রোহিঙ্গা শরনার্থী : খাদ্য নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত

Spread the love

বাংলাদেশের সরকার কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরনার্থীদের মধ্যে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি এক সপ্তাহের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে বলে যে খবর বেরিয়েছে সেটি উদ্বেগজনক। সরকারি বিজ্ঞপ্তি, যা ১০ ডিসেম্বর জারি করা হয়েছে, তাতে স্থানীয় প্রশাসন ১১ই ডিসেম্বর থেকে ১৭ই ডিসেম্বর পর্যন্ত এই কর্মসূচি বন্ধ রাখতে সব বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে অনুরোধ জানিয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আলি আহমেদকে উদ্ধুত করে বিবিসি বাংলা জানাচ্ছে যে, কর্তৃপক্ষ শুধুমাত্র স্থানীয় এনজিওগুলোকে তাদের খাদ্য ত্রাণ কার্যক্রম সাতদিনের জন্য বন্ধ রাখতে বলেছেন। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে যে কাহদ্যের অপচয় রোধের জন্যে এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। তাছাড়া কর্তৃপক্ষ মনে করে যে, শরনার্থীদের কাছে যথেষ্ট খাদ্য মজুত আছে। এই খবরে উদ্বেগের একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে এই ধরনের ব্যবস্থা শরনার্থীদের মধ্যে পুষ্টি সংকটের সৃষ্টি করবে কিনা। গত ১৫ নভেম্বর জাতিসংঘের খাদ্য কর্মসূচির (ডাব্লিউএফপি) পক্ষ থেকে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের মধ্যে উচ্চ অপুষ্টি হারের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলো; এক জরিপের ফল হিসেবে তাঁরা বলেছিলো যে কুতুপালং ক্যাম্পে অপুষ্টির হার আশঙ্কাজনক। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতি চারজন রোহিঙ্গা শিশুর মধ্যে একজন অপুষ্টিতে ভুগছে, যা পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে বেশি। ইউনিসেফ, অ্যাকশন কন্ট্রি লা ফেইম, সেভ দ্য চিলড্রেন, ইউএনএইচসিআর,ও ডব্লিউএফপি এই জরিপটি পরিচালনা করে।

১৯৭৮-৭৯ সালে রোহিঙ্গারা যখন প্রথমবারের মতো শরনার্থী হিসেবে বাংলাদেশে প্রবেশ করে সেই সময় খাদ্য বিতরণের ব্যাপারে অব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিতভাবে খাদ্যের পরিমাণ হ্রাস করা হয়েছিলো যার ফলে কমপক্ষে ১২ হাজার শরনার্থী মারা যান। সেই সময়ে কক্সবাজারের ইউএনএইচসিআরের সাব অফিসের প্রধান ছিলেন অ্যালান সি লিন্ডকুইস্ট। ১৯৭৯ সালের জুন মাসে এক প্রতিবেদনে তিনি এই বিষয়ে বিস্তারিত জানান। সেই সময়ের এই ধরনের সিদ্ধান্তের একটি কারণ ছিলো এই যে, শরণার্থীদের জন্য এমন ব্যবস্থা করা, যাতে তারা বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার চেয়ে বার্মায় ফিরে যেতে উৎসাহী হয়। লিন্ডকুইস্টের এই প্রতিবেদনে আমরা এও জানতে পারি যে, ঢাকার সরকারি দপ্তরে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব বলেছিলেন, ‘ভদ্রমহোদয়গণ, এটা খুব ভালো ব্যাপার, যদি শরণার্থীরা ভালোভাবে খেয়ে থাকে। কিন্তু আমাকে রাজনীতিবিদের মতো বলতে হবে, আমার শরণার্থীদের এমন আরামে রাখব না যে তারা যেন বার্মায় ফিরে না যায়।’ এই বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষন করে ২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক নিবন্ধে আমি বলেছিলাম এক বিপর্যয় থেকে পালিয়ে এসে শরণার্থীরা অনাহারে ও অবহেলায় যেন মৃত্যুবরণ না করে সে ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার এবং আন্তর্জাতিক সমাজের বিশেষত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দায়িত্ব রয়েছে (‘অতীতের অভিজ্ঞতা যেন আমরা বিবেচনায় রাখি’, প্রথম আলো, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭)।

ইউএনএইচসিআর সম্প্রতি বলেছে যে, রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরার মত নিরাপত্তা তৈরি হয় নি; জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্রও জোর করে যেন শরনার্থীদের জোর করে না পাঠানো হয়। মিয়ানমারে সরকারের কার্যক্রমে মনে হচ্ছে তাঁরা চাইছেন যেন দ্রুত একটি লোক দেখানো প্রত্যাবাসন কর্মসূচী হচ্ছে তাঁদের লক্ষ্য। তাঁরা সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ওপরে জোর দিয়েছে এবং জাতিসংঘের বিবৃতিকে প্রত্যাখান করেছে। আজ (মঙ্গলবার) ইউরোপিয় পার্লামেন্টের এক আলোচনায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দ্রুত ‘জরুরি ব্যবস্থা’ নেবার জন্যে সদস্যরা আহবান জানিয়েছেন। আগস্ট মাস থেকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার কারণে যে প্রশংসা পেয়েছে খাদ্য বিতরণের ক্ষেত্রে এই ধরনের সিদ্ধান্ত তাঁর সঙ্গে সঙ্গতিহীন। এই ধরনের সিদ্ধান্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলার আগেই বাতিল করা জরুরি।

Leave a Reply