতার অভাব থাকলে এবং রাজনৈতিক কারণে জনগণের আস্থার অভাব থাকলে আলাদা করে কেবল জঙ্গি মোকাবিলায় জনসাধারণের ব্যাপক আস্থা অর্জন করা যাবে বা সহযোগিতা পাওয়া যাবে এমন মনে না করাই ভালো। সে কারণেই জঙ্গিবাদ মোকাবিলার সঙ্গে সামগ্রিক রাজনীতি এবং সামাজিক অবস্থার যোগাযোগ রয়েছে। সমাজে ও রাজনীতিতে যদি উগ্রপন্থীদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা হয়, আশু রাজনৈতিক বিবেচনায় উগ্রপন্থীদের একাংশের সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে আপসের ঘটনা ঘটে, তখন তা জঙ্গিদের মধ্যেই কেবল উৎসাহ বৃদ্ধি করে তা নয়, সমাজেও সহিংস উগ্রপন্থা মোকাবিলায় সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
জনগণের মধ্যে এই ধারণা যদি তৈরি হয় যে জঙ্গিবাদকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বা রাজনীতির আশু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে দৃষ্টি সরানোর কাজে তাকে ব্যবহার করা হচ্ছে, তবে সেটি কেবল দুর্ভাগ্যজনক নয়, ভয়াবহ বিপদ তৈরি করতে পারে। মনে রাখা দরকার যে এটি বাস্তবে হচ্ছে কি না সেটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে অযথা এই রকম ধারণা বা পারসেপশন তৈরি হচ্ছে কি না। এই রকম পারসেপশন আস্থার ঘাটতি তৈরি করে। যেকোনো ধরনের কম্প্রিহেনসিভ কাউন্টার টেররিজম স্ট্র্যাটেজির কাজ হচ্ছে এই আশঙ্কাগুলোকে মোকাবিলা করা। কিন্তু সেটি রাজনৈতিক ইচ্ছে (পলিটিক্যাল উইল) ছাড়া সম্ভব নয়। সরকারের কাজ হচ্ছে তার বক্তব্য বা আচরণ দিয়ে সেটা প্রমাণ করা। ডি-র্যাডিকালাইজেশনের প্রশ্নটিকে কম্প্রিহেনসিভ কাউন্টার টেররিজম স্ট্র্যাটেজির অংশ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে, তবে বাংলাদেশে একই সঙ্গে দরকার কাউন্টার-র্যাডিকালাইজেশনের উপায় ও উপকরণ শনাক্ত করা, সেই কাজে আগে জোর দেওয়া।
সমাজে ও রাজনীতিতে স্বাধীন এবং ক্ষেত্রবিশেষে কথিত বিতর্কিত মতপ্রকাশের জায়গা সীমিত হয়ে এলে, সেগুলো প্রকাশে সরকারের পক্ষ থেকে বাধা সৃষ্টি করা হলে তা কারও জন্য ইতিবাচক হয় না। ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ জঙ্গিবাদের কারণ ও তার মোকাবিলার কৌশল-বিষয়ক আলোচনা ও গবেষণার জন্যও জরুরি। মতপ্রকাশের ওপর বাধা-নিষেধ, সমাজের সুস্থ বিতর্কের অভাব এবং শাসনে স্বচ্ছতার অভাবের সুযোগ গ্রহণ করে উগ্র আদর্শ, যার উৎস দেশেও হতে পারে, বিদেশেও হতে পারে। এ কথা স্মরণে রাখা খুবই জরুরি যে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই প্রথমত এবং প্রধানত আদর্শের লড়াই।
প্রথম আলো’তে প্রকাশিত ১৯ মার্চ ২০১৭

থাম্বনেইল সূত্রঃ লিঙ্ক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আপনি যে রোবট নন তা প্রমান করতে শুন্যস্থানে সঠিক সংখ্যাটি লিখুন * Time limit is exhausted. Please reload the CAPTCHA.