‘ক্রসফায়ার’ – দুটি প্রশ্ন

Spread the love

গত কয়েক দিনে বাংলাদেশে পুলিশের হাতে আটক অবস্থায় ‘জঙ্গি’ বলে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তি গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম এবং শরিফুলের (পরিবার যাকে মুকুল রানা বলে শনাক্ত করেছে) মৃত্যুর ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেছে। এদের মধ্যে ফাহিম মাদারীপুরে কলেজশিক্ষক রিপন চক্রবর্তীকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টার সময় সাধারণ নাগরিকের হাতে আটক হন। শরিফের আটকের বিষয়টি অস্পষ্ট। কিন্তু এঁরা দুজনই পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় নিহত হয়েছেন। পুলিশের দাবি, তঁারা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছেন। স্পষ্টতই এগুলো বিচারবহির্ভূত হত্যা। এক হিসাবে গত নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত জঙ্গি সন্দেহে আটক ১২ জন কথিত ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন। এর মধ্যে জুন মাসের ১৯ দিনে সাতজন মারা গেছেন।

সাম্প্রতিক এই দুই হত্যাকাণ্ডের পর যঁারা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে আইনের চোখে এই সব হত্যাকাণ্ড অপরাধ, তাঁদের ধন্যবাদ। কিন্তু এই বিষয়ে যেসব প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে তার একটি ধারার বক্তব্য হচ্ছে, এ হত্যাকাণ্ড অগ্রহণযোগ্য এই কারণে যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাঁচিয়ে রাখলে এঁদের কাছ থেকে ‘জঙ্গি’দের বিষয়ে তথ্য জোগাড় করা যেত। এ কথা ঠিক যে কথিত জঙ্গিরা নিহত হওয়ায় এঁরা কারা, কেন এ ধরনের সহিংস উগ্রপন্থা তাঁদের আকর্ষিত করেছে, কারা তাঁদের প্রণোদনা দিয়েছেন, তাঁরা কোন ধরনের সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করেন এবং ইতিমধ্যে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে যোগাযোগ আছে কি না, সেটা জানার সুযোগ থাকল না। উপর্যুপরি এই ঘটনার কারণে এর মধ্যে একটা ধারা বা প্যাটার্ন আমরা সহজেই চিহ্নিত করতে পারি। জঙ্গিবাদ বোঝা এবং তার বিরুদ্ধে কৌশল তৈরির ক্ষেত্রে এগুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে এসব হত্যাকাণ্ড থেকে কারা লাভবান হচ্ছেন।

কিন্তু এটাও লক্ষ করা যাচ্ছে যে এ ধরনের বক্তব্য যাঁরা দিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এমন ধারণা দিচ্ছেন যে, এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে তাঁদের আপত্তি নেই; কিন্তু তথ্য আদায়ের আগেই জঙ্গিদের হত্যা করা হচ্ছে—এটাই তাঁদের উদ্বেগের বিষয়। তাঁদের এই অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া আমার কাছে বিপজ্জনক বলে মনে হয়। আমাদের বোঝা দরকার যে এর বিরুদ্ধে যাঁরা কথা বলছেন, তাঁরা কোন অবস্থান থেকে এই আপত্তি তুলছেন। ২০০৪ সাল থেকে ১ হাজার ৭১৫টি ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটেছে। সেগুলোকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়ার পর এবং তার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করার পর যাঁরা এখন এ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তাঁদের অবস্থানের ভিত্তিটা নিয়ে সংশয় থাকাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে যাঁরা এ হত্যাকাণ্ডগুলোকে এই বলে সমর্থন করছেন যে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ‘কঠোর ব্যবস্থার’ বিকল্প নেই, তাঁরা কার্যত বলছেন যে আইন বা সংবিধান-প্রদত্ত নাগরিকের অধিকারের ব্যাপারে তাঁদের কোনো রকম আগ্রহ নেই। তাঁদের যুক্তিটা অনেকাংশেই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র মোড়কে ঢাকা। তাঁদের কথায় মনে হয় আইন, সংবিধান, নাগরিকের অধিকার, নীতি ও নৈতিকতা শিকেয় তুলে তাঁরা নিরাপত্তার সন্ধানে বের হয়েছেন। আইন, সংবিধান এবং নৈতিক বিবেচনা থেকে কোনো প্রশ্নে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি বোঝার জন্য আমি দুটো উদাহরণ দিতে চাই।

১৯৮৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হয়েছিলেন ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর মাইকেল ডুকাকিস। নির্বাচনী প্রচারণার সূচনায় তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু রিপাবলিকানরা তাঁর বিরুদ্ধে প্রচার করে যে তিনি অপরাধীদের প্রতি সহানুভূতিশীল। এর অন্যতম উদাহরণ হিসেবে হাজির করা হয় তিনি যখন গভর্নর ছিলেন, তখন ম্যাসাচুসেটসের অপরাধীরা সহজেই প্যারোলে বেরোনোর সুযোগ পেয়েছে। ডুকাকিস সারা জীবন মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর এই অবস্থানও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। তত দিনে ডুকাকিস এবং বুশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হাড্ডাহাড্ডি বলে জনমত জরিপের ইঙ্গিত। এই প্রেক্ষাপটেই সিএনএন আয়োজিত দ্বিতীয় বিতর্কের শুরুতেই সিএনএনের রিপোর্টার বার্নার্ড শ তাঁকে প্রশ্ন করেন, যদি তাঁর স্ত্রী কিটিকে ধর্ষণ এবং হত্যা করা হয় [সেই অপরাধীর জন্য] তিনি অপরিবর্তনীয় মৃত্যুদণ্ড সমর্থন করবেন কি না। ডুকাকিস সুস্পষ্টভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘না, বার্নার্ড, আমি সমর্থন করব না। আমি ধারণা করি আপনি জানেন যে আমি সারা জীবন মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে এসেছি। আমি এমন কোনো প্রমাণ দেখিনি যাতে বলা যায় এটি [মৃত্যুদণ্ড] একটি প্রতিরোধক; আমার মনে হয় সহিংস অপরাধ দমনে এর চেয়ে ভালো ও কার্যকর পথ আছে।’ তাঁর এই উত্তরের ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে—অনেকে বলেন, এতে প্রমাণিত হয়েছে তিনি অনুভূতিহীন মানুষ। বিতর্ক আছে এই প্রশ্নের ব্যাপারেও। অনেকের ধারণা, নির্বাচনে তাঁর পরাজয়ের পেছনে এই উত্তর একটা কারণ। মাইক ডুকাকিস সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘এটি [কিটির নাম] একটি উদাহরণ মাত্র।’ কেননা কোনো না কোনোভাবে এই প্রশ্ন বহুবার তাঁকে করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর উত্তরের পেছনে যে নীতিগত অবস্থান সেটা হচ্ছে লক্ষ করার বিষয়, তিনি ব্যক্তিগত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর নীতিগত বা নৈতিক অবস্থান থেকে সরে যাননি।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর এ ধরনের আরেক বিতর্কের সূচনা হয়, যাকে বলা হয় ‘টিকিং বোম সিনারিও’। বিবেচ্য হচ্ছে একটি কল্পিত অবস্থা—এক ব্যক্তিকে আটক করা হলো যিনি একটি অত্যাসন্ন সন্ত্রাসী হামলার বিষয়ে জানেন, যাতে অনেক লোক মারা যাবে। এই আটক ব্যক্তির কাছ থেকে তথ্য পাওয়া যাবে যদি তাঁকে নির্যাতন (টর্চার) করা হয়। কী করা উচিত? আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষত নির্যাতন, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের বিরুদ্ধে ১৯৮৪ সালে গৃহীত জাতিসংঘের কনভেনশন (যা ১৯৮৭ সালে কার্যকর হয়েছে), তাতে বলা হয়েছে যে কোনো রকম বিশেষ পরিস্থিতি—যার মধ্যে যুদ্ধ, যুদ্ধের হুমকি, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অথবা কোনো জন-জরুরি অবস্থাও আছে—নির্যাতনের সপক্ষে ব্যবহার করা যাবে না (অনুচ্ছেদ ২.২)। এই কল্পিত সিনারিও সূচনা করে এক আইনগত এবং নৈতিকতাবিষয়ক বিতর্কের। যাঁরা নির্যাতনের পক্ষে কথা বলেছেন, তাঁরা জোর দেন যে সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষায় সরকারের উচিত হবে নির্যাতনের পথ বেছে নিয়ে হলেও নিরাপত্তার বিধান করা। যুক্তরাষ্ট্রে এই মতের সমর্থকদের অভাব হয়েছে তা নয়। আন্তর্জাতিক আইনে সুস্পষ্ট নিষেধ সত্ত্বেও অনেকে এর পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন। যেমন আইনজীবী এলেন ডরশোউইজ তাঁর হোয়াই টেররিজম ওয়ার্ক্স-আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্য থ্রেট (২০০২) বইয়ে এর পক্ষে বলেন। অন্যদিকে ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রিভেনশন অব টর্চার’ নামের সংগঠন থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এই অবস্থানের বিরোধিতা করেন। এসব বিরোধিতা সত্ত্বেও জর্জ বুশ প্রশাসন, বিশেষত সিআইএ ‘এনহান্সড ইন্টারোগেশন টেকনিক’ (বর্ধিত জিজ্ঞাসাবাদ পদ্ধতি) নামে নির্যাতনের পথ বেছে নেয় এবং এর পক্ষে আইনি যুক্তি তৈরির চেষ্টা চালায়। কিন্তু তার পরিণতি কী হয়েছে আমরা তা কমবেশি জানি। ২০১৪ সালে সিনেটের যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় যে সিআইএ মিথ্যাচার করেছে এবং এসব নির্যাতন থেকে কোনো রকম কার্যকর তথ্য তারা পায়নি। গোড়া থেকেই যাঁরা নির্যাতনের বিরোধিতা করেছেন, তাঁরা কেবল আন্তর্জাতিক আইনের দিকেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেননি; যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের চতুর্থ, পঞ্চম ও চতুর্দশ সংশোধনীর আলোকেও তাঁরা এর বিরোধিতা করেছেন। এই তিন সংশোধনীর মধ্য থেকে যে ভিত্তিটি তাঁরা মৌলিক বিষয় বলে বিবেচনা করেন তা হলো ‘মানবিক মর্যাদা’র বিষয়। তাঁরা বলেছেন যে মানবিক মর্যাদার বিবেচনায় আপনি নির্যাতনকে সমর্থন করতে পারেন না। এই আলোচনায় আমরা আরও দেখতে পাই যে কেবল আইনি ও সাংবিধানিক দিক থেকেই নয়, নৈতিকতার দিক থেকেও আপনাকে বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

মৃত্যুদণ্ড বিষয়ে মাইকেল ডুকাকিসের যে অবস্থানের কথা আমি উল্লেখ করেছি, সেটা একার্থে এই নৈতিক অবস্থানের বিষয়। আপনি একটি বিষয়ে নৈতিক অবস্থান থেকে কথা বলবেন, নাকি রাজনৈতিক সুবিধার জায়গা থেকে, আশু সাফল্যের বিবেচনায় কথা বলবেন—সেটা যদিও আপনার বিষয়, তার প্রতিক্রিয়া কিন্তু কেবল আপনাকে বইতে হবে তা নয়।

পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় কথিত ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ বা পলায়নের চেষ্টার সময় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম কিংবা শরিফুল (বা মুকুল রানা) প্রথম নন। আমার আশঙ্কা যে তাঁরা এই তালিকার শেষ নামও নন। ফলে এই হত্যার পরে যাঁরা বিশেষ করে এই দুটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা করছেন তাঁদের কাছে আবেদন, আপনারা কোন বিবেচনায় এর বিরোধিতা করছেন, সেটাও ভাবুন এবং বলুন। অতীতে যখন এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে তখন তাঁরা কী অবস্থান নিয়েছিলেন, সেই প্রশ্ন না হয় আপাতত বাদ দিলাম, ভবিষ্যতে যদি আবারও একই ধরনের ঘটনা ঘটে, তবে সেই সময়ও কি তাঁরা একই অবস্থান নেবেন? ব্যক্তি, রাজনৈতিক পরিচিতি বা ঘটনার প্রেক্ষাপট কি আপনাদের এই অবস্থানকে বদলে দেবে?

আর যাঁরা এখনো কথিত নিরাপত্তার অজুহাতে এ ধরনের হত্যাকে সমর্থন করছেন তাঁদের কাছে দুটি প্রশ্ন; প্রথমটা খানিকটা ডুকাকিসকে করা প্রশ্নের মতো, আইন ও সংবিধানের এই বরখেলাপ কি আপনার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে? দ্বিতীয় প্রশ্ন, আপনি কি নৈতিকভাবেই এটাকে সঠিক মনে করেন?

প্রথম আলো’তে প্রকাশিত, ২৫ জুন ২০১৬

Leave a Reply