তরুণদের ওপর নির্বিচার নজরদারি?

Spread the love

দেশে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে; শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব। এ পর্যন্ত যেসব প্রস্তাব শোনা গেছে তার ভেতরে পরিবারের দায়িত্ব থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের দায় এবং শিক্ষকের ভূমিকা কিছুই বাদ আছে বলে মনে হয় না। তরুণদের ব্যাপারে পিতামাতার করণীয় বিষয়ে রাজনীতিবিদ থেকে মনস্তত্ত্ববিদ, সবাই কিছু না কিছু পরামর্শ দেওয়াকেই কর্তব্য বলে বিবেচনা করছেন। এসব পরামর্শের সূচনা হয়েছে ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার মর্মন্তুদ ঘটনার পরে, বিশেষ করে হামলার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সামাজিক পরিচিতি প্রকাশিত হওয়ার পরে; তখন জানা যায় যে তাঁদের মধ্যে আছেন এমন তরুণ, যাঁরা প্রধানত মধ্যবিত্ত পরিবারের এবং তাঁরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী।

উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত তরুণদের কাছে জঙ্গিবাদের, বিশেষত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের আবেদনের বিষয়টি যদিও বিভিন্ন দেশের গবেষকদের কাছে আগেই জানা ছিল, বাংলাদেশে সেই আলোচনা মনোযোগ আকর্ষণ করেনি। জঙ্গিবাদের উপস্থিতিকে ধরে নেওয়া হয়েছিল অন্যের সমস্যা। মাঠপর্যায়ের নির্ভরযোগ্য গবেষণার বদলে একধরনের পূর্বধারণার ভিত্তিতে রাজনৈতিক বিবেচনা এবং মধ্যবিত্ত মনোভঙ্গি থেকে সহজবোধ্যভাবে সম্ভাব্য জঙ্গিদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সেভাবেই তার মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ১ জুলাই পর্যন্ত দেশের উচ্চ-মধ্যবিত্ত সমাজের মধ্যে একধরনের আত্মতৃপ্তি ছিল এবং তাঁরা এই সমস্যাকে দেশের নীতিনির্ধারকদের সমস্যা, রাজনীতিবিদদের সমস্যা, বড়জোর দারিদ্র্যপীড়িত লোকজনের সমস্যা বলেই বিবেচনা করেছেন।

২ জুলাই সকালে সেই ধারণা চূর্ণ হয়, ৭ জুলাই শোলাকিয়ার ঘটনা প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়। কিন্তু তারপরও সহজ উত্তরের আকাঙ্ক্ষা থেকে সমাজের এক বড় অংশ বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়নি। তার প্রমাণ হচ্ছে যে যখনই এটা জানা যায় যে এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত এবং সম্ভাব্য কয়েকজন জঙ্গি, যাঁরা নিখোঁজ রয়েছেন তাঁরা প্রধানত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তখন অঙ্গুলিসংকেত শুরু হয় সেই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হতে থাকে যেন যুক্তিটি এই রকম—যদি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক বা একাধিক ব্যক্তি জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে, তবে সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এ ধরনের কথাবার্তা যদি দেশ-নির্বিশেষে বাস্তবায়ন করা হয় বা হতো, তবে পৃথিবীর অনেক শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিতে হতো এই কারণে যে তাদের শিক্ষার্থীরা ক্ষেত্রবিশেষে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন। ইতালিয়ান গবেষক ডিয়াগো গাম বেটা এবং জার্মান গবেষক স্টিফেন হারটোগ তাঁদের ইঞ্জিনিয়ারস ফর জিহাদ: দ্য কিউরিয়াস কানেকশন বিটিউন ভায়োলেন্ট এক্সট্রিমিজম অ্যান্ড এডুকেশন গ্রন্থে ১৭৮ জন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীর শিক্ষাগত যোগ্যতার তথ্য দিয়ে দেখান যে এর ৪৪ শতাংশই হচ্ছে প্রকৌশলী আর বাকিরা হচ্ছেন অন্য সব বিষয়ে শিক্ষিত। কিন্তু এর ফলে পৃথিবীর সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরদারির কথা ওঠেনি।

আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব বিষয়ে যেমন শুনতে পেয়েছি, তেমনি শুনতে পেয়েছি সমাধানের প্রস্তাব; যার অন্যতম হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ওপরে আরও নজরদারির প্রস্তাব। সেই কাজে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন নয়, এমনকি শিক্ষকদের অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়। এসব কথা শুনে মনে হতে পারে যে এই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে রীতিমতো ‘নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্র’-এ পরিণত করতে পারলেই জঙ্গিবাদের সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। এসব প্রস্তাবের রূপ এবং মাত্রা বোঝার জন্য ১৭ জুলাই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বক্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে, ‘ছেলেমেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে নিজের রুমটা বন্ধ করে ওয়েবসাইটে কী কী করে, তা খেয়াল রাখতে হবে। দরজা বন্ধ করতে দেবেন না, দরজা খোলা থাক।’ শুধু তা-ই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় কী ব্যবস্থা নিচ্ছে তা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘লাইব্রেরি পরিষ্কার করা হয়েছে, কম্পিউটার ল্যাবস জব্দ করা হয়েছে। মসজিদে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। মনে হয়, আমাদের থেকে বেশি সিসি ক্যামেরা অন্য কোথাও নেই।’ (বিডিনিউজ ২৪, ১৭ জুলাই ২০১৬)। একই দিনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এই নজরদারির বিষয়ে সরকারের সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং তা আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়িয়েছেন, এ জন্য আপনাদের অনেক ধন্যবাদ। অনেক আগে থেকেই আপনাদের প্রতি আমাদের এই আহ্বান ছিল। কিন্তু তখন এত সাড়া দেননি। এখন সাড়া দিয়েছেন কিন্তু একটু দেরি হয়ে গেছে।’ (বাংলা ট্রিবিউন, ১৭ জুলাই, ২০১৬)। সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে কোনো শিক্ষার্থী ১০ দিন অনুপস্থিত থাকলেই সরকারকে জানানোর জন্য।

এসব প্রস্তাব এবং ব্যবস্থা শুনে আমার অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংরেজ দার্শনিক এবং সমাজবিজ্ঞানী জেরেমি বেন্থামের কথা মনে পড়েছে। বেন্থাম যে কারণে সবচেয়ে বেশি পরিচিত তা হচ্ছে কারাগারের ভবন কেমন হবে সে বিষয়ে দেওয়া তাঁর প্রস্তাব। তিনি কারাগারের স্থাপত্য বিষয়ে প্রস্তাব করেছিলেন যে কারাগার হওয়া উচিত বৃত্তাকার, কারাগারে বন্দীদের সেলগুলোর দরজা থাকবে কেন্দ্রের দিকে আর এই বৃত্তের কেন্দ্রে থাকবে একটি টাওয়ার, যেখান থেকে গার্ডরা সব সময় সবার ওপর নজর রাখতে পারবেন। এতে করে আটক ব্যক্তিরা জানবেন যে তাঁরা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে আছেন কিন্তু জানবেন না কে তাঁর ওপর নজর রাখছে। বেন্থাম এর নাম দিয়েছিলেন পেনোপ্টিকান। বেন্থামের স্বপ্নের এই কারাগার তৈরি হয়নি। কিন্তু তাঁর এই ধারণা, যাকে পেনোপ্টিসিজম বলে বর্ণনা করা হয়, সমাজবিজ্ঞানে আলোচিত বিষয়।

বিংশ শতাব্দীর ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুঁকো তাঁর ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ গ্রন্থে পেনোপ্টিকানকে সমাজে বিরাজমান নিয়ন্ত্রণের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি লিখেছেন, পেনোপ্টিকান ডিজাইন যেকোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণেই ব্যবহারের উপযোগী: যদি তাঁরা বন্দী অপরাধী হন, তাহলে তাঁরা সবাই মিলে পালিয়ে যাওয়ার বা ভবিষ্যতে কোনো অপরাধ সংগঠনের ষড়যন্ত্র করতে কিংবা পরস্পরের দ্বারা খারাপভাবে প্রভাবিত হতে পারবেন না; যদি তাঁরা রোগী হন তবে রোগ সংক্রমণের ভয় থাকবে না; যদি তাঁরা উন্মাদ হন তবে একে অন্যের ওপরে সহিংসতা চালাতে পারবেন না; যদি তারা স্কুলের শিক্ষার্থী হয়, তবে নকলের ভয় থাকবে না, কথাবার্তা হবে না, সময়ের অপচয় ঘটবে না; যদি তাঁরা শ্রমিক হন তাহলে কোনো রকম বিশৃঙ্খলা হবে না, কোনো চুরি হবে না, কোনো রকম ঐক্য হবে না, কাজের গতিকে শ্লথ করতে পারে বা কাজের মানের হানি ঘটাতে পারে বা দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে এমন কিছু ঘটবে না। সমাজে শৃঙ্খলা ও শাস্তি বিষয়ে ফুঁকোর আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পাই, নজরদারি কী করে, কী তার লক্ষ্য? পেনোপ্টিিসজমের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তিদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলা, এককে পরিণত করা, তার অন্তর্গত শক্তিকে দুর্বল করা।
কিন্তু যে সমাজ সৃষ্টিশীল হতে চায়, অগ্রগতি অর্জন করতে চায়, সেই সমাজ তার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এবং শক্তিশালী অংশকে কেন এই নিয়ন্ত্রণের বেড়াজালে বাঁধতে চাইবে? শুধু তা-ই নয়, কঠোর নিয়ন্ত্রণ কি আরও বেশি করে গোপনে, আরও বেশি করে সবার আড়ালের দিকেই ঠেলে দেবে না? যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপরে সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণের কথা ভাবছেন, তাঁরা নিশ্চয় জানেন যে এর বাইরেও শিক্ষার্থীদের জীবন আছে। অপরাধ মোকাবিলায় সিসিটিভির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছি না, কিন্তু সিসিটিভি দিয়ে তো মগজের ভেতর দেখা যায় না। বাংলাদেশের তরুণদের কাছে জঙ্গিবাদের আবেদন কেন, সেটার বিচার না করে, সেই সমস্যা সমাধান না করে, তাঁদের যাঁরা ঘরে-বাইরে সর্বত্র নিয়ন্ত্রণের ঘেরাটোপে আটকানোর পরামর্শ দিচ্ছেন, যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়কে বেন্থামের স্বপ্নের পেনোপ্টিকানে পরিণত করার কথা বলছেন, তাঁরা কি ভেবে দেখেছেন যে বিশ্ববিদ্যালয় বা নিজের ঘর যখন কারাগার বলে মনে হয়, তখন তারুণ্যের প্রবণতা হচ্ছে বিদ্রোহের। যে রাজনীতিবিদেরা এই নিয়ে সরব, তাঁদেরকে শুধু তাঁদের তারুণ্যের স্মৃতি মনে করিয়ে দিতে চাই। উগ্রপন্থার আবেদন এখনো খুব ক্ষুদ্র অংশের কাছে, সেটা মোকাবিলা করতে গিয়ে সবার ওপর নিয়ন্ত্রণের ভার চাপিয়ে দিলে সেই সংখ্যা বৃদ্ধির আশঙ্কাকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়া বিবেচকের কাজ হবে না।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, তা প্রাইভেট হোক কি পাবলিক; সেটা স্কুল, কলেজ কি বিশ্ববিদ্যালয় হোক, তাকে মুক্তচিন্তার জায়গায় পরিণত করতে না পারলে সিসিটিভি আর নিয়ন্ত্রণের কঠোরতা দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে জঙ্গিবাদের আবেদন মোকাবিলা করা যাবে কি না, সে বিষয়ে আমি সন্দিহান; তারচেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন জাতি হিসেবে আমরা কী ভবিষ্যৎ তৈরি করব সে বিষয়ে। যে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তরুণদের কেউ কেউ অন্যের দ্বারস্থ হচ্ছেন, যেখানে তাঁরা ভুল শিক্ষা পাচ্ছেন, বিভ্রান্তির গহ্বরে পতিত হচ্ছেন, তাঁকে সেই প্রশ্নটি শিক্ষাঙ্গনেই করতে দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। শিক্ষককে প্রশ্ন করার সুযোগ দিন; সব কথা, সব প্রশ্নকে আপাতদৃষ্টে গ্রহণযোগ্য মনে না হলেও এর কোনো বিকল্প নেই। তরুণদের মনের কথা বলার জায়গা করাই হচ্ছে এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাজ। সেটা একই সঙ্গে পরিবারের কাজ, তেমনি এই কাজ হচ্ছে সমাজের, রাষ্ট্রের। সমাজে ও রাজনীতিতে কথা বলার জায়গাগুলো সীমিত হয়ে গেছে, তরুণদের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বিচার নজরদারির এই কথাবার্তা শেষাবধি বাস্তবায়িত হলে, সমাজে তা মুক্তবাতাস প্রবেশের জানালাটিও বন্ধ করে দেবে। আলো-বাতাসহীন অন্ধকার ঘরে ফুল-ফল ফলে না, কিন্তু কীটপতঙ্গ বেঁচে থাকতে পারে।

প্রথম আলো, জুলাই ২৭, ২০১৬

Leave a Reply