রাজনৈতিক সংকট, নির্বাচন ও কী ঘটতে পারে

Spread the love

রাজনৈতিক সংকটের রূপ
বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা সহজেই দৃশ্যমান। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নিকট ভবিষ্যতে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে কমবেশি সবাই চিন্তিত। সম্ভাব্য সেসব পরিস্থিতি বিবেচনা করতে হলে আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক এবং শাসন পরিস্থিতি থেকেই আলোচনার শুরু করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে নির্বাচন নিয়ে সংশয় ও সন্দেহের কারণ হচ্ছে বিরাজমান রাজনৈতিক সংকট।
যদিও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা সমস্বরে বলছেন যে সংবিধানে বিবৃত ব্যবস্থা অনুযায়ী যথাযথ সময়ে নির্বাচন হবে, তথাপি ইতিমধ্যে অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে, আদৌ নির্বাচন হবে কি না। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারাও এ ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। নির্বাচন হলেও তাতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের বাইরে আর কারা অংশ নেবেন, তার কোনো ধারণাই কারও কাছে নেই। ১৪-দলীয় জোটের শরিকেরা ছাড়া আর কারা নির্বাচনে অংশ নেবেন, এ বিষয়টি এই কারণে অস্পষ্ট যে এখন পর্যন্ত কোনো দলের নেতারা বলেননি যেকোনো পরিস্থিতিতে তাঁরা নির্বাচনে অংশ নেবেনই। সরকারের অংশীদার এবং সংসদে ‘বিরোধী দলের’ দাবিদার জাতীয় পার্টির বক্তব্যের সারাংশ দুর্বোধ্য। তাঁদের নেতারা ‘এই হলে ওই করব, ওই হলে এই করব’ ধরনের কথাবার্তা যতবার বলেছেন, তার কিয়দংশ বারও দ্বিধাহীনভাবে বলেননি যে তাঁরা নির্বাচনে অংশ নেবেনই। তাঁদের দ্বিধার কারণ হতে পারে যে সিদ্ধান্তের ভার তাঁদের হাতেই নেই অথবা রাজনীতির বাতাস কোন দিকে বইছে, সেই বুঝে পাল তোলার অপেক্ষায় আছেন নেতারা।
কিন্তু এর বাইরে যেসব রাজনৈতিক দল এবং জোট আছে—বড়, ছোট, মাঝারি; বামপন্থী-মধ্যপন্থী-ইসলামপন্থী নেতারা, তাঁরা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন কী পরিস্থিতিতে তাঁরা নির্বাচনে যাবেন। অর্থাৎ তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিতে চান। তাঁদের দাবিদাওয়ার স্বাভাবিক ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে দাবি পূরণ না হলে তাঁরা নির্বাচনে যাবেন না। এসব জোটের মধ্যে আছে নতুন গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোট, ২০-দলীয় জোট। তা ছাড়া দলগতভাবে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলসহ আরও অনেক দলও একই ধরনের দাবি করেছে। বিভিন্ন জোট ও দলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত যেসব দাবি তোলা হয়েছে, সেগুলোর দফাওয়ারি ভিন্নতা আছে, কিন্তু কিছু বিষয়ে ঐকমত্য সুস্পষ্ট। সেই ঐকমত্যের দাবিগুলো হচ্ছে নিরপেক্ষ প্রশাসনের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা এবং নির্বাচনের অনুকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করা।
রাজনীতির সংকটটা এখানেই। কেননা, প্রধানমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ বলেছে যে সংবিধানে যেভাবে লেখা আছে, তার বাইরে গিয়ে তাঁরা কোনো ব্যবস্থা নেবেন না এবং তাঁরা প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনায় বসবেন না। নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনিশ্চয়তার মূল কারণ হচ্ছে এই রাজনৈতিক প্রশ্নের সমাধান এখনো দৃশ্যমান নয়। কেননা, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনে করে না যে দেশে কোনো রাজনৈতিক সংকট আছে। ক্ষমতাসীনেরা মনে করে যে তাঁদের ‘সাংবিধানিক’ অবস্থান এবং বিরোধী দলের সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে তাঁদের পক্ষে এসব দাবি উপেক্ষা করেই ২০১৪ সালের মতো কিংবা অন্য কোনো আকারে নির্বাচন করা এবং সেই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হবে।
কিন্তু ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পরে এবং বিশেষ করে এ বছর অনুষ্ঠিত বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের পরে এটা স্পষ্ট যে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ করাই নির্বাচনের সততা (ইন্টেগ্রিটি) এবং সম্পূর্ণতা নিশ্চিত করে না; নির্বাচনের কোনো গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয় না। এসব অভিজ্ঞতা আবারও প্রমাণ করেছে, সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থা ও বিরাজমান শাসন পরিস্থিতিকে পাশ কাটিয়ে নির্বাচন বিষয়ে কথা বলা অর্থহীন। অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে অবাধ নির্বাচনের নিশ্চয়তা তৈরি করা। সেটা কেবল কথার কথা হিসেবে নয় বা তার দায়িত্ব কেবল নির্বাচন কমিশনের নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতির যেকোনো পর্যবেক্ষকই এটা জানেন যে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা সবার অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও অবাধ নির্বাচনের অনুকূল নয়। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে এই যে ক্ষমতাসীন দল ও জোটের নেতারা যখন নির্বাচনী প্রচারাভিযানে দেশের সর্বত্র চষে বেড়াচ্ছেন, সেই সময় সরকারবিরোধীরা কেবল যে সমাবেশের অনুমতিবঞ্চিত হচ্ছেন তা-ই নয়, এমনকি তাঁদের আবেদন বিবেচ্য হচ্ছে এমনও মনে হয় না। বারবার অনুরোধ করেও জাতীয় ঐক্য, যুক্তফ্রন্ট, নাগরিক ঐক্য ঢাকা ও ঢাকার বাইরে সমাবেশের অনুমতি পায়নি বলে তাঁরা অভিযোগ করেছেন। সরকারের পছন্দের না হলে সভা-সমাবেশ না করতে দেওয়ার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের কোনো রাখঢাক নেই; যে কারণে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, ‘কোনো দল রাজপথে নেমে মিটিং করবে, মিছিল করবে তার জন্য দেশ স্বাধীন করা হয়নি’ (যুগান্তর, ৬ অক্টোবর ২০১৮)। যার অর্থ হচ্ছে ক্ষমতাসীন দল ছাড়া আর কারও সভা-সমাবেশ বা প্রতিবাদ জানানোর কোনো অধিকার নেই। বিরোধী দলের সমাবেশ শান্তিপূর্ণ হোক অথবা না হোক, সমাবেশে অংশগ্রহণকারী, এমনকি অংশগ্রহণেচ্ছু রাজনৈতিক কর্মীদের আটক ও মামলা এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। দেশে ‘উন্নয়ন মেলা’র পাশাপাশি শুরু হয়েছে ‘গায়েবি’ মামলা। এসব মামলার শিকার জীবিত ব্যক্তিরা অন্তত এই ভেবে সান্ত্বনা পেতে পারেন যে তাঁরা বেঁচে আছেন। কেননা, মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী গত ৯ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন ৪০৩ জন এবং গুমের শিকার ৫৮ জন।
মতপ্রকাশের ক্ষেত্র কতটা সীমিত হয়েছে, তার উদাহরণ হচ্ছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রগ্রাহক শহিদুল আলমের অব্যাহত কারাবাসের মাঝখানেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইদুল ইসলামকে আটক করতে এবং তাঁকে রিমান্ডে পাঠাতে সরকারের তৎপরতা ছিল দর্শনীয়। এমন ঘটনার তালিকা বেশ দীর্ঘ। বিভিন্ন কথিত এবং কল্পিত অভিযোগে শিক্ষক থেকে তরুণ শিক্ষার্থী আটক হয়েছেন। আরা যাঁরা এখনো আটক হননি, তাঁদের হয় পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে অথবা আদালতের বারান্দায় বসে থাকতে হচ্ছে জামিনের আশায়। সবচেয়ে নিরপরাধ ব্যক্তিরও যে জামিন হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। ‘গুজবে’র অজুহাত তৈরি করে নিপীড়ন, হেনস্তার এক অভাবনীয় ধারার জন্ম হয়েছে। শুধু তাই নয়, একদিকে তথ্য মন্ত্রণালয়ে তৈরি করা হয়েছে ‘গুজব শনাক্তকরণ সেল’ অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকে ‘গুজব ঠেকাতে নতুন ইউনিট’ খোলার পরিকল্পনা হয়েছে।
এর মধ্যেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন জারি হয়েছে, যার আওতায় যে কাউকে কোনো রকম গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই আটক করা যাবে, তল্লাশি করা যাবে যেকোনো জায়গা, জব্দ করা যাবে যেকোনো রকমের ডিজিটাল ডিভাইস—সেটা এমনকি সংবাদপত্রের সার্ভার হলেও ব্যতিক্রম হবে না। তাতে করে সংবাদপত্র প্রকাশ বন্ধ হবে, কিন্তু সে জন্য সরকারকে এ অপবাদ সইতে হবে না যে তারা গণমাধ্যমের ওপরে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গণমাধ্যমের ওপরে নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সবাই অবহিত আছেন, সাংবাদিকতায় যুক্তরা যে এখন একধরনের ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ বা স্বতঃপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণ চর্চা করছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ নামের যে খড়্গে মরচে ধরেছিল, তাতে ভালো করেই শাণ দেওয়া হয়েছে। তিনজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী সম্পাদক পরিষদকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, মন্ত্রিসভায় এ আইন নিয়ে আলোচনা হবে, কিন্তু তা ঘটেনি। সম্পাদক পরিষদ একে ‘আস্থা ও বিশ্বাসের লঙ্ঘন’ বলেছে। এখন অবস্থা এমন যে মনের ভেতরে কী আছে, সেই বিবেচনায় আইন করা হচ্ছে। অপরাধ সংঘটন নয়, অপরাধের ‘চিন্তা’ই দোষী বলে চিহ্নিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট।
আরেকটি বিষয় এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে; এই প্রবণতাকে বর্ণনা করার জন্য বিশিষ্ট লেখক ও সামাজিক আন্দোলনের ব্যক্তিত্ব অরুন্ধতী রায়ের ভাষা ধার করতে চাই, ‘সেন্সরশিপ নাউ হ্যাজ বিন আউটসোর্সড টু দ্য মব’ (সেন্সরশিপের কাজ উন্মত্ত জনতার কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে)। ভারতের মতোই বাংলাদেশেও এই ‘উন্মত্ত জনতা’ তাদেরই আক্রমণ করে, যারা ভিন্নমতাবলম্বী। এই উন্মত্ততা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিষয় নয়, সব সময়েই
দৈহিকভাবে আক্রমণ না করলেও আক্রমণের ব্যাপ্তি বিশাল। রাজনৈতিক প্রণোদনা ছাড়া এগুলো তৈরির উপায় নেই।
এ পরিস্থিতি অবশ্যই গণতান্ত্রিক শাসনের বৈশিষ্ট্য নয়। এ শাসনকে আপাতদৃষ্টে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করা হলেও তা যে বড়জোর দৃশ্যত গণতান্ত্রিক, কিন্তু মর্মবস্তুর দিক থেকে কর্তৃত্ববাদী—তা বোঝা দরকার। এ ধরনের শাসনকে গণতন্ত্র-বিষয়ক গবেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ‘হাইব্রিড রেজিম’ বা দো-আঁশলা ব্যবস্থা বলে বর্ণনা করে থাকেন, যার প্রধান ভিত্তি হচ্ছে বলপ্রয়োগ। এ ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ নেওয়ার আগেই দরকার নাগরিকদের ন্যূনতম মৌলিক অধিকারগুলো—মতপ্রকাশ, সমাবেশ, ভোটাধিকার, জীবনের নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট হওয়া।
বিরাজমান ব্যবস্থাকে প্রচলিত ধারণা এবং তত্ত্ব দিয়ে বিবেচনা করলে ভুল হবে। বিরোধী দল এবং জোটগুলো এ অবস্থা উপলব্ধি করে এই সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে সম্মিলিত অবস্থান গ্রহণ করতে পারছে কি না, মতপার্থক্যগুলোর চেয়ে অভিন্ন জায়গাগুলো শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে কি না এবং আশু সংকট, যার মাত্রা অভূতপূর্ব এবং ক্রমবর্ধমান, তা মোকাবিলার পথ খুঁজে বের করতে পারছে কি না—সেটাই এখন দেখার বিষয়। এ অবস্থার মোকাবিলা করে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা না করা গেলে যারা ‘দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য’ অর্জনে আগ্রহী তাঁরা সেগুলো অর্জন দূরের কথা, সেই বিষয়ে কথা বলার সুযোগ পাবেন বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের রাজনীতির অতীতের বৃত্তচক্রকে যাঁরা অবধারিত বলে ভাবছেন এবং সেই বিবেচনায় তাঁদের অবস্থান তৈরি করছেন—তাঁরা গত এক দশকে, বিশেষত ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পরে, রাষ্ট্রকাঠামোর পরিবর্তন বিবেচনায় নিচ্ছেন বলে মনে হয় না।

সংকট মোকাবিলায় তিন অবস্থান
গত রোববার ‘এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশ’ আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ও অ্যাজেন্ডা ২০৩০: তারুণ্যের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সম্মেলনে ‘নির্বাচনে সুশাসন: তরুণদের ভূমিকা’বিষয়ক প্যানেল আলোচনার পর তরুণেরা যেসব প্রশ্ন করেছেন সেসবের মধ্যে এমন প্রশ্নই ছিল বেশি: ‘নির্বাচন হবে তো? আমার ভোটটা আমি দিতে পারব তো?’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই অনুষ্ঠানের একজন আলোচকের দেওয়া এই তথ্য আমাদের বিস্মিত করে না। কেননা, দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক অবস্থা এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর দিতে পারছে না। মোট ভোটারের সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১; এর প্রায় ৬০ শতাংশ তরুণ, প্রায় সোয়া ২ কোটি তরুণ প্রথমবারের মতো ভোটার হয়েছেন গত ১০ বছরে। নির্বাচন, যাকে গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ বলে বিবেচনা করা হয় এবং যা রাজনীতিবিদদের একধরনের জবাবদিহির সম্মুখীন করে, তা নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারদের সংশয় সুস্পষ্ট।
যে রাজনৈতিক সংকট এই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে তার মোকাবিলায় দেশের রাজনীতিতে তিনটি অবস্থান তৈরি হয়েছে। সেসব অবস্থানের আলোকেই আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্ন বিবেচিত হচ্ছে।
প্রথমটি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের। তারা কোনো রাজনৈতিক সংকট দেখছে না, কেননা বিরোধী দলগুলো ক্ষমতাসীনদের জন্য এখনো কোনো চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারেনি। ফলে তারা মনে করে নির্বাচন সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা হিসেবে সম্পাদন করা দরকার। তারা দেখাতে চায় যে নির্বাচন মানে ক্ষমতার হাতবদল এবং তাদের বিকল্প হচ্ছে বিএনপি, যার ক্ষমতায় আসা রোধের জন্যই ক্ষমতাসীন জোটের বিজয়ী হওয়া দরকার। নির্বাচনের যে ব্যবস্থা এখন বহাল আছে তাতে তারাই বিজয়ী হবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, কিন্তু তারা এটা নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণেই উৎসাহী। তারা বিজয়ী হয়ে বর্তমান শাসনব্যবস্থা বহাল রাখতে চায়, যার অন্যতম দিক হচ্ছে শক্তি প্রয়োগের ধারা ও জবাবদিহির অনুপস্থিতি। বাম গণতান্ত্রিক জোটের ভাষায় এটা হচ্ছে ‘স্বৈরতান্ত্রিক দুঃশাসন-জুলুম-লুটপাটের’ ব্যবস্থা। ক্ষমতাসীনদের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে তাঁরা মনে করেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দৃশ্যমান সাফল্য ও কথিত বিকল্পের অনুপস্থিতির কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ তাঁদের সঙ্গেই আছেন।
দ্বিতীয় অবস্থানটি হলো এই বিবেচনা যে আসন্ন নির্বাচন হচ্ছে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা এবং বিরাজমান হাইব্রিড বা দোআঁশলা শাসনব্যবস্থা ও কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম পদক্ষেপ। এটা একটি অনিবার্য পদক্ষেপও। এই বিষয়কে প্রাধান্য দিয়েই কমবেশি সব বিরোধী দলের দাবিনামাগুলো প্রণীত হয়েছে এবং ‘জাতীয় ঐক্য’ গঠনের তাগিদ তৈরি হয়েছে। বিরোধী দলগুলো সম্মিলিতভাবে বা এককভাবে এমন একটা নির্বাচনের দাবি করছে, যেখানে সবার অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে, ভোটারদের ‘আমার ভোটটা আমি দিতে পারব তো?’ প্রশ্নের উত্তর থাকবে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতার ব্যবস্থা থাকবে। যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন ফলাফলের যে অনিশ্চয়তা থাকে, অর্থাৎ কে জিতবে কে হারবে তার নিশ্চয়তা থাকে না, তা বিদ্যমান থাকবে; বিরোধী দলগুলোর পক্ষে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের চ্যালেঞ্জ করা সম্ভব হবে। এই লক্ষ্যে নির্বাচনে-আন্দোলনে কোন শক্তিগুলো থাকবে, কে কার সঙ্গে থাকবে, কে কতটুকু ছাড় দিয়ে থাকবে, একই ধরনের দাবি যারা তুলছে তাদের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক থাকবে সেগুলো এখনো অস্পষ্ট। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রকমের টানাপোড়েন তার লক্ষণ। তবে আসন্ন নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতার হাতবদলের বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই সেই ধারণা ক্রমান্বয়ে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে; অন্ততপক্ষে তার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, এই ধরনের উদ্যোগ বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে সম্ভব কি না। আমাদের বিস্মৃত হওয়ার সুযোগ নেই যে এমনকি সাম্প্রতিক সরকারি ভাষ্য অনুযায়ীও বিএনপির ভোটের পরিমাণ ৩০ শতাংশ। এই অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় দল হিসেবে, অতীতে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে, ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাবহির্ভূত অবস্থায় অগণতান্ত্রিক ও অগ্রহণযোগ্য পদক্ষেপের প্রেক্ষাপটে বিএনপিকে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তার সঙ্গে জোটের অন্য শরিকদের সম্পর্ক কী হবে সেটা এবং তাদের দলের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব বিষয়েও প্রশ্ন আছে। কিন্তু বিএনপির নেতাদের জন্য অন্যতম সিদ্ধান্তের বিষয় হচ্ছে তাঁদের কাছে প্রাধান্য পাবে কোনটা—ক্ষমতার হাতবদলের প্রশ্ন, তাঁদের ভাগ্যবদলের চেষ্টা, নাকি বিরাজমান ব্যবস্থার অবসানে যেকোনো ধরনের পদক্ষেপে যুক্ত হয়ে তাকে সহযোগিতা করা, এমনকি তার জন্য বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করার প্রশ্ন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে শরিক হওয়া এই বিষয়ে তাদের অবস্থানের একধরনের ইঙ্গিত দেয় কিন্তু ভবিষ্যতে এই বিষয়ে বিএনপির আন্তরিকতার দিকেই সবার নজর থাকবে। একই সঙ্গে এই ধরনের প্রচেষ্টায় শামিলদের মনে রাখতে হবে যে তারা বিএনপির হয়ে মাঠে নেমেছে এই প্রচারণা তাদের মোকাবিলা করতে হবে। নির্বাচন শুধু উল্লম্ব (ভার্টিক্যাল) জবাবদিহির সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু আনুভূমিক (হরাইজন্টাল) জবাবদিহির নিশ্চয়তা ছাড়া গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হওয়া অসম্ভব, সেটা তাদের মনে রাখতে হবে।
তৃতীয় অবস্থান হচ্ছে, যারা মনে করে বিরাজমান শাসনব্যবস্থায় অগণতান্ত্রিক উপাদানগুলো প্রধান হয়ে উঠলেও এবং তাদের ভাষায় ‘স্বৈরতান্ত্রিক দুঃশাসন-জুলুম-লুটপাটের’ শাসন চললেও নির্বাচন যেহেতু ক্ষমতার হাতবদলের বিষয়ও, সেহেতু যতক্ষণ না এটা নিশ্চিত হচ্ছে যে অতীতের বৃত্তচক্রের পুনরাবৃত্তি হবে না—অর্থাৎ বিএনপি আবারও ক্ষমতায় আসবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত নিজস্ব অবস্থান বজায় রাখা। বিএনপির ক্ষমতায় আসা বা না–আসার বিষয়টি কেবল তখনই ওঠে, যখন সবার অংশগ্রহণমূলক একটি স্বচ্ছ অবাধ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই আশঙ্কা বা সম্ভাবনা তিরোহিত করতে গিয়ে সবার অংশগ্রহণমূলক স্বচ্ছ অবাধ গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি থেকে তারা সরে যায়নি। যেকোনো ধরনের ঐক্যপ্রক্রিয়া যাতে বিএনপি যুক্ত তাতে কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের আপত্তি রয়েছে। বাসদ-সিপিবিসহ বাম গণতান্ত্রিক জোটের অবস্থানের মোদ্দা কথা এটাই। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে বিকল্পধারার যোগদান না করার যেসব কারণ বলা হচ্ছে তার একটি বক্তব্য এই রকম, যদিও সেটাই কারণ কি না তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। প্রশ্ন হচ্ছে এই নিশ্চয়তার চেয়ে দোআঁশলা ব্যবস্থার অবসানে সম্মিলিতভাবে ভূমিকা রাখা গুরুত্বপূর্ণ কি না এবং আসন্ন নির্বাচনকে তারা সেভাবেই বিবেচনা করে কি না। সে সম্মিলিত প্রচেষ্টার রূপ কী হবে, সেটা সংশ্লিষ্টদের বিবেচ্য বিষয়।
এই তৃতীয় অবস্থানে যারা আছে তাদের অবস্থানকে একেবারে নাকচ করে দেওয়া অসমীচীন। কিন্তু তাদের এটা স্পষ্ট করতে হবে যে তারা বিরাজমান সংকটকে প্রধান সংকট মনে করে কি না; যেহেতু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো বা ওই ধরনের অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে তারা নাকচ করে দিয়েছে, সেহেতু পরবর্তী সম্ভাব্য পরিস্থিতিকে বর্তমান পরিস্থিতির চেয়েও বিপজ্জনক মনে করে কি না, সেটা তারা নিশ্চয় ভেবেছে। কেবল ইতিহাস নয়, সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকে বিবেচনায় নিয়ে তাদের পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি তারা নিশ্চয় বিবেচনায় রাখছে। বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রের যে সংকট তা নিয়ে আলাপ–আলোচনায় গণতন্ত্রের বিভিন্ন রকমের ত্রুটি আলোচিত হচ্ছে, কিন্তু গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সমালোচকেরাও এটা স্বীকার করছেন যে সবচেয়ে খারাপ গণতন্ত্রেও মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত বদলের এবং ভুল নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে; এখন পর্যন্ত অন্য কোনো শাসনব্যবস্থায় তার সুযোগ আমরা দেখতে পাইনি।
আসন্ন নির্বাচনের প্রশ্নে বাংলাদেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর এই তিনটি অবস্থান হচ্ছে আজকের বাস্তবতা। ভবিষ্যতে নাটকীয় পরিবর্তন না ঘটলে এই সব অবস্থানই নির্ভর করবে নির্বাচনের আগে পর্যন্ত কী ঘটবে, কী ধরনের নির্বাচন হবে এবং নির্বাচনের পরে রাজনীতির পথরেখা কী হবে।

কী ঘটতে পারে?
আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলো এখন কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। একদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, ১৪ জোটের শরিকেরা ও জেনারেল এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। অন্যদিকে অন্যান্য বিরোধী দল, যারা প্রধানত বিভিন্ন জোটে বিভক্ত, কিন্তু সবাই জোটভুক্ত নয়। এতে আছে কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বাম গণতান্ত্রিক জোট। আছে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল।
এক অর্থে এই অবস্থা ২০১৩ সালের পুনরাবৃত্তি। ১৯৯১ সাল-পরবর্তী রাজনীতির অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণভাবে দুটি সম্ভাবনার কথা আমরা বিবেচনা করতে পারি; কিন্তু ১৯৯১ পূর্ববর্তী নির্বাচনের কথাও মনে রাখতে হবে। ফলে তিনটি সম্ভাবনা বিবেচিত হতে পারে। প্রথম হচ্ছে একতরফা নির্বাচন-উদাহরণ ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। তবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের হুবহু পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা এখন নেই। এ ক্ষেত্রে মূল বিষয়টি হচ্ছে বিরোধী দলগুলোকে বাদ দিয়ে নির্বাচন। দ্বিতীয় সম্ভাবনা হচ্ছে শেষ মুহূর্তে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন।
তৃতীয় মডেলটি সেনাশাসনের আমলের-১৯৮৮ সালের নির্বাচন। ওই নির্বাচন প্রধান বিরোধী দলগুলো বর্জন করলেও সরকারি প্রণোদনায় একটি জোট অংশগ্রহণ করে। ২০১৮ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে এই ধরনের ‘বিরোধী’ দল হিসেবে জাতীয় পার্টিকে উপস্থাপনের কথা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু গত চার বছর ক্ষমতার সুবিধাভোগী জাতীয় পার্টি, এমনকি যদি তারা একটি জোট হিসেবেও অংশ নেয়, তবে তা গ্রহণযোগ্য বিরোধী দল হবে না। ১৯৮৮ সালের বিরোধী জোটও বিরোধী দল হিসেবে বিবেচিত হয়নি। কিন্তু এখন রাজনীতিতে যে পরিবর্তন ঘটেছে, তাতে মূলধারার রাজনীতির বাইরের ‘সামাজিক শক্তি’ বলে পরিচিত ইসলামপন্থীদের একাংশকে এই ভূমিকায় দেখার সম্ভাবনা আছে। হেফাজতে ইসলাম সাংগঠনিকভাবে নির্বাচনের রাজনীতিতে অংশ না নিলেও ওই জোটের ভেতরে থাকা দলগুলোর এই ধরনের আগ্রহ এখন সুবিদিত। তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে ‘সমঝোতা’ করতে চাইছে বলেও খবর বেরিয়েছে।
এ রকম পরিস্থিতিতে নির্বাচন পর্যন্ত রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ কী খাতে বইতে পারে? গত কয়েক সপ্তাহের রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনৈতিক শক্তিগুলোর
অবস্থান বিবেচনা করলে পাঁচটি সম্ভাব্য দৃশ্যকল্প বা সিনারিও দেখা যায়।
প্রথম দৃশ্যকল্প হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলসহ সব রাজনৈতিক দলের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে অচলাবস্থা ও সংকট কাটিয়ে সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা বারবার নাকচ করেছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পরে সেই সম্ভাবনা স্থায়ীভাবেই তিরোহিত হয়েছে। কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর প্রাথমিক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এই জোটের সঙ্গে আলোচনার যে সম্ভাব্যতার ইঙ্গিত দিচ্ছিল, তা প্রধানমন্ত্রীর পরবর্তী মন্তব্যে অপসৃত হয়েছে। এই দৃশ্যকল্পের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। একে আমরা দুর্ঘট (আনলাইকলি) দৃশ্যকল্প বলে চিহ্নিত করতে পারি।
দ্বিতীয় দৃশ্যকল্প হচ্ছে নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের আন্দোলনের চেষ্টা। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে এবং বিশেষত এটা সুস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরে যে বিরোধী দলের কোনো দাবির প্রতিই ভ্রুক্ষেপ না করে ক্ষমতাসীনেরা নির্বাচন অনুষ্ঠানে দৃঢ় সংকল্প, সেই সময়ে বিরোধী দলের মধ্যে আন্দোলনের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। কেননা বিরোধী দলগুলো মনে করে যে বিরাজমান ব্যবস্থার কোনো রকম পরিবর্তন না হলে নির্বাচন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে। বিরোধী দল ও জোটগুলোকে এই ধরনের পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা সরকারের পক্ষ থেকেই করা হতে পারে। কেননা, এতে ক্ষমতাসীনেরা বলতে পারবে যে বিরোধীরা, বিশেষত বিএনপি নির্বাচনের ব্যাপারে আগ্রহীই ছিল না এবং তারাই ‘সন্ত্রাসের পথ’ বেছে নিয়েছে। ২০১৪ ও ২০১৫ সালের যে ধরনের কার্যক্রমের জন্য বিএনপিকে দোষারোপ করা হয়, তা তখন নির্বাচন বর্জনকারী সবার জন্যই ব্যবহার করা যাবে। তদুপরি, এই পরিস্থিতিতে সরকার আরও বেশি নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম হবে এবং তার যৌক্তিকতা হিসেবে আন্দোলনকারীদের আচরণকে ব্যবহার করবে। ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন’ ও ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ দমনে সাফল্যের কারণে সরকারের এই বিষয়ে নিজেদের ওপরে আস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি বলেই অনুমেয়।
তৃতীয় দৃশ্যকল্প হচ্ছে বিরোধী দল ও জোটগুলো যদি একটি অভিন্ন জোটে সমবেত হতে পারে বা বিভিন্ন অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও নিজেদের মধ্যে নির্বাচনী সমঝোতা তৈরি করে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়, মালদ্বীপ ও মালয়েশিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচনে এই ধরনের উদাহরণ তৈরি হয়েছে, সে ক্ষেত্রে সরকার প্রশাসনকে ব্যবহার করে গায়েবি মামলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের নিবর্তনমূলক ব্যবস্থার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, গণমাধ্যমের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে পারে, সামাজিক মাধ্যমে নজরদারির পাশাপাশি অন্যদের বিরুদ্ধে প্রচারণা জোরদার করতে পারে। এই সময়ে এমন ব্যবস্থা নেওয়াও স্বাভাবিক, যাকে অরুন্ধতী রায় ‘সহিংসতার আউটসোর্সিং’ বলে বর্ণনা করেছেন। সম্প্রতি জারি হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ফলে এই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের আইনি পথ ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে।
চতুর্থ দৃশ্যকল্প হচ্ছে বিরোধীরা বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে কিংবা আন্দোলনের চেষ্টায় ব্যর্থতার কারণে নির্বাচনে আশানুরূপ ফলাফল লাভে ব্যর্থতা। সেই অবস্থায় নির্বাচনের পরে তাদের ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ই মেনে নিতে হবে। ক্ষমতাসীন দল যতটুকু জায়গা ছেড়ে দেবে, তার বাইরে রাজনীতিবিদ, গণমাধ্যম বা সিভিল সোসাইটির সদস্যদের প্রত্যাশার বা দাবি তোলার সুযোগ থাকবে না। তবে প্রাসঙ্গিকভাবে বলা দরকার যে এই ধরনের পরিস্থিতি বাংলাদেশের রাজনীতিকে অপরিবর্তনীয়ভাবে বদলে দেবে; এখনকার রাজনৈতিক শক্তির অনেকেই ‘অস্তিত্বের সংকটে’ পড়লে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।
পঞ্চম দৃশ্যকল্প হচ্ছে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, তার অবসান এবং সাংগঠনিক ঐক্য প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে অপসৃত হওয়া। এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বিভিন্ন কারণে-হতে পারে অভ্যন্তরীণ কলহ বা ভুল-বোঝাবুঝির ফলে, হতে পারে সরকারের পক্ষ থেকে ভাঙনের চেষ্টার কারণে। এই রকম পরিস্থিতিতে আলাদা করে কোনো কোনো দল বা ব্যক্তি হয়তো ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে সুবিধা এবং রাজনৈতিক সুবিধা নিতে সক্ষম হবেন, কিন্তু এর চূড়ান্ত ফল চতুর্থ দৃশ্যকল্পের চেয়ে ভিন্ন কিছু হবে না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান কোনো নির্ভুল বিজ্ঞান নয়, রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহও সরল পথে অগ্রসর হয় না। ফলে অস্থির সময়ে রাজনীতির যেকোনো দৃশ্যকল্পকে ভবিষ্যদ্বাণী বা প্রেডিকশন বলে মনে করা সমীচীন নয়। ঘটনাধারা ও ক্রীড়নকদের ভূমিকা যেকোনো কিছুকেই বদলে দিতে পারে। যেমন ক্ষমতাসীন দল চাইলে ঘটনাধারাকে ভিন্নভাবে প্রবাহিত করতে পারে, তেমনি পারেন সাধারণ নাগরিকেরা। তা সত্ত্বেও বিরাজমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই এই দৃশ্যকল্পগুলো তৈরি করা হয়েছে। এখানে কিছু বিষয় বিবেচনার বাইরে রাখা হয়েছে, তা হচ্ছে অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের সম্ভাব্য প্রভাব এবং বিদেশি শক্তি, বিশেষত ভারতের ভূমিকা। পাঠকেরা প্রতিটি দৃশ্যকল্পে ভারতের ভূমিকা কী হতে পারে, সেটা নিজেরাও ভেবে দেখতে পারেন।

About আলী রীয়াজ

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক । তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিইচ-ডি ডিগ্রি লাভ করেন। ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেওয়ার আগে অধ্যাপক রীয়াজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বৃটেনের লিংকন বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ল্যাফলিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। এ ছাড়া তিনি লন্ডনে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। ইংরেজিতে তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দশটি। এর মধ্যে রয়েছে– ‘পলিটিক্যাল ইসলাম এন্ড গভর্নেন্স ইন বাংলাদেশ’ (২০১০), ‘ফেইথফুল এডুকেশন : মাদ্রাসাজ ইন সাউথ এশিয়া’ (২০০৮) এবং ‘গড উইলিং – দি পলিটিক্স অব ইসলামিজম ইন বাংলাদেশ’ (২০০৪)। বাংলা ভাষায়ও তাঁর অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ‘স্টাডিজ অন এশিয়া’ জার্নালের সম্পাদক। তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এবং রাজনৈতিক ইসলাম বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তাঁর স্বীকৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি ২০১২ সালে ডক্টর রীয়াজকে ‘ইউনিভার্সিটি প্রফেসর’ পদে ভূষিত করে। ২০১৩ সালে তিনি ওয়াশিংটনে উড্রো উইলসন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর স্কলারস-এ পাবলিক পলিসি স্কলার হিসেবে কাজ করেন।

View all posts by আলী রীয়াজ →

Leave a Reply