নিখোঁজ ১০ কোটি ডলারঃ কিছু প্রশ্ন

Spread the love

যুক্ত্ররাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে স্থিতি একাউন্টে গচ্ছিত বাংলাদেশ ব্যাংকের উধাও হয়ে যাওয়া ১০ কোটি ডলারের ঘটনা নিয়ে যত প্রশ্ন উঠছে সেই তুলনায় উত্তর পাওয়া যাচ্ছে কম। সব প্রশ্নের উত্তর চটজলদি পাওয়া যাবে না, এটা অনস্বীকার্য। তার জন্যে তদন্ত লাগবে, আইনি ব্যবস্থা লাগবে। কিন্ত এই সব বিষয়ে কি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে সেটা জানা না থাকায় কেবল ‘রহস্য ঘনীভূত’ হচ্ছে বললে সামান্যই বলা হয়।

অনেক খবরের উৎস দেশের বাইরে, অনেক খবর বাংলাদেশের গণমাধ্যমে আসছে যেগুলো বিদেশি সংবাদ সংস্থার দেয়া। বাংলাদেশী গণমাধ্যমগুলো এই বিষয়ে নিজেরা অনুসন্ধান করে নতুন কিছু জানিয়েছেন এমন আমার চোখে পড়েনি। আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে প্রথমে ঘটনার স্বীকৃতির বাইরে আজকে যে বিবৃতি দেয়া হয়েছে তাতে দেয়া তথ্য কেবল ঘটনার বর্ননা মাত্র। তাতে বলা হয়েছে যে “বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফটের (সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফিন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন-এসডব্লিউআইএফটি) ‘অথেনটিক’ বার্তা বা সংকেত থেকে ৩৫টি পরামর্শ বা অর্থ পরিশোধের নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে।” এ তথ্যগুলো আসলে নতুন কিছু নয় এই কারনে যে ইতিমধ্যেই তা গণমাধ্যমে প্রকাশিত।

তদন্তের স্বার্থে যদি বিস্তারিত না বলা যায়, সেটা বোধগম্য। যে দেশে খুনের ঘটনায় আটক ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের আগে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করার ধারা তৈরি করা হয়েছে (এই বিষয়ে আদালতের নির্দেশনাও কাজে দেয়া নি) সেখানে এই ধরণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নাগরিকদের আশ্বস্ত করার তাগিদ কেন অনুভূত হয় না সেটা বোঝা মুশকিল। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, “সাইবার আক্রমণের ঘটনায় হারানো তহবিলের অঙ্ক নিয়ে কোনো কোনো মহলে অতিরঞ্জিত তথ্য প্রচার করা হচ্ছে”। অতিরঞ্জিত ‘তথ্য’ প্রচারের কারন হচ্ছে তথ্যের অভাব। যেখানে দায়িত্বশীল মহলের পক্ষ থেকে তথ্য দেয়া হয় না সেখানে গুজব ডালপালা মেলে; এটা নতুন কিছু না।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সাবেক গভর্নরের বক্তব্য সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে; তিনি বলেছেন – ‘ভেতরের কোনো সম্পৃক্ততা ছাড়া এ ধরনের হ্যাকিং সহজ নয়।’ যে কেউ এই কথা বললে আমলে নেয়ার দরকার ছিল না, অন্তত আমি খুব কম গুরুত্ব দিতাম। কিন্ত যিনি এই প্রতিষ্ঠান সাফল্যের সঙ্গে চালিয়েছেন তিনি যখন বলেন তখন তাকে অবজ্ঞা করা সম্ভব নয়। আজকে রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের সিস্টেমে ঢুকে পেমেন্ট ট্রান্সফারের ক্রেডেনশিয়াল চুরি করে। এরপর ভুয়া সুইফট মেসেজের মাধ্যমে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভকে অর্থ স্থানান্তরের অনুরোধ পাঠানো হয়।” বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নরের এই কথা মানতেই হবে, যে, “যদি বাংলাদেশ ব্যাংককে একতরফা দোষারোপ করে যাই, তাহলে তো ঠিক হবে না। আবার যদি বলি বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনোই দোষ নেই, তাহলে যদি কেউ দোষ করে থাকে তাদের আড়াল করছি।” কিন্ত বর্তমান গভর্নর, কমপক্ষে একজন মুখপাত্র, কি আমাদের সাহস জোগানোর জন্যে হলেও বলতে পারতেন কি ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে?

ইতিমধ্যে তদন্তের জন্যে রাকেশ আসথানার নেত্তৃত্বাধীন ওয়ার্ল্ড ইনফরমেটিক্স এবং তাঁদের পরামর্শে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি ভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা-বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ফায়ারআই ম্যান্ডিয়েন্টের ফরেনসিক বিভাগকে যুক্ত করা হয়েছে। আমার ভুল না হলে এদের নিয়োগ ও তত্ত্বাবধান করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা আমার উদ্দেশ্য নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাও আমার লক্ষ্য নয় – আমার প্রশ্ন এদের নিয়োগ ও তত্ত্বাবধান কি অন্য কারও হাতে থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল?

এই পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলদেশ সরকার, বিশেষত অর্থ মন্ত্রনালয়ের, ভাষ্য জানা যায় নি, অর্থমন্ত্রীর ‘মামলা করবো’ হুমকিকে আমি সরকারী ভাষ্য মনে করতে নারাজ। দেশে যে সংসদ আছে, সেখানে যে সদস্যরা আছেন তাঁরা কী এই বিষয়ে কোন পদক্ষেপের কথা ভেবে দেখেছেন? পদক্ষেপ নিতে না পারুন, ভেবে দেখেছেন কি না সেটাই জানতে চাচ্ছি। ফিলিপাইনের সিনেটের জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহি ও তদন্ত বিষয়ক কমিটি ১৪ মার্চ পাবলিক হেয়ারিং (প্রকাশ্য শুনানী)-এর ব্যবস্থা করেছে। এ ছাড়া ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন এবং সরকারের নিয়ন্ত্রনাধীন ‘ফিলিপাইন গেমিং এন্ড এমিউসমেন্ট কর্পোরেশন’ তদন্ত শুরু করেছে। আর রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের তদন্ত তো আছেই।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত আলাপ আলোচনা থেকে এই ধারণাই জন্মাচ্ছে যে, বিষয়টি যেন নেহাতই প্রযুক্তিগত বিষয়। এই ঘটনার একটি প্রধান দিক প্রযুক্তি এবং প্রাযুক্তিক দুর্বলতা; কিন্ত সেটাই একমাত্র প্রধান দিক নয় । জবাবদিহি এবং দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রশ্ন এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। সেগুলোকে বাদ দিয়ে কেবল প্রযুক্তি বিষয়ে জোর দেয়ারও একটা অর্থ দাঁড়ায়।

একটা পুরনো কথায় ফিরে আসি, বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো এই বিষয়ে অনুসন্ধানের কোনো চেষ্টা করেছেন কি? না করলে সেটা তাঁদের আগ্রহের অভাব বলে মনে করার কারন নেই; তা হলে কি অভিজ্ঞতা, প্রশিক্ষনের অভাব নাকি অন্য কিছু?

About আলী রীয়াজ

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক । তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিইচ-ডি ডিগ্রি লাভ করেন। ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেওয়ার আগে অধ্যাপক রীয়াজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বৃটেনের লিংকন বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ল্যাফলিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। এ ছাড়া তিনি লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। ইংরেজিতে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দশটি। এর মধ্যে রয়েছে– ‘পলিটিক্যাল ইসলাম এন্ড গভর্নেন্স ইন বাংলাদেশ’ (২০১০), ‘ফেইথফুল এডুকেশন : মাদ্রাসাজ ইন সাউথ এশিয়া’ (২০০৮) এবং ‘গড উইলিং – দি পলিটিক্স অব ইসলামিজম ইন বাংলাদেশ’ (২০০৪)। বাংলা ভাষায়ও তাঁর অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ‘স্টাডিজ অন এশিয়া’ জার্নালের সম্পাদক। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এবং রাজনৈতিক ইসলাম বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তাঁর স্বীকৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি ২০১২ সালে ডক্টর রীয়াজকে ‘ইউনিভার্সিটি প্রফেসর’ পদে ভূষিত করে। ২০১৩ সালে তিনি ওয়াশিংটনে উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারস-এ পাবলিক পলিসি স্কলার হিসেবে কাজ করেন।

View all posts by আলী রীয়াজ →

Leave a Reply