কেন নারীকেই ‘আত্মহত্যা’র পথ বেছে নিতে হয়?


http://imgur.com/gallery/jkOcNcO
Spread the love

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আকতার জাহানের মৃতদেহ তাঁর বাসস্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। কোনো কোনো সূত্রে বলা হচ্ছে যে তিনি আত্মহত্যা করেছেন এবং পুলিশ তাঁর কক্ষ থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে। সেখানে বলা হয়েছে ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। শারীরিক, মানসিক চাপের কারণে আত্মহত্যা করলাম।’ ময়না তদন্তের আগে যদিও এই বিষয়ে নিশ্চিত হবার সুযোগ নেই যে তাঁর মৃত্যুর কারণ কি তথাপি গণমাধ্যমের খবরের ইঙ্গিতকে বিবেচনায় নিলে আমাদের ধরে নিতে হবে তিনি ‘আত্মহত্যা’ করেছেন। তাঁর এই আত্মহত্যার খবর আলোচিত হচ্ছে ১০ সেপ্টেম্বর। দিনটি ‘বিশ্ব আত্মহত্যা নিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। অধ্যাপক জাহানের অপঘাতে মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হলেও একে কেবল আত্মহত্যা বলেই বিবেচনা করা সঠিক কিনা সে প্রশ্ন উঠেছে।

এই ঘটনার পরে বাংলাদেশে আবারও আত্মহত্যা বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত হবে, এ বছরের মে মাসে সাবেরা হোসেন নামের একজন মডেল আত্মহত্যা করার পর এই বিষয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছিলো। বাংলাদেশে আত্মহত্যার হার এতটাই বেশি যে ২০১৫ সালে হু-র প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায় যে সারা বিশ্বে আত্মহত্যার হারে বাংলাদেশ দশ নম্বর স্থানে। বিশ্বের গড় আত্মহত্যা প্রতি এক লাখে ১৪.৫; ২০০২ সালের জরিপ অনুযায়ী শ্রীলঙ্কায় আত্মহত্যার হার লাখে ১৭.৫ , ভারতে ১০.৫ জন। জাপানে এ সংখ্যা লাখে ২৫.২ জন, তাইওয়ানে ১৩.৫ জন এবং আমেরিকায় ১০.৭ জন। বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ-এর ২০১৩ সালের এক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি এক লাখে আত্মহত্যার হার ৭ দশমিক ৩ জন৷ ২০১৪ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন৷ অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতি ৫১ মিনিটে একজন মানুষ আত্মহত্যা করে। এতে করে আমরা এই প্রবণতার ব্যাপ্তিটা বুঝতে পারি। এটা একটা দিক।

কিন্ত যে দিকটি পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে বেশি সেটা হচ্ছে নারীদের ‘আত্মহত্যার’ ঘটনা। বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চের জরিপ বলছে নারীদের আত্মহত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি৷ বাংলাদেশে মহিলারা (৭৩.৪৫ শতাংশ) এবং গৃহিণীরা (৬২.৮৮ শতাংশ) আত্মহত্যা করে বেশি, অথচ অন্যান্য দেশে পুরুষেরা বেশি আত্মহত্যা করে। এই তথ্যটি আমাদের ভালো করে অনুধাবন করা দরকার। তুলনামূল্কভাবে নারীকেই কেন আত্মহত্যার শিকার হতে হচ্ছে সেই আলোচনা গুরুত্বপূর্ন। বাংলাদেশে নারীর ওপরে যে সন্ত্রাস চালানো হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার ‘দৈহিক’ দিকটিই গুরুত্ব লাভ করে (তাঁর কারণ বিষয়ে আলোচনার সুযোগ এখানে নেই, কিন্ত আমরা জানি তার পেছনে থাকে পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব যা গণমাধ্যমে কীভাবে সে খবর প্রকাশিত হচ্ছে তা দেখলেই বোঝা যাবে)। কিন্ত মেঘনা গুহঠাকুরতা যেমনটি বলেছেন, ‘নারী নিপীড়নের শুধুই শারীরিক দিকটার ওপরে গুরুত্ব আরোপ করা অপর্যাপ্ত এবং বিপজ্জনকও বটে’ (‘বাংলাদেশে নারী নিপীড়নঃ রাষ্ট্রের ভূমিকা,’ বাংলাদেশে নারী নির্যাতন, ঢাকা – সমাজ নিরীক্ষন কেন্দ্র, ২০১৩, ১৭)।

সাধারনভাবে আত্মহত্যার কারণসমূহের ভেতরে মানসিক রোগকে অন্যতম বলে বলা হয়ে থাকে। কিন্ত এই আলোচনায় এটা বলা হয় না যে বাংলাদেশে মানসিক রোগগ্রস্থতা নারীদের মধ্যে বেশি। ২০১৫ সালে এমেরিকান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি এন্ড নিউরোসাইন্স-এ প্রকাশিত এক গবেষনা পত্রে ২০০৩-২০০৫ সালে পরিচালিত প্রথম মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক জরিপের ফলাফল বিশ্লেষন করে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি মানসিক রোগে ভোগে [The first national survey on mental health conducted in 2003-2005 demonstrated that 16.1 % of the adult population had some form of mental disorder and that the prevalence of mental disorders was higher among women (19%) than men (12.9%) . In other words, in Bangladesh women are more vulnerable to mental illness than their male counterparts) (Anwar Islam and Tuhin Biswas, ‘Mental Health and the Health System in Bangladesh: Situation Analysis of a Neglected Domain’, American Journal of Psychiatry and Neuroscience 2015; 3(4): 57-62).]

নারীদের বেশি মানসিক রোগের শিকার হবার কারণ কি? ১৯৯২ সালে ঢাকায় ‘মহিলা ও মানসিক রোগ’ বিষয়ক আলোচনায় একজন মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ বলেছিলেন যে ২৫-৩৫ শতাংশ মহিলার কারণ মানসিক অস্থিরতা। হোসনে আরা শাহেদ সেই তথ্য উদ্ধৃত করে বলেছিলেন যে, ‘মানসিক অস্থিরতা’র মূলে কাজ করে ভীতি, হতাশা ও বঞ্চনাবোধ’ (নারীর মূল্য, নারোর কথা, ঢাকা, ১৯৯৪)। নারীর এই আতঙ্ক এবং বঞ্চনার পেছনে আছে সমাজে বিরাজমান পুরুষতন্ত্র, যা নাড়িকে বঞ্চিত করে, তাঁকে ভীতিগ্রস্থ করে (এই বিষয়ে আলোচনা দেখুন আমার গ্রন্থ “ভয়ের সংস্কৃতি’, ২০১৩)। স্বপন আদনান ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত গবেষনায় দেখিয়েছিলেন যে, নারীরা যদি উত্তরাধিকার সূত্রেও সম্পত্তি পায় তাও নিয়ন্ত্রন করে এবং মালিকানা ভোগ করে তাঁর স্বামী বা পরিবারের পুরুষেরা।

১৮৬৯ সালে জন স্টুয়ার্ট মিল ইংল্যান্ডের পরিবারগুলোকে বলেছিলেন ‘স্বৈরতন্ত্রের পাঠশালা’ (school of despotism)। বাংলাদেশের পরিবারগুলোর দিকে তাকিয়ে বলা যায় পরিবারগুলো হচ্ছে পুরুষদের স্বৈরতন্ত্র চর্চার অবাধ ক্ষেত্র। এই মানসিকতা এবং সামজিক ব্যবস্থাই নারীকে মানসিকভাবে রোগগ্রস্থ করে – তাঁকে বাধ্য করে আত্মহত্যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো সুইসাইড নোট থাকে না। কিন্ত খোঁজা দরকার সুইসাইড নোট নয়, সমাজে বিরাজমান কারণ।

এই লেখাটির ফেসবুক পোস্ট থেকে নির্বাচিত অংশ কপি করা হল এখানে:
Ali Riaz

এই যাবত আলোচনায় যে সব কথাবার্তা হয়েছে সেই বিষয়ে কয়েকটা কথা বলা দরকার ভেবেই লিখছি। এক জায়গায় লেখা যাবেনা ফলে কয়েক ভাগে কথাগুলো বলতে হচ্ছে। সব আলোচনা তো ফেসবুকে করা যাবেনা, শুধু কিছু বিষয় আলোকপাত করি।

আলোচনায় ‘বায়োলজিক্যাল পার্থক্য’ এবং ‘জেন্ডার কনশট্রাকশন’ দুটি বিষয়কে আলাদা করে না দেখার কারণেই আমার বক্তব্য বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে বলে আমার ধারণা। নারী এবং পুরুষকে আপনি সমান ভাবছেন না। ফলে দোষটা আপনি দিচ্ছেন নারীর ওপরে – তাঁর শরীর, ‘ইগো’, বয়স, যুদ্ধ না করা – এই সব কথা হাজির হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে পিতৃতন্ত্রের ক্যাটাগরি যা পুরুষকে একটা সুবিধা দেয়। এটাই হচ্ছে ভিক্টিমকে দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা। উগ্র পুঁজিবাদীরা বলে গরীব মানুষ গরীব তাঁর নিজের দোষে, দরিদ্র দেশ দরিদ্র কেননা দোষ তাঁদের। বর্নবাদীরা বলে কালো মানুষরা বেশি জেলে যায় কেননা তাঁরা বেশি অপরাধ করে, আপনি এ সব ক্ষেত্রে কাঠামোগত দিক দেখতে রাজি আছেন কিন্ত যখন নারীর অধিকার ও সমতার প্রশ্ন আসছে আপনি ফিরে যাচ্ছেন সেই বৃত্তে – ‘সহযোগিতা দিতে হবে’ – কে দেবে সহযোগিতা? পুরুষ? তাঁকে এই অধিকার কে দিলো বলুন? সমান ভেবে সহযোগিতা না কি অধস্তন ভেবে ‘সহযোগিতা’? ইতিহাস বলে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ছিলো সেটা পুরুষ শক্তি প্রয়োগ করে দখল করে সেখানে তাঁর হেজিমনি তৈরি করেছে বিভিন্নভাবে। সেই আলোচনা দীর্ঘ। কিন্ত ভাবাদর্শ এমন জিনিশ যা আমাদের মনে উপনিবেশ তৈরি করে আমাদের অজ্ঞাতে। এইখানেই কাঠামোর প্রশ্ন। যেমন ধরুন সম্পদের অধিকার – ইসলাম ধর্মের মধ্যে আছে যে নারী সমান ভাগ পাবেনা, কেন বলুন তো? অবস্থাটা দেখুনঃ Gender-based legal restrictions, such as limitations on property ownership without a husband’s consent, are significant in a number of countries: Almost 90 percent of the economies the world over have at least one such restriction; some of them have numerous legal restrictions, with some 28 countries having in place 10 or more restrictions on women participation (Gonzales et al, 2015). এখন আমাকে বলুন কোথায় আছে যে পুরুষদের সম্পদের জন্যে নারীর অনুমতি লাগবে? আপনার নিশ্চয় জানা আছে যে এমনকি শিল্পোন্নত দেশে ট্যাক্স কোড পর্যন্ত এমনভাবে তৈরি করা আছে যে নারীকে বেশি ট্যাক্স দিতে হয়? আর নারীদের বেতনের/মজুরির বৈষম্য যে কি জিনিশ সেটা আপনার অফিসের সবার সিভি এবং বেতনের তালিকা নিয়ে দেখুন তা হলেই বুঝবেন। আর বাংলাদেশের গার্মেন্টসের কথা আমার চেয়ে আপনারা ভালো বোঝেন। বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অত্যাচার অবিচার চালিয়ে তারপরে যদি বলেন নারীকে পুরুষের কাছে সাহায্যের আশায় হাত পাততে হবে, শুনতে তা মহানুভব শোনায় কিন্ত তা এই ব্যবস্থার পক্ষের সবচেয়ে বড় যুক্তি ছাড়া আর কি?

আপনি যদি বায়োলজিক্যাল পার্থক্যকে কারণ বলে মেনে নেন তাহলে আপনি এই যুক্তিকেই মেনে নেবেন যে নারী ‘পুরুষের’ কাজ করতে পারেনা; ‘পুরুষের’ কাজ কোনটা? রাজনীতি করা? দেশ চালানো? সম্পদের মালিক হওয়া? তাঁর স্বার্থের অনুকূলে আইন তৈরি? আর বায়োলজিক্যল কারণ যদি চূড়ান্ত হয় তবে সব নারী আত্মহত্যা করছে না কেন? আবার অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নারীরা কেন বেশি আত্মহত্যা করে, মানসিকভাবে অসুস্থ্য হয়? কেন তুলনামূলকভাবে গ্রামীন নারীরা বেশি আত্মহত্যা করে? ফলে যখন আপনি এই ‘বায়োলজিক্যাল’ যুক্তির আশ্রয় নিচ্ছেন তখন আপনি কাঠামোর পক্ষেই দাড়াচ্ছেন। তাঁর মানে কি পার্থক্য অস্বীকার করছি? না, তা করছিনা। আপনার-আমার পার্থক্য আছে। কিন্ত সেটাকে যখন অসমতার পক্ষের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার হয় – কালো মানুষ, নারী, আদিবাসী সবই তখন ‘যুক্তিপূর্ণ’ মনে হবে। ‘ডিসিপ্লিন’ তৈরির জন্যে যে বাধ্য শরীর (ডসাইল বডি) দরকার তা তো গিডেন্স এবং ফুঁকো আমাদের ভালো করেই বোঝাতে পেরেছেন। তাঁর উদাহরণ হচ্ছে – পুরুষ তাঁর শরীর নিয়ে কি করবে এই নিয়ে আইন নেই, কিন্ত নারী গর্ভপাত করাতে পারবে কিনা সেই নিয়ে আইনের অভাব নেই; সেখুন নারী কি পড়বে সেটা নিয়ে রাষ্ট্রের মাথা ব্যথার শেষ নেই – ‘সেক্যুলারিস্ট’রা বুরকিনি নিষিদ্ধ করে, ইসলামিস্টরা করে বিকিনি/সুইম স্যুট। তাঁর জন্যে আইন, ধর্মের দোহাইয়ের শেষ দেখিনা।

ডমিন্যান্ট একাডেমিক ডিসকোর্সে বায়োলজিক্যল ডিফারেন্স অগ্রাহ্য হয়েছে বলাটা ঠিক না, কেননা সেটা গিভেন। ফলে এই জায়গায় দোষ খোজার চেষ্টা না করাই ভালো। তদুপরি এই নিয়ে আলোচনা হয়েছে বিস্তর। কিন্ত এই অজুহাতে জেন্ডার কনশট্রাকশনের বিষয়টিকে একেবারে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টাকে ইংরেজিতে বললে ‘প্যাথেটিক’ বলতে হবে।

Riaz Uddin
“জীববৃত্তীয় পার্থক্য” আর “কনস্ট্রাক্ট” এই দুইয়ের টানাপোড়েনে আলোচনা অনেক হলেও এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞান আর সমাজবিজ্ঞান এই দুইএর মধ্যে আলোচনা কম। কিন্তু প্রশ্নগুলো মেটা এনালিটিকাল এবং মাল্টিডিসিপ্লিনারি মনযোগের দাবি রাখে। কিয়দংশে এটা ট্যাবু, এমনকি পশ্চিমেও; যদিও সেটা অনেকাংশেই কেটে যাচ্ছে বলে আমার ধারনা।

আপনার মন্তব্য থেকে কিছুটা নিশ্চিত হলাম সম্ভবত জীববৃত্তীয় পার্থক্য নিয়ে আলোচনা না করার কারণটি বায়োলজিকাল ডিটার্মিনিজমকে মেনে নেবার আশংকা থেকে উদ্ভুত। যা ঘটছে সেটাকে অনিবার্য যাতে মনে করতে না হয় এই শুভবুদ্ধি থেকে এই প্রবনতার উদ্ভব। কিন্তু আপনার আলোচনা থেকেই দেখা যাচ্ছে ইম্পিরিকাল তথ্যকে কীভাবে পড়া হচ্ছে সেটার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। আর সে ধরনের উপাত্ত বা তথ্য জেনারেট করার কাঠামোও কিন্তু অনেক ধরনের। সেট মনোবিজ্ঞান, বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান, জেন্ডার বিশ্লেষণ ইত্যাদি নানা ডিসিপ্লিনের ভেতর থেকেই আসা সম্ভব। কিন্তু লক্ষ্যনীয় হচ্ছে এই বিষয়ে আলোচনাটিতে ডিসিপ্লিনারি বায়াস বেশ গভীর। গিডেন্স বা ফুকোর রেফারেন্সও সে দিক থেকে সারপ্রাইজ নয়। গিডেন্সের “স্ট্রাকচার এজেন্সির” আলোচনা আর ফুকোর পাওয়ারের আলোচনা পলিটিকাল স্ফিয়ারের ডমিনেন্সের দিকেই দিক নির্দেশ করে। কিন্তু পাওয়ার কাকে এম্পাওয়ার করছে, কার এজেন্সি প্রসারিত হচ্ছে আর তাতে প্রাতিষ্ঠানিক এবং সামাজিক প্রেক্ষিত বা কননিঞ্জেন্সি কী ভূমিকা রাখতে পারে এগুলোকে মেটা এনালিটিকাল ফ্রেমে আনতে পারলেই অনেক কিছুই অর্জন করা সম্ভব। .

কিন্তু এখন পর্যন্ত আলোচনা বেশিরভাগ পলিটিকাল প্রেমিসের উপর নির্ভরশীল থেকেছে । এখানে বিজ্ঞান ও বিশেষত মনস্তত্ব আর আরো বিশেষত বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে আছে। অস্বিকার করার উপায় নেই যে বায়োলজিকাল পার্থক্য যেটাকে আপনি “গিভেন” বলছেন সেখান থেকে জেন্ডার রোলের পার্থক্য নিয়ে জেনারালাইজেশান হতে পারে, এবং অতীতেও হয়েছে — কিন্তু গত কয়েক দশকে এমন কিছু নতুন জ্ঞানের উদ্ভব মনস্তত্ত্ব আর বিশেষত বিবর্তনীয় মনস্তত্ত্বে ঘটেছে যেটা মনে করিয়ে দেয়, এটা জরুরী নয়। বায়োলজিকাল পার্থক্যের সাথে নেগোসিয়েশান নারীর বিপক্ষেই যাবে সেটাও জোর দিয়ে বলা যাবে না। আমাদের প্রচলিত ডিসকোর্সের প্যাটার্ন যদিও সেই আশংকাকে জোরালো করে, সেখানে নতুন আলো ফেলার সুযোগ আছে। অবশ্যই ফেসবুকের আলোচনা এই ধরনের ইন্টারডিসিপ্লিনারি আলোচনার উপযুক্ত পরিসর নয়, কিন্তু জেন্ডার পার্থক্যকে ট্যাবু হিসাবে না দেখা, আর বিজ্ঞান-মনস্তত্ত্ব ইত্যাদি জ্ঞানের ইম্পিরিকাল কাঠামোকে জেন্ডার প্রশ্নে সমন্বিত করার মাধ্যমে সেই প্রক্রিয়ার সূচনা হতে পারে। নর্মেটিভ আর পজিটিভের মধ্যে সমন্বয় ছাড়া এই ডিসকোর্স একই জায়গায় আটকে থাকবে বলে আশংকা করি। তবে এই দুই প্রান্তের সমন্বয়ের জন্য মনস্তত্ত্ব আর জেন্ডার দুই ক্ষেত্রেই আরো অগ্রগতি প্রয়োজন।

আপাতত একটি পেপারের লিঙ্ক দিচ্ছি যেখানে এই বিষয়ে মেটাএনালিটিক স্পেস সম্পর্কে কিছু ইঙ্গিত মিলবে।
http://www.bradley.edu/dotAsset/196924.pdf

বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আত্মহত্যার দু’টি ধরন আছে – পরিকল্পিতভাবে এবং আবেগ তাড়িত হয়ে আত্মহত্যা৷ বাংলাদেশে অধিকাংশ আত্মহত্যার ঘটনা আবেগ তাড়িত হয়ে ঘটে৷ এ কারণে তরুণ-তরুণীরাই বেশি আত্মহত্যা করেন৷ তাছাড়া নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হওয়ার কারণ আমাদের আর্থ সামাজিক অবস্থা৷ নির্যাতন, ইভটিজিং, যৌতুক, অবমাননা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা ইত্যাদি৷”

তিনি জানান, ‘‘আসলে শহর বা গ্রাম নয় আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি কম হয় অঞ্চলভেদে৷ আত্মহত্যার উপকরণের সহজলভ্যতা আত্মহত্যা একটি বড় কারণ৷ আবার আত্মহত্যার ঘটনা প্রচার হলে বা কেউ প্রত্যক্ষ করলে অনেকের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি হতে পারে৷”

চিকিৎসকেরা বলছেন, যাঁরা আত্মহত্যা করেন তাঁদের ৯৫ ভাগই কোনো না-কোনো মানসিক রোগে ভোগেন৷ তাজুল ইসলামের কথায়, ‘‘এই মানসিক বোগের সঠিক চিকৎসা করা গেলে আত্মহত্যা কমবে৷ মাদকাসক্তি আত্মহত্যা প্রবণতার জন্য একটি বড় কারণ৷ তাই মাদকাসক্তদের চিকিৎসা এবং মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া দরকার৷”

বাংলাদেশে মানসিক রোগের চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ২০০৷ জেলা পর্যায়েই মানসিক রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই৷ শুধু ২২টি মেডিক্যাল কলেজ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও পাবনার হাসপাতালে মানসিক রোগের চিকিৎসা হয়৷ ডা. তাজুল ইসলাম জানান, ‘‘যত লোক আত্মহত্যা করেন, তার অন্তত ১০ গুণ লোক আত্মহত্যার চেষ্টা করে বেঁচে যান৷ কিন্তু তাঁরা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন৷ সঠিক মানসিক চিকিৎসা না হলে তাঁদের বড় একটি অংশ আবারো আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারেন৷”

আত্মহত্যা নিয়ে গোটা বিশ্বে উদ্বেগ আছে৷ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) হিসাবে, ১৫-৪৪ বছর বয়সি জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা৷ ডাব্লিউএইচও আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রতিবছর সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মঘাতী হবেন৷ আত্মহত্যার চেষ্টা চালাবেন এর কমপক্ষে ১০ থেকে ২০ গুণ মানুষ৷

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে আত্মহত্যার প্ররোচনা ও আত্মহনন একটি ফৌদজারী বা শাস্তিযোগ্য অপরাধ৷ তবে যিনি আত্মহত্যা করেন, তাঁকে আর এই শাস্তি দেয়ার সুযোগ থাকে না৷ -ডচভেলে

2 Comments

Leave a Reply