টিআইবি’র প্রস্তাব বিষয়ে মন্তব্য


Spread the love

একটি ‘অবাধ, নিরপেক্ষ ও সবার অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য টিআইবি’র পক্ষ থেকে যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে তাতে এ বিষয়ে একটা গণভোট অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়েছে। তা ছাড়া নির্বাচনকালীন সরকারের কয়েকটি বিকল্প কাঠামোর কথা বলা হয়েছে। টিআইবি’র প্রস্তাবিত সবগুলো কাঠামোর ভিত্তি হচ্ছে “পারস্পারিক আলোচনার ভিত্তিতে উভয় জোট থেকে সমান সংখ্যক (৪-৬ বা উভয় জোটের কাছে গ্রহণযোগ্য সংখ্যক) নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে নিয়ে ‘সংসদীয় ঐকমত্য কমিটি’”। এই কমিটির সাফল্যের ওপরে নির্ভর করবে বিকল্প কাঠামো গড়ে তোলা যাবে কিনা। এ ধরণের কমিটি গঠনের জন্য যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দরকার তা আছে কিনা সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। তারপরেও সমঝোতার জন্যে কোথাও না কোথাও তো শুরু করতে হবে, এটা তার প্রথম ধাপ হতে পারে। তবে মনে রাখা দরকার এ ধরণের কমিটি গঠনের আগে দরকার হবে এই নিশ্চয়তা যে কমিটির যে কোনো ধরণের প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্যে সংবিধান সংশোধনের দরকার হলে সরকারী দল তা করতে রাজী আছে এবং এই ধরণের আলোচনার অনুকূল পরিবেশের জন্যে তাঁরা বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের জামিনে বাধা দেবেনা। পাশাপাশি বিরোধী জোটকে এই বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে বলতে হবে যা তাঁরা তাঁদের অব্যাহত সহিংস কর্মসূচি বন্ধ করবে এবং এ ধরণের প্রস্তাব বাস্তবায়নে তাঁরা অঙ্গিকারাবদ্ধ। এই ধরণের নিশ্চয়তা ছাড়া কমিটি গঠনের বা কমিটির পক্ষ থেকে প্রস্তাবের কোনো মূল্য থাকবে না।

টিআইবি’র প্রস্তাবে কয়েক ধরণের কাঠামোর কথা বলা হয়েছে;

১। ঐকমত্য কমিটি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকার প্রধান মনোনয়ন দেবে। পরে সরকার প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকারের ১০ সদস্যের তালিকা করা হবে। অথবা,

২। ঐকমত্য কমিটি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভার ১০ সদস্যের তালিকা করবে। পরে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার প্রধান মনোনয়ন করা হবে।

সরকার প্রধান মনোনয়ের ক্ষেত্রে কমিটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারলে অনধিক তিন ব্যক্তির একটি তালিকা স্পিকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপন করা হবে। ওই তালিকা থেকে রাষ্ট্রপতি একজনকে সরকার প্রধান হিসাবে মনোনয়ন দেবেন।

সরকারে কারা থাকতে পারবেন সে বিষয়েও বক্তব্য রয়েছেঃ

১।  উভয় জোট থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও অনির্বাচিত/নির্দলীয় ব্যক্তিদের নিয়ে

২। শুধু অনির্বাচিত/নির্দলীয় ব্যক্তিদের নিয়ে এই মন্ত্রিসভা করা যেতে পারে।

৩। বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের দলীয় অনুপাতের ভিত্তিতে সদস্য মনোনীত করা যেতে পারে ।

তবে যারাই এই সরকারে থাকবেন তাঁরা দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না এবং দশম সংসদে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ওই সংসদের নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত সরকারি কোনো লাভজনক পদে থাকতে পারবেন না।

২০১২ সালের এপ্রিল মাসে রাজনৈতিক সংকট এতটা ঘনীভূত হওয়ার আগে আমি প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে কিছু প্রস্তাব রেখেছিলাম (দেখুন, “গণভোট অথবা ভিন্ন ধরনের ‘নির্বাচিত’ সরকার”, ২ এপ্রিল ২০১২)। এ সবের মধ্যে একটা বিকল্প হিসেবে গণভোটের প্রস্তাবও ছিল। আমার বক্তব্য এখানে পুনরুল্লেখ করতে পারিঃ

“এই প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংকট এড়ানোর দুটো পথ বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রথমটি হলো গণভোটের আয়োজন করা। দ্বিতীয়টি হলো নির্বাচনের সময় ভিন্ন ধরনের ‘নির্বাচিত’ সরকার নিয়োগ করা।
সংকট মোচনের প্রথম সম্ভাব্য উপায় হচ্ছে, নির্বাচনকালীন সরকারের ধরন বিষয়ে একটি গণভোট অনুষ্ঠান। সহজ ভাষায় বললে, বাংলাদেশের নাগরিকেরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক—এটা চান কি না, তা নিয়ে গণভোটের আয়োজন করা। বাংলাদেশের সংবিধানে কোনো বিষয়ে গণভোট অনুষ্ঠানের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই—এ কথা সবারই জানা। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান সংবিধানে ১৪২ (১ক) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে সংবিধানের কতিপয় মৌলিক ধারা সংশোধনের জন্য গণভোটের বিধান রেখেছিলেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হয়ে যাওয়ার ফলে এই বিধানটিও বাতিল হয়ে গেছে। … কিন্তু এই ধারা না থাকার অর্থ এই নয় যে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপ্রতিনিধি চাইলে কোনো বিষয়ে গণভোট করতে পারবে না।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠানের বিষয়ে সাংবিধানিক কোনো বাধা নেই। কিন্তু তার অর্থ এও যে এ ধরনের গণভোট অনুষ্ঠিত হলে তার ফলাফল মানতে সরকারের কোনো বাধ্যবাধকতা থাকবে না। এ কথা বিরোধী দলের জন্যও সত্য। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ ধরনের গণভোট থেকে সুস্পষ্টভাবে জনমত জানা গেলে উভয় পক্ষের ওপরই নৈতিক চাপ সৃষ্টি হবে। গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য আইনি বা সাংবিধানিক কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু সরকার যদি আইন বা সংবিধান বদলের দরকার মনে করে, তবে সে ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া তার জন্য মোটেই কষ্টকর নয়। সংসদে তিন-চতুর্থাংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে মহাজোটের; জাতীয় স্বার্থে তারা চাইলেই এই পদক্ষেপ নিতে অগ্রণী হতে পারে।

ক্ষমতাসীন জোট যদি গণভোটের ব্যাপারে অনুৎসাহী হয় এবং সংবিধানের বর্তমান বিধিবিধানের মধ্যে সমাধান খোঁজে, তবে এরও উপায় রয়েছে বলে আমার ধারণা। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন যে নির্বাচনের সময় অনির্বাচিত সরকার থাকুক তা কাম্য নয়; অর্থাৎ সে সময় নির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়ে সরকার গঠিত হলে নীতিগতভাবে তাঁর ও মহাজোটের কোনো আপত্তি থাকার কথা নয়। প্রধানমন্ত্রী এও বলেছেন যে নির্বাচনের ৯০ দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হবে এবং তারা দৈনন্দিন কার্যকলাপ ছাড়া আর কিছুই করবে না। সে ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকার গঠনের দুটো বিকল্প বিবেচনা করা যেতে পারে।

প্রথম বিকল্প হলো, নির্বাচনের ৯০ দিনের অব্যবহিত পূর্বে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী সংসদ থেকে পদত্যাগ করবেন। তাঁদের আসনে দুজন নির্দলীয় ব্যক্তি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। ওই দুজনের একজন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন এবং অন্যজন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয় পরিচালনা করবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত এই দুজনের মধ্যে পদ বণ্টনের দায়িত্ব পালন করবেন। বাকি মন্ত্রিসভা তৈরি হবে প্রধান দুই দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে সমসংখ্যক সদস্য নিয়ে। অন্যান্য দল, যারা গত নির্বাচনে মোট ভোটের নির্ধারিত ভাগ (যেমন—৫ শতাংশ) পেয়েছে, তাদের প্রতিনিধিকেও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। প্রধানমন্ত্রী ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওই দুই ব্যক্তি পরবর্তী পাঁচ বছর সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্য হতে পারবেন না বা সরকারি কোনো লাভজনক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হতে পারবেন না।
দ্বিতীয় ‘নির্বাচিত সরকার’ গঠনের উপায় হলো, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের অব্যবহিত পূর্বে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীসহ মোট ১০ জন সংসদ সদস্য পদত্যাগ করবেন। ওই আসনগুলোতে উপনির্বাচনের মাধ্যমে ১০ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন, যাঁরা অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত এই ১০ জনের মধ্যে একজনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন। এই ১০ জন নির্বাচিত সদস্য নির্বাচনে অংশ নেবেন না, পরবর্তী পাঁচ বছর মন্ত্রিসভার সদস্য হতে পারবেন না কিংবা প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে নিযুক্ত হবেন না”।

টি আই বি কিংবা আমার প্রস্তাবিত বিকল্পগুলো বিবেচনার জন্যে সরকারকেই আগে এগিয়ে আসতে হবে। তার কারণ হল কোনো না কোনো ভাবে সংবিধানের এখনকার যে বিধান আছে তা থেকে বাইরে যেতে হবে। তা একমাত্র সরকারি দলই সেটা করতে পারে। সরকার সে রকম ইঙ্গিত না দিলে যে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট থেকে বেরুবার আর কোনো পথ আছে বলে মনে হয় না। টি আই বি’র পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ভাবেই বলা হয়েছে যে, প্রস্তাবিত এই নির্বাচনকালীন সরকার কাঠামো ও প্রক্রিয়া গৃহীত হলে দশম সংসদ নির্বাচনসহ পরবর্তী নির্বাচনে তা কার্যকর করার জন্য সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন করার দরকার হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল আদৌ এ সব বিষয় বিবেচনায় নেয় কিনা এখন সেটাই দেখার বিষয়।

টি আই বি’র প্রস্তাবের বিষয়ে সংবাদঃ http://bangla.bdnews24.com/politics/article612866.bdnews

আমার লেখাঃ http://www.prothom-alo.com/detail/news/237141

No Comments

Leave a Reply