আরাকানের বিদ্রোহীদের নিয়ে বিচিত্রা’য় ১৯৮২ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন

Spread the love

[১৯৮২ সালের ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’য় “বার্মার আরাকানীদের মুক্তি সংগ্রাম” শিরোনামে যে প্রচ্ছদ কাহিনী প্রকাশিত হয়েছিলো সে বিষয়ে অনেক পাঠক আগ্রহ প্রকাশ করায় এখানে প্রতিবেদনটি পুনঃমুদ্রন করা হল।]


বার্মার আরাকানীদের মুক্তি সংগ্রাম
মাহফুজ উল্লাহ
সাপ্তাহিক বিচিত্রা ২৬ নভেম্বর ১৯৮২

ফসলের বিস্তৃর্ণ সবুজ প্রান্তরে জনউপস্থিতি নেই বললেই চলে।এখানে ওখানে দু একজন ফসলের কাজে ব্যস্ত। জাতিগত সমতার কারণে ওদের চেহারায় কোন ভিন্নতা নেই।তাই হঠাৎ করে চেনাও যায় না। সামনেই নদী।নদী পেরোলেই ভিন্ন দেশ,ভিন্ন সংস্কৃতি। নাফ নদীর নিস্তরংগ প্রবাহে এ সময়টায় চলাচল একটু বেশী।আসা-যাওয়ার মিছলে হরেক মানুষ হরেক ইচ্ছে নিয়ে চলাফেরা করে। সাও এনা এদের একজন ।কিন্তু পরিচয় গোপন করে সীমান্ত পারাপারে তার উদ্দেশ্য ভিন্ন।নাফ নদী বরাবর বাংলাদেশ সীমান্ত।বার্মার অভ্যন্তরে আরাকানীরা স্বাধীনতার জন্য যে সংগঠন গড়ে তুলেছে,সাও এন তাদেরই একজন।নেতৃত্বের হিসেবে প্লাটুন কমান্ডার। সীমান্ত পেরিয়ে সাও এন বাংলাদেশে প্রবেশ করে তার সঙ্গীদেরসহ।কিন্তু এটা তাদের স্থায়ী আস্তানা নয়। বাংলাদেশ-বার্মা সীমান্ত বরাবর যে কাংগুলো আছে সেগুলোই তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা জোগায়। প্রয়োজনে যোগাযোগ করিয়ে দেয় দর্শানার্থীদের সঙ্গে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বার্মার অভ্যন্তরে যেসব জাতিস্বত্বা, রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক মধুর নয়।একারণেই কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ রাজধানী রেঙ্গুনের বাইরে খুব একটা সুদৃঢ় নয়।জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীনতার জন্য এই জাতিস্বত্বাগুলো লড়াই করছে।কিন্তু বার্মার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ নেই। এ কারণেই সাতটি জাতিস্বত্বা মিলে গঠন করেছে জাতীয় মুক্তি সংস্থা। সাতটি জাতিসত্বার প্রধান, আরাকানীরা নাফ নদীর ওপারে বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর বাস করে বলে তাদের উপস্থিতি বাংলাদেশের ভেতরেও টের পাওয়া যায়।এদেরই সংগঠন আরাকান স্বাধীনতা সংস্থা,যা গঠিত হয়েছে১৯৭২ সালে। এই সংস্থার পক্ষ থেকে জারী করা ঘোষণায় বলা হয়েছে ‘আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব খর্ব হয়েছে ১৭৮৪ খৃষ্টাব্দে। সে বছর বার্মার সামন্ত প্রভুরা আরাকার দখল করে পুনরায় ১৮২৫ খৃষ্টাব্দে ইংরেজরা আরাকান দখল করে এবং পূর্ববাংলার সঙ্গে জুড়ে দেয়। ১৯৩৭ সালে যখন বৃটেন-বার্মা ভাগাভাগি হয়,তখন আরাকান একটি প্রদেশ হিসেবে অন্তর্ভূক্ত হয় ইউনিয়ন অফ বার্মার সীমানায়। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর উপনিবেশ হিসেবে আমাদের অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি।’
আরাকানীদের সামনে সমস্যা ও শ্লোগান একটিই: স্বাধীনতা।

সাও এন এর বক্তব্য
বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সাও এন এর নেতৃত্বে যে দলটি প্রায়ই অনুপ্রবেশ করে,তারা সংখ্যায় মাত্র বারো জন। দিনের বেলায় আত্মগোপনের খাতিরে এরা ব্যস্ত থাকে কৃষি কাজে। সাও এন জানায়,একবার বাংলাদেশে এলে তাদের বার্মায় ফিরে যেতে অসুবিধে হয়। বাধ্য হয়ে তাদের যেতে হয় নাগাল্যান্ড-মিজোরামের ভেতর দিয়ে। এসব আরাকানীরা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। অধিকাংশই মার্কিন অস্ত্র। সাও এনের ভাষায় অস্ত্রের উৎস: বার্মার সেনাবাহিনী অথবা অস্ত্রের আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীরা। সাও এনের মতে, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে তারা প্রশিক্ষণ পায়, অন্যকোন সাহায্য নয়। প্রতিনিয়ত মারের মুখে গত কয়েক বছরে এরা প্রায় ৭০০ সঙ্গী হারিয়েছে। কিন্ত দুর্বলতা এখনো তাদের গ্রাস করেনি। আরাকান মুক্তি সংস্থার সভাপতি চৌলাই তাং নেতেৃত্বের কারণে এখনো এদের উজ্জীবিত করে রেখেছেন। সম্প্রতি ঘোষিত নীতিমালায় চৌলাই বলেছেন ‘আমাদের বংশধরেরা যুগ যুগ ধরে জাতীয় মুক্তির যে বিপ্লবী সংগ্রাম করেছেন তা এগিয়ে নেয়া আমাদের জন্য ঐতিহাসিক এবং জাতীয় কর্তব্য। এই কর্তব্য [সামনে রেখে], যে সংস্থার জন্ম হয়েছে সে সংস্থা মহান জাতীয় বিপ্লবের দায়িত্ব পালন করছে। বর্তমানে আমরা আরাকানে জাতীয় প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছি এবং এই সংগ্রাম চলছে আরাকানী মাতৃভূমিতে, বার্মার অভ্যন্তরে নয় -এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য আগ্রাসী বাহিনীর আক্রমণ মোকাবেলা করা এবং পিতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করা।

দুর্ভাগা পাঁচজন
আরাকান স্বাধীনতা সংস্থার সদস্যরা নিরাপদে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে চলাচল করতে পারলের মাঝে মাঝে এদের প্রতিকূলতার সম্মূখীন হতে হয়। এমনি প্রতিকূলতার সম্মূখীন হয়েছেন এই সংস্থার পাঁচজন সদস্য যারা গত পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশের জেলে বন্দী জীবন যাপন করছেন। সম্প্রতি এদের ছেড়ে দেয়া হলেও বার্মার কর্তৃপক্ষ তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এদেরকে গ্রেফতার করা হয় ১৯৭৭ সালের ১৬ নভেম্বর এবং মুক্তি দেয়া হয় ১৯৮২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। এরা হচ্ছেন থইসিন, সুইচা, চুয়ালা, নিজলো এবং খিং উমরা।

খিং উমরা রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। টেকনাফ থানার তত্বাবধানে সীমান্ত পার করে দেওয়ার সময় তার সঙ্গে কথা হলো। উমরা দাবী করেছেন, তিনি স্বাধীনতা সংস্থার বৈদেশিক বিভাগের দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের পর বন্দী হয়। এটা নিয়ে তার মনে ক্ষোভ আছে। কিন্তু হতাশ হননি। তার বক্তব্য ‘আমার ছোট ভাইকে একটু অপরাধে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করেছে রেঙ্গুন সরকার। আমার পরিবারের উপর চালানো হয়েছে নির্যাতন। কিন্তু সেজন্য আমাদের সংগ্রাম থেমে থাকেনি এবং থাকবে না।’

উমরা বার্মা ফিরে যেতে চায় না। বাংলাদেশেই থেকে যেতে চান। তিনি মনে করেন‘বাংলাদেশে থেকে এ সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া যাবে’ কিন্ত এই পাঁচজনকে নিয়ে সত্যিকারের ঝামেলায় পড়েছে টেকনাফ থানা।

প্রতিকূলতার সম্মূখীন হলেও, আরাকান স্বাধীনতা সংস্থা বাংলাদেশী জনগনের সাহায্য প্রত্যাশা করে। কেন্দ্রীয় সংস্থার নামে প্রচারিত সাম্প্রতিক এক বাণীতে তারা আশা প্রকাশ করেছে, বাংলাদেশের জনগন তাদের উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রামে সাহায্য দেবে।

[বিচিত্রা থেকে প্রতিবেদনটি টাইপ করেছেন বিপ্লব মল্লিক।]

About আলী রীয়াজ

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক । তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিইচ-ডি ডিগ্রি লাভ করেন। ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেওয়ার আগে অধ্যাপক রীয়াজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বৃটেনের লিংকন বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ল্যাফলিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। এ ছাড়া তিনি লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। ইংরেজিতে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দশটি। এর মধ্যে রয়েছে– ‘পলিটিক্যাল ইসলাম এন্ড গভর্নেন্স ইন বাংলাদেশ’ (২০১০), ‘ফেইথফুল এডুকেশন : মাদ্রাসাজ ইন সাউথ এশিয়া’ (২০০৮) এবং ‘গড উইলিং – দি পলিটিক্স অব ইসলামিজম ইন বাংলাদেশ’ (২০০৪)। বাংলা ভাষায়ও তাঁর অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ‘স্টাডিজ অন এশিয়া’ জার্নালের সম্পাদক। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এবং রাজনৈতিক ইসলাম বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তাঁর স্বীকৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি ২০১২ সালে ডক্টর রীয়াজকে ‘ইউনিভার্সিটি প্রফেসর’ পদে ভূষিত করে। ২০১৩ সালে তিনি ওয়াশিংটনে উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারস-এ পাবলিক পলিসি স্কলার হিসেবে কাজ করেন।

View all posts by আলী রীয়াজ →

Leave a Reply