April 24, 2024

বাংলা সাহিত্য বলতে কি কেবল বাংলাদেশের সাহিত্য বুঝব? নাকি বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্য মাত্রকেই? আন্তর্জাতিক পরিসর মানেই বা কী? দুটি দেশের দাফতরিক ভাষা বাংলা বলে এই ভাষাটিও তো এক অর্থ আন্তর্জাতিক ভাষাই! ফলে দুই দেশের সাহিত্যকেও তো আন্তর্জাতিক হিসেবেই বিবেচনা করা যায়।   

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান থেকে বাংলা ভাষার সাহিত্য মাত্রকেই বাংলা সাহিত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়। অন্য দিকে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষীদের সাহিত্য চর্চাও তো এক অর্থে আন্তর্জাতিক। কিন্তু এই শব্দটির পরিসর আরো বড়; অনুবাদের মাধ্যমে দুনিয়াজোড়া নানা ভাষার মানুষের কাছে পৌঁছানো বাংলা সাহিত্যকেই সাধারণ অর্থে বাংলা সাহিত্যের ‘আন্তর্জাতিক পরিসর’ বোঝানো হয়! অন্তত বাংলাদেশের সাহিত্যিক সমাজ এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখে। 

স্বাধীনতার পরে আমাদের সাহিত্য সমাজের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজেদের কাছেই নিজেদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলা। এ কথা প্রযোজ্য যতটা সৃষ্টিশীল সাহিত্যের বেলায় ততটাই মননশীল সাহিত্যের ক্ষেত্রেও। আন্তর্জাতিক স্তরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিয়ন্তা কিংবা পরিচালকদেরও সামগ্রিক গতিমুখ ছিল তা-ই। সঙ্গত কারণেই সাহিত্যও এর বাইরে বিষয় হতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশের সাহিত্যে যতটা আত্মানুসন্ধান বা আত্মআবিস্কার কিংবা আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা প্রাধান্য পেয়েছে, ততটা বিশ্বসমাজের কাছে নিজেদের তুলে ধরার অভিপ্রায় জোর পায়নি। কিন্তু সাহিত্য-সমাজ যেহেতু চিন্তার দিক থেকে অন্য ক্ষেত্রগুলোর তুলনায় সক্রিয় এবং অগ্রসর সেহেতু এই সমাজের আন্তর্জাতিক পরিসর পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা সব সময়ই ছিল তীব্রতর। ফলে অনূদিত হয়ে আন্তর্জাতিক পরিসর পাবার তৃষ্ণা বাংলাদেশের সাহিত্য-সমাজ বোধ করেছে এবং এই প্রেরণা থেকেই প্রধানত ইংরেজি ভাষায় বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ করতে চেয়েছে। 

কিন্তু এই মনোভঙ্গির সীমাবদ্ধতা এই যে, মূলত ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে যে বিশ্বসমাজকে কল্পনা করা হয়ে থাকে, এবং যে আবেগপূর্ণ মনোভঙ্গিতে চেষ্টা করা হয়ে থাকে অনুবাদের মাধ্যমে তা উপস্থাপনের তাতে রয়েছে বাস্তব বোধের অভাব। ফলে এ ধরনের প্রয়াস ফলপ্রসূ হয়নি খুব একটা। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যাবে সামগ্রিক ভাবে বাংলা সাহিত্য রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কিছুই প্রায় আন্তর্জাতিক বিস্তৃতি পায়নি। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রেও তা অকিঞ্চিৎকর মনে হয়। প্রসঙ্গত বাংলা কবিতা নিয়ে বুদ্ধদেব বসু প্রমুখের নেপথ্য প্রয়াসে আমেরিকার বিখ্যাত ‘পোয়েট্রি’ পত্রিকায় প্রকাশিত বাংলা ভাষার কয়েকজন কবির অনূদিত কবিতা যদি সামগ্রিক ভাবে কোনো রকম তরঙ্গ তুলতে পারতো তাহলে তার চিহ্ন আন্তর্জাতিক পরিসরে হয়তো দেখা যেত। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকা খ্যাত হুমায়ুন কবিরের প্রয়াস ‘গ্রীন অ্যান্ড গোল্ড: স্টোরিজ এন্ড পোয়েমস’  (১৯৫৫) বইটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও নামোল্লেখের বেশি আমি জানতেই পারতাম না হুমায়ুন কবির সম্পর্কে আমেরিকায় নিয়মিত অনুসন্ধান চালিয়ে না গেলে! ‘গ্রীন এন্ড গোল্ড’ ছিল হুমায়ুন কবিরের একটি ব্যক্তিগত প্রয়াস। এতে আকাঙ্ক্ষা ছিল রবীন্দ্র-উত্তর প্রজন্মের সমকালীন বাংলা সাহিত্যের কিছু উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত বিশ্বসমাজের কাছে তুলে ধরা। হুমায়ুন কবির যে কেবল কিছু সৃজনশীল রচনা সংকলিত করেছিলেন তা-ই নয়, তিনি নিজে লিখেছিলেন বাংলা সাহিত্যের পরিচিতিমূলক একটি সামগ্রিক ভূমিকাও। এই ব্যক্তিপ্রয়াসের সমর্থন ছিল রাষ্ট্রেরও। এই উদ্যোগটি গৃহীত হয়েছিল ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর আর্থিক আনুকূল্যে। একাধিক সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছিল বইটির। প্রকাশের প্রায় প্রায় সত্তর বছর পরে আমেরিকার কোনো লাইব্রেরি থেকে তুলে নেয়া একটা কপি সেখানকার পুরোনো বইয়ের বাজার থেকে কিনতে পারায় বোঝা যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লাইব্রেরিতে এই বই সরবরাহ করার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিসর দেয়ার চেষ্টা ছিল। ‘পোয়েট্রি’ এবং ‘গ্রিন এন্ড গোল্ড’–এই দুই প্রয়াস দেখার ফলে আমার এই প্রতীতি জন্মেছে যে ঐ দুটি প্রয়াসই ছিল বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিসর লাভের যথার্থ বাস্তব অভিমুখ। কিন্তু পরে বাংলা সাহিত্যের এই অভিমুখের বিবেচনা সম্পন্ন কোনো ধারাবাহিক উদ্যোগ আমাদের চোখে পড়েনি। সুতরাং বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক সীমানা সম্প্রসারণ ঐ পথে বিশেষ এগোয়নি।

বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের সাহিত্যের ক্ল্যাসিক অভিধা পেতে পারে এমন কিছু রচনার অনুবাদ প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু এর গ্রাহক পর্যায় কতটা আন্তর্জাতিক তা স্পষ্ট নয়। প্রসঙ্গত হয়তো এ-ও স্মরণ করা যেতে পারে, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ উপন্যাসের ‘ট্রি উইদাউট রুট’ নামীয় অনুবাদটি ব্রিটেনের নামি প্রকাশনা সংস্থা ‘অ্যালেন এন্ড আনউইন’ থেকে প্রকাশিত হলেও তা কতটা পরিসর পেয়েছিল তা জানা যায় না। কারণ বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নানা ধরনের পর্যালোচনামূলক লেখা প্রকাশের মধ্য দিয়ে কোনো ধরনের পরিসর সৃষ্টি না হওয়ায় এই ধরনের উদ্যোগ বিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গ প্রয়াস হিসেবেই রয়ে গেছে, আন্তর্জাতিক পরিসর পায়নি। হয়তো সাম্প্রতিক এমন উদ্যোগের নাতিদীর্ঘ তালিকাও করে ফেলা যায়; কিন্তু তা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পরিচিতি পাওয়ার খুব একটা যে উপযুক্ত তা বলা যায় না।

অন্য দিক থেকে ব্যবহারকারী হিসেবে বিশ্বে বাংলা ভাষার অবস্থান ওপরের দিকে হওয়া সত্ত্বেও এই ভাষার সাহিত্যের প্রতি বিশ্বসাহিত্য সমাজের কৌতূহলী হয়ে ওঠার কারণ ঘটেনি। এর কারণ গোলোকায়িত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ভাবে যেমন প্রভাবশালী নয়, তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ নয় অন্য কোনো ভাবেও। আমাদের সংস্কৃতির যে সৌন্দর্য রয়েছে তাকে প্রভাবশালী সাংস্কৃতিকতার সঙ্গে সমন্বিত করে উপস্থাপনের কোনো জোরদার অভিযান এখনো দেখা যায়নি। আমরা যদি অনুসন্ধান করি তাহলে হয়তো বেশ কিছু ছড়ানো ছিটানো উদ্যোগ দেখব, কিন্তু তা যে শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি, বরং উদ্যোগটুকুকেই সাফল্য ভেবে বেশিরভাগ উদ্যোক্তাকে সন্তুষ্টি প্রকাশ করতে দেখা যায়। বস্তুনিষ্ঠভাবে সাফল্যের মাত্রাকে অনুসন্ধান করার দৃষ্টান্ত প্রায় নেই বললেই চলে। উল্লেখ্য, একটা জাতির অভ্যন্তরভাগের সংস্কৃতি যুগপৎ শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী না থাকলে তা আন্তর্জাতিক অভিমুখ পায় না। বাংলা সাহিত্যের চর্চার আন্তর্জাতিক পরিসর না পাওয়ার এটাই মূল কারণ। তা না হলে মুরাকামির মতো একজন লেখক জাপানি ভাষায় কিছু লিখলে কেন দ্রুত বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে? কিংবা তুর্কি ভাষায় তুরস্কের ওরহান পামুকের মতো লেখকের বই কীভাবে বিশ্বজুড়ে অনূদিত হয়ে আন্তর্জাতিক  পরিচিতি পায়?

এই কথার পিঠে হয়তো অনেকগুলো উদ্যোগের বিচ্ছিন্ন ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করা যায়। সেসব প্রয়াসের সাফল্যকেও খাটো করে দেখা হচ্ছে না; কিন্তু তাতে সাফল্যের মাত্রা আমাদর আশাবাদী করতে পারে না। তাই আন্তর্জাতিকতা অভিমুখী সাহিত্য চর্চার কোনো সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এখানে তুলে ধরার চেষ্টা হয়নি। বরং চেষ্টা হয়েছে, বাংলা সাহিত্য চর্চার আন্তর্জাতিক অভিমুখ সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমানে কেমন এবং পরে কেমন হতে পারে তার সূত্র সন্ধান করতে। 

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত যে লেখকেরা ইংরেজি ভাষায় লিখে পরিচিতি পেয়েছেন তাঁরা যে কেবল ভিন্ন দেশের নাগরিক তা-ই নন, তাঁদের নিশ্চয়ই বাংলা সাহিত্যের লেখকও বলা যাবে না; কারণ অন্য দেশে বসবাস করে সে দেশের নাগরিক হয়ে যাঁরা বাংলাদেশের জীবনধারা নিয়ে ভিন্ন ভাষায় সাহিত্য রচনা করেন তাঁরা আন্তর্জাতিক পরিসর পেলেও  ঐ সাহিত্য বাংলা ভাষায় রচিত হয়নি বলে এবং এর লক্ষ্য পাঠকও বাংলাদেশের নয় বলে তাকে ঠিক বাংলা সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করা যায় না। কিন্তু ভিনদেশে অভিবাসীরা যারা বাংলার জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে কিংবা যে দেশে তাঁরা অভিবাসী সে দেশের জীবনযাত্রার ভিত্তিতে বাংলা ভাষায় সাহিত্য রচনা করেন তাকে বাংলা সাহিত্যই বলতে হবে। এক দিক থেকে একেও আন্তর্জাতিক পরিসরের বাংলা সাহিত্য বলা যায়! বিভিন্ন দেশের বাস্তবতায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মানসের আলোকে বাংলা ভাষায় রচিত সাহিত্য তো আন্তর্জাতিকই। বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানায় অবস্থানরত বাংলাভাষী সাহিত্য বা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে লেখা বিশ্বময় নানা দেশের নাগরিকদের রচিত বাংলা ভাষার সাহিত্যকে তাহলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সাহিত্য না বলার কী কারণ থাকতে পারে!

যেসব দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঙালি অভিবাসী রয়েছেন সেসব দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বাংলাদেশবিদ্যা অধ্যয়নের জন্য কার্যকর বিনিয়োগ করেও বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিয়ে যাওয়া সহজতর হতে পারে। কারণ এর ফলে অভিবাসী বাঙালিদের উত্তরপ্রজন্ম বাংলাদেশ ও বাংলা সাহিত্য সম্বন্ধে যেমন গভীরভাবে অবহিত হতে পারবে তেমনই অন্য কৌতূহলীরাও পারবে এর অংশ হতে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে বাংলা ভাষা হারিয়ে ফেলা উত্তরপ্রজন্মের সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতির যোগ ঘটানোর দিকটিতে বেশি জোর দেয়া। আর এই কাজটি সুসম্পন্ন হতে পারে তাদের বৃত্তি দিয়ে ‘বাংলাদেশবিদ্যা’ পাঠে উৎসাহী করে। কারণ সেসব দেশের সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সাহিত্যিক পরিসর তৈরি করবে তারাই। বাংলা সংস্কৃতির উজ্জ্বলতাকে তারাই সমন্বিত করবে বিশ্বসংস্কৃতির সঙ্গে, ক্রমশ তাদের এই তৎপরতা সম্প্রসারিত করে চলবে বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিক পরিসর।

[১০ মার্চ ২০২২ শনিবার বাংলা একাডেমির অমর একুশে অনুষ্ঠানমালায় উপস্থাপিত]

Leave a Reply