বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন, ড্রোন এবং নিরপরাধ সিম ব্যবহারকারীদের ঝুঁকি

Spread the love

অপরাধ কর্মকান্ডে টেলিকমিউনিকেশন প্রযুক্তি বিশেষ ক’রে অপরাধীদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য সেলফোনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারসহ তথাকথিত সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপেই মূলত বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশনকে বিশ্বরাজনীতিতে তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রের নাগরিকের জন্যই বিভিন্ন উপায়ে ক্রমান্বয়ে বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে।এতে কী ধরনের বিপদ তৈরি হয়, তা নিয়ে কম-বেশী আলোচনা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত অনেক আলোচনা যেমনঃ ব্যক্তিগত তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ, কোন কর্তৃপক্ষ এগুলো সংরক্ষণ করবে, প্রাইভেট বনাম পাবলিক ইত্যাদি চায়ের-আড্ডায় ঝড় তুলছে। তবে নিরাপরাধ কেউ যে ঝামেলায় পড়তে পারে, তা এই আলোচনা-বিতর্কগুলোর মূলকেন্দ্রে।

তবে বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন ঝুঁকি অনুধাবন করার ক্ষেত্রে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। কেননা বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের কারণে নিজের দৈহিক পরিচয় আর সিমের (SIM) পরিচয় মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। সিমের পরিচয়ই আমাদের নিজেদের আত্ন-পরিচয়!  সরকারের বা প্রাইভেট কোম্পানীর কাছে আমাদের আলাদা আর কোনো অস্তিত্ব থাকছেনা। ২০১৪ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুলে তেহরিকী তালিবানের সন্ত্রাসী আক্রমনে ১৩২জন শিশুসহ ১৪১জন নিহতহয়।এই সন্ত্রাসী ঘটনায় খুনীরা পাঁচটি সিম ব্যবহার করে, যা একজন মহিলার নামে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছিলো। ঐ মহিলাকে গ্রেফতার করা হলেও তিনি এই পাঁচ সিমের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না বলে পত্রিকাগুলো জানিয়েছিলো।

এখানেই শেষ নয়! আমরা আরো বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছি সরকারের সেলফোন সেট রেজিস্ট্রেশনের দ্বিতীয় পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে।এবার সেটের পরিচয় মানেও আমাদের পরিচয়। এই ধরণের আয়োজনের ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের নামে আসলে সামরিক কৌশলগতভাবে যে কোনো ব্যক্তিকে নিজ রাষ্ট্রের এবং বহিঃরাষ্ট্রীয় সরকার (বিশেষ ক’রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও দক্ষিন এশিয়াতে তার প্রধান সহযোগী ভারত সরকার) নজরদারীতে সার্বক্ষনিক রাখা হয়।এই ধরণের কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার ড্রোন আক্রমন করে, ঐ নজরদারীর আওতাভূক্ত ব্যক্তিকে বিচারবহির্ভূত হত্যার উদ্দেশ্যে। এক্ষেত্রে ব্যক্তিটিকে চিহ্নিত করা হয় ফোনের সিম এবং সেটের পরিচয়ে, ফোন ব্যবহারকারীর নিজস্ব আলাদা দৈহিক পরিচয়টা কোনোভাবেই গুরুত্ব পায়না। তার বড় প্রমাণ হলো মার্কিন নাগরিক আনোয়ার আওলাকির ১৬ বছরের নিরাপরাধ ছেলে আব্দুর রহমান আওলাকিকে ইয়েমেনে ড্রোন দিয়ে ২০১২ সালে হত্যা। ছেলেকে মেরে ফেলার দুই সপ্তাহ আগেই সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে আনোয়ার আওলাকিকে একইভাবে সিআইএ বিচারবহির্ভূত হত্যা করেছিলো।

অনেকের ধারণা, আব্দুর রহমান তার বাবার সেলফোন ব্যবহার করছিলো, ড্রোন আক্রমনের আগ মুহুর্তে। সিম এবং সেটের আইএমএসআই (IMSI) ওআইএমইআই’র (IMEI) সিরিয়াল নম্বর দিয়ে তারা চিহ্নিত ব্যক্তির উপর নজরদারী করে। অর্থাৎ সেট আর সিম যার নামে রেজিস্ট্রেশন তার পরিচয়ই শেষ কথা, ব্যবহারকারী যেই হোক না কেন।ধরুন, কেউ যদি রাস্তা থেকে সস্তায় পুরোনো সেট কিনে, আর যদি সেটার রেজিস্ট্রেশন এমন কারো নামে যে কিনা সরকারের নজরদারীতে, তাহলে সরকার কর্তৃক বিপদগ্রস্ত হবে পুরোনো সেলফোনসেটটির ক্রেতা নিজেই!

সম্প্রতি প্রকাশিত মার্কিন সাংবাদিক জেরেমি স্ক্যাহীলের দি এ্যাসাসিনেশন কমপ্লেক্স (The Assassination Complex) নামের বইটি এটা নিশ্চিত করেছে। বইটিতে সিআইএ কর্তৃক তৈরি নীচের ভৌগোলিক অবস্থানগত নজরদারী তালিকার (Geolocation Watchlist) ছবিটি দেওয়া হয়েছে, বুঝার জন্য কীভাবে আইএমএসআই ও আইএমইআই’র সিরিয়াল নম্বরের মাধ্যমে ড্রোন আক্রমনের জন্য নজরদারী করা হয় কোনো ব্যক্তিকে, যাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের স্বার্থ বিরোধী মনে করে।নীচের ছবিটিতে লক্ষ্য করুন ACTION=WARN; DO NOT STRIKE; POSS ASSISTANT TO; KIDNAPPING SUSPECT; KIDNAPPING VICTIM ইত্যাদি শব্দগুলো।

 

13177648_10153923923666281_1843832046899912103_n

নিরপরাধ সেলফোন ব্যবহারকারীদের জন্য এরকম ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আমাদের মত রাষ্ট্রগুলো যেনতেনভাবে বাধ্যতামূলক সিম রেজিষ্ট্রেশনের নিশ্চিত করলেও উন্নত রাষ্ট্রগুলো কিন্তু উল্টো পথেই  চলছে। কানাডা, চেক রিপাবলিক, ব্রিটেন, নিউজিল্যাণ্ড প্রথমে বাধ্যতামূলক সিম রেজিষ্ট্রেশনের বিষয়টি বিবেচনা করলেও পরে তা থেকে সরে আসে। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলো, লন্ডনে ২০০৫ সালের সন্ত্রাসী আক্রমনের পরে বিশেষজ্ঞ দল যে গোপন প্রতিবেদন সরকারের কাছে পেশ ক’রে সেখানে তারা বাধ্যতামূলক সিম রেজিষ্ট্রেশন সন্ত্রাস দমনে খুব কার্যকরী কিছু নয় বলে উল্লেখ করে। শুধু তাই নয়, এমনকি মেক্সিকো ২০০৯ সালে বাধ্যতামূলক সিম রেজিষ্ট্রেশন চালু করলেও তিন বছর পরে অর্থাৎ ২০১১ সালে তা প্রত্যাহার ক’রে নেয়। ছয়টি কারণের প্রেক্ষিতে বাধ্যতামূলক সিম রেজিষ্ট্রেশন সেখানে প্রত্যাহার করা হয়। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি কারণ হলোঃ ২০০৯-১০ সালে ফোনের মাধ্যমে চাঁদাবাজি ৪০% ও অপহরণের ঘটনা ৮% বেড়ে যাওয়া এবং  রেজিষ্ট্রার্ড সিমের তথ্য চুরি ও অপব্যবহার।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সিম ব্যবহারকারীদের জন্য এত ঝুঁকি থাকে সত্ত্বেও বায়োমেট্রিক রেজিষ্ট্রেশনের কেন বাধ্যমূলক করা হয়েছে। একটা ব্যাপারে উপসংহার টানা যায় যে সিম রেজিষ্ট্রেশনের সরকারের এই আয়োজন যত না নিজস্ব প্রয়োজন থেকে, তার চাইতে বেশী শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আনুগত্য এবং তাদের তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানানোর আগ্রহ থেকেই। সবচেয়ে বড় কথা অপরাধ বা সন্ত্রাস একমাত্র সেলফোন ব্যবহারের কারণেই সংঘটিত হচ্ছে, বিষয়টি এরকম নয়। সেলফোন যখন ছিলোনা তখনও এগুলো সংঘটিত হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার অপরাধ বা সন্ত্রাস দমনকে কখনো কখনো কঠিন ক’রে তুললেও অপরাধ বা সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা, মতাদর্শিক অবস্থান, সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আন্তরিকতা, গণতন্ত্রের চর্চা আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ।

 

 

 

 

 

 

About Mohammad Tanzimuddin Khan

মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে প্রথম এবং ওয়ারঊইক বিশ্ববিদ্যালয় (University of Warwick) থেকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতি বিষয়ে দ্বিতীয় মাষ্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন। অষ্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইংল্যান্ড (University of New England) থেকে রাজনৈতিক প্রতিবেশ বিষয়ে পিএইচডি করেছেন। তাঁর আগ্রহের বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক প্রতিবেশ।

View all posts by Mohammad Tanzimuddin Khan →

Leave a Reply