ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত: অনিশ্চিত সময়ে অস্থিতিশীল অঞ্চলে আরেক আগুনের খেলা

Spread the love

ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুসালেমকে স্বীকৃতি দেয়ার মধ্য দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে মধ্যপ্রাচ্যের আগুনে ঘৃতাহুতি দিলেন সে বিষয়ে ভিন্নমতের অবকাশ নেই। ১৯৯৫ সালে মার্কিন কংগ্রেস ‘জেরুসালেম দুতাবাস আইন’ বা জেরুসালেম এ্যাম্বেসি এ্যাক্ট’ পাশ করলেও প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং বারাক ওবামা এই আইনের বাস্তবায়ন করেন নি। ওই আইনের ভেতরে এই ব্যবস্থা ছিলো যে প্রেসিডেন্ট জাতীয় নিরাপত্তার বিবেচনায় ছয় মাসের জন্যে তা স্থগিত রাখতে পারবেন; এই তিন প্রেসিডেন্টই তা উপুর্যপুরিভাবে ব্যবহার করেছেন। প্রতি ছয় মাস পরে পরে স্থগিতাদেশ নবায়ন করা হয়েছে। এই মাসে নবায়নের নির্ধারিত সময়ে তা না করায় এটা স্পষ্ট ছিলো যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ঘোষনা দেবেন। প্রার্থী হিসেবে ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার সময়ে গত বছর এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি বিজয়ী হলে তিনি ঘোষনা দেবেন। ফলে এই পদক্ষেপ কোনো বিস্ময়ের বিষয় নয়। তবে এটাও ঠিক যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বছরে ৭ অক্টোবর এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যে আরেকবার চেষ্টা না করা পর্যন্ত তিনি দুতাবাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেবেন না। ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালন করেছেন বলার পাশাপাশি এটাও বলা দরকার যে, তিনি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিয়েই তিনি এই পদক্ষেপ নিলেন, যা ঐ অঞ্চলে আর বেশি সহিংসতার পথই খুলে দিল। তাঁর জামাতা জেরেড কুশনারের লোক দেখানো শান্তি আলোচনার সাফল্য বা ব্যর্থতা কোনোটার জন্যেই তিনি অপেক্ষা করেন নি।

ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে তিনটি প্রশ্ন উঠছে; প্রথমত আসলেই দূতাবাস তেল আভিভ থেকে এখনই সরে যাবে কিনা; দ্বিতীয়ত তিনি কেন এই সিদ্ধান্ত নিলেন; তৃতীয়ত এর স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী ফল কি হবে। কোনো কোনো বিশ্লেষক বলছেন যে এই ঘোষণার মূল্য প্রতীকী মাত্র, কেননা দূতাবাস সরানো সহজ কাজ নয়। লন্ডনে মার্কিন দূতাবাস শহরের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতেই এক দশক লেগে যাচ্ছে, এটাকে তাঁরা উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করছেন। এটা একার্থে বিবেচ্য হলেও মনে রাখতে হবে যে, জেরুসালেমে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কনস্যুলেট ভবন আছে, পররাষ্ট্র দফতর চাইলেই তাকে দূতাবাসের মর্যাদায় উন্নীত করতে পারে। তাছাড়া ইসরাইল ১৯৮৯ সালে পূর্ব জেরুসালেমে যুক্তরাষ্ট্রকে দুতাবাসের জন্যে একটি জমি ইজারা দিয়েছে যা এখনও খালি পড়ে আছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য তাঁর ভাষণে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে নতুন ভবন নির্মানের পরেই সেখানে দূতাবাস স্থানান্তর করা হবে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, পুর্ব জেরুসালেমকে ইসরাইল দখল করলে ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ তার নিন্দা করে এবং তার পরে সব দেশই তাঁদের দুতাবাস জেরুসালেম থেকে সরিয়ে নেয়। পৃথিবীর ৮৮ টি দেশের দূতাবাস আছে তেল আভিভে, জেরুসালেমে কারোই দূতাবাস নেই। ফলে এই সিদ্ধান্তকে কেবল প্রতীকী বলার কারণ নেই। তা দ্রুত বাস্তবায়নের বিবেচনা ট্রাম্পের আছে বলেই মনে হয়।

দ্বিতীয়ত তাঁর এই সিদ্ধান্তের কারণ কী? আপাতদৃষ্টে আমরা চারটি কারণ চিহ্নিত করতে পারি। প্রথম কারণ হচ্ছে দেশের ভেতরে তাঁর রক্ষণশীল সমর্থকদের সন্তষ্ট করা। দক্ষিনপন্থী ইভানজেলিকাল খৃষ্টান সমর্থকদের তিনি দেখাতে চাইছেন যে, তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পালন করেছেন। ক্ষমতায় ট্রাম্পের এক বছর হতে চলেছে, কিন্ত সাফল্যের ঝুলি খালি। ২০ জানুয়ারি বর্ষপূর্তির সময় তাঁর এক বছরের হিসেবে নিকেশ শুরু হবে এবং সে সময় তাঁর সমর্থকদের জন্যে এটা হবে এক বড় হাতিয়ার। শুধু তাই নয়, ইসরাইলের রক্ষণশীল অংশের সমর্থক, যারা ট্রাম্পকে নির্বাচনে অর্থ জুগিয়েছিলেন তারাও খুব খুশি ছিলেন না। কিছু দিন আগে পলিটিকো’তে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিলো যে, লাস ভেগাসের ক্যাসিনো ব্যবসায়ী শেল্ডন এডেলসন, যিনি ২০১৬ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে ২৫ মিলিয়ন ডলার দিয়েছেন, তিনি ট্রাম্পের ওপরে ক্ষুব্ধ কেননা ট্রাম্প জেরুসালেম বিষয়ে তাঁর প্রতিশ্রুতি পালন করেন নি। বলাই বাহুল্য ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ট্রাম্পের ওপরে চাপ রেখেছিলেন। দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে রাশিয়ার সঙ্গে যোগসাজস বিষয়ে তদন্ত থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেয়া। ইতিমধ্যেই এটা স্পষ্ট যে ট্রাম্পের সহযোগীদের সম্ভাব্য রাশিয়া যোগাযোগ রবার্ট মূলারের কমিটি খুঁজে পেতে শুরু করেছে। দেশের অভ্যন্তরের এই সমস্যা মোকাবেলার কৌশল হিসেবে এখন যে কোনো ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নেবেন এমন ভাবা মোটেই অবাস্তব নয়। তৃতীয় কারন হচ্ছে এ যাবত ট্রাম্পের পররাষ্ট্র বিষয়ক সিদ্ধান্তগুলোর দৃশ্যমান ব্যর্থতা। উত্তর কোরিয়া বিষয়ে তাঁর যুদ্ধংদেহী মনোভাব যে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটিয়েছে তা সহজেই বোঝা যায়। অন্যদিকে সৌদি আরবের যে নীতির প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন সমর্থন দিয়েছে – তা কাতার প্রশ্নেই হোক কি ইয়েমেন প্রশ্নেই হোক, এমনকি অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা বদলের ব্যাপারেই হোক, তাতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। চতুর্থ কারণ হচ্ছে ট্রাম্পের দায়িত্বজ্ঞানহীন অস্থির আচরণ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং সাময়িক আলোচনাকে বেশি মূল্য দেন।

এই সিদ্ধান্তের আশু এবং দীর্ঘ মেয়াদী ফল কী হবে? এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মিত্রই যে একমত হতে পারেনি তাতেই বোঝা যাচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক সমাজ থেকে যুক্তরাষ্ট্র আরো বেশি বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ইতিমধ্যেই হ্রাস পেয়েছে। এই সিদ্ধান্ত সেই প্রক্রিয়াকে আরো ত্বরান্বিত করলো। মধ্যপ্রাচ্যে যে সব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে আসছে, যেমন জর্ডান, তাঁদের জন্যে এই সিদ্ধান্ত বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে। ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নেতৃত্বের জন্যে ইরান এবং সৌদি আরবের যে প্রতিযোগিতা এই সিদ্ধান্ত তাতে আরো এক মাত্রা যুক্ত করলো। যদিও সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাঁর আপত্তি জানিয়েছেন তথাপি তাঁর পক্ষে এই বিষয়ে ইরানের মতো শক্ত অবস্থান নেয়া সম্ভব হবে না, এতে করে এই অঞ্চলে ইরানের গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে। আরব লীগের প্রধান হিসেবে তুরস্ক নিঃসন্দেহে আরো বেশি সক্রিয় হবে। এই অঞ্চলে রাশিয়ার প্রভাব ইতিমধ্যেই ক্রমবর্ধমান; এই পরিস্থিতি সেই প্রভাব বৃদ্ধিতে নিশ্চয় সাহায্য করবে। ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব না চাইলেও ইসরাইল অধিকৃত এলাকায় আরেক দফা ইন্তেফাদার সূচনা হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। কেননা এটা বলা মোটেই অতিরঞ্জন নয় যে, এই ঘোষণা ‘দুই-রাষ্ট্র’ সমাধানের পথে একটা পাহাড় বসিয়ে দিলো, সেই পাহাড় আদৌ সরানো যাবে কীনা তা আমরা জানিনা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বক্তৃতায় যদিও বলেছেন যে, তাঁর এই সিদ্ধান্ত জেরুসালেমের চূড়ান্ত স্ট্যাটাস বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অবস্থান নির্দেশ করে না কিন্ত বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ দিনের কাগুজে নিরপেক্ষ অবস্থানেরও অবসান ঘটলো। এই সব প্রভাবের বাইরে যা ঘটবে তা হচ্ছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই ঘোষণা দেশে দেশে সহিংস উগ্রপন্থীদের, বিশেষত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর জন্যে প্রচারণার বড় উপাদান হয়ে উঠবে। এসব আগামীকালই ঘটবে তা নয়, কিন্ত এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে এক নতুন পরিস্থিতির সূচনা হল। ক্রমাগতভাবে পরিবর্তনশীল, অনিশ্চিত, সহিংস একটি সময়ে যুদ্ধে জর্জরিত অস্থিতিশীল একটি অঞ্চলে অস্থিশীলতার আরেকটি উপাদান যুক্ত হল; এর পরিণতি যে ইতিবাচক হবে না সেটা আমরা জানি, কিন্ত কতটা নেতিবাচক হবে সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।

ইলিনয়, ৬ ডিসেম্বর রাত ৮টা

About আলী রীয়াজ

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক । তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিইচ-ডি ডিগ্রি লাভ করেন। ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেওয়ার আগে অধ্যাপক রীয়াজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বৃটেনের লিংকন বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ল্যাফলিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। এ ছাড়া তিনি লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। ইংরেজিতে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দশটি। এর মধ্যে রয়েছে– ‘পলিটিক্যাল ইসলাম এন্ড গভর্নেন্স ইন বাংলাদেশ’ (২০১০), ‘ফেইথফুল এডুকেশন : মাদ্রাসাজ ইন সাউথ এশিয়া’ (২০০৮) এবং ‘গড উইলিং – দি পলিটিক্স অব ইসলামিজম ইন বাংলাদেশ’ (২০০৪)। বাংলা ভাষায়ও তাঁর অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ‘স্টাডিজ অন এশিয়া’ জার্নালের সম্পাদক। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এবং রাজনৈতিক ইসলাম বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তাঁর স্বীকৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি ২০১২ সালে ডক্টর রীয়াজকে ‘ইউনিভার্সিটি প্রফেসর’ পদে ভূষিত করে। ২০১৩ সালে তিনি ওয়াশিংটনে উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারস-এ পাবলিক পলিসি স্কলার হিসেবে কাজ করেন।

View all posts by আলী রীয়াজ →

Leave a Reply