April 24, 2024

সংগত কারণেই কবি আসাদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁকে নিয়ে রচিত সকল রচনায় লেখকের দৃষ্টি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের ও জীবনপঞ্জির সামগ্রিকতার দিকে! ফলে সেখানে কবিসত্তার পরিচয় এসেছে তাঁর ব্যক্তিত্বসামগ্র্যের অংশমাত্র হিসেবে। কারণ তাঁর সাহিত্যিক সত্তায় যেমন তেমনি ব্যক্তিত্বের অপরাপর সত্তায়ও তিনি ছিলেন সমাদরণীয় মানুষ! সবকিছু ছাপিয়ে অবশ্য যথার্থই তাঁর কবিপরিচয়কেই স্মরণ করা হয়েছে। তাঁকে নিয়ে আলোচনাগুলোতে সারকথা যা প্রকাশ পেয়েছে তাতে বোঝা যায়, বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার পরিপ্রেক্ষিতে অন্যতম প্রতিনিধি ধরা হলেও তাঁকে ষাটীয় ধারার অগ্রগণ্য বিবেচনা করতে দেখা যায়নি। অবশ্য এমনটি ঘটবার জন্য আসাদ চৌধুরীর কবিতার সামর্থ্যের ঊনতা বা অধিকতা যতটা দায়ী তার চেয়ে বড় কারণ আমাদের রসিকতা—সংস্কৃতির দারিদ্র্য।

আসাদ চৌধুরী যখন কবিতা লিখতে শুরু করেছেন, ততদিনে, অর্থাত্ বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে আধুনিকবাদের ধারাকেই বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসের জন্য একমাত্র বিবেচ্য মনে করা শুরু হয়ে গেছে। ফলে বিগত শতাব্দীর তিরিশের দশক থেকেই সুদীর্ঘ কাল ধরে বহমান জীবনবোধ বাংলা কবিতার অন্য যেসব ধারাগুলোকে সচল রেখেছিল তার চেয়ে পাশ্চাত্যের শিল্পবিপ্লব ও বিশ্বযুদ্ধোত্তর জীবনবোধ প্রাধান্য পেতে থাকে। আসাদ চৌধুরীর কবিতাও ঊনতা সত্ত্বেও মোটের ওপর দ্বিতীয়োক্ত ধারারই প্রতিনিধিত্ব করেছে। তবে তিনি সমগ্র বাংলা অঞ্চলের অপস্রিয়মাণ পূর্বতন ধারাগুলোকেও তাঁর কবিতারচনার পরিমণ্ডলে অন্তর্ভুক্ত রেখে দিয়েছিলেন। আর এই গুণই তাঁকে কবি হিসেবে প্রধানত স্বতন্ত্র করে তুলেছিল সহযাত্রীদের তুলনায়। নানামুখি আত্মগত প্ররোচনা থাকলেও কবিতা লেখায় ছেদ পড়েনি প্রায় কখনোই। এ থেকে বোঝা যায় কবিতার অনুকূলে তাঁর মগ্নচৈতন্য ছিল ধারাবাহিকভাবে প্রবাহিত। নিবিষ্ট মনোযোগী হয়ে পাঠ না করতে পারলেও নিয়মিতই তাঁর কবিতা পড়া হয়েছে আমার। প্রকাশিত কবিতা-সংকলনের প্রকাশসালসহ তালিকা প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় লক্ষ করেছি নিয়মিত বিরতিতেই বের হয়েছে তাঁর নতুন নতুন কবিতা-সংকলন। তালিকাটি এখানেও হাজির করা যায়: ‘তবক দেওয়া পান’ (১৯৭৫); ‘বিত্ত নাই বেসাত নাই’ (১৯৭৬); ‘প্রশ্ন নেই উত্তরে পাহাড়’ (১৯৭৬); ‘জলের মধ্যে লেখাজোখা’ (১৯৮২); ‘যে পারে পারুক’ (১৯৮৩); ‘মধ্য মাঠ থেকে’ (১৯৮৪); ‘মেঘের জুলুম পাখির জুলুম’ (১৯৮৫); ‘আমার কবিতা’ (১৯৮৫); ‘ভালোবাসার কবিতা’ (১৯৮৫); ‘প্রেমের কবিতা’ (১৯৮৫); ‘দুঃখীরা গল্প করে’ (১৯৮৭); ‘নদীও বিবস্ত্র হয়’ (১৯৯২); ‘টান ভালোবাসার কবিতা’ (১৯৯৭); ‘বাতাস যেমন পরিচিত’ (১৯৯৮); ‘বৃন্তির সংবাদে আমি কেউ নই’ (১৯৯৮); ‘কবিতা-সমগ্র’ (২০০২); ‘কিছু ফুল আমি নিভিয়ে দিয়েছি’ (২০০৩); ‘ঘরে ফেরা সোজা    নয়’ (২০০৬); ‘বজ্রকণ্ঠ থেমে গেলে’ (২০১০); ‘যেতে   যেতে মধ্যযুগ ঘুরে দাঁড়িয়েছে’ (২০১২); ‘এই ফুলটির    অন্তত দশ-দশটি প্রেমপত্র পাওয়ার কথা’ (২০১৪); ‘তৃণে-ছাওয়া আদিম ঠিকানা’ (২০১৭); ‘সবুজ গম্বুজের নীচে’ (২০১৯)।

প্রথম বইয়ের নামকরণ থেকে যেমন তেমনি প্রথম বইয়ে সংকলিত কবিতা থেকেও তাঁর স্বাতন্ত্র্য বেরিয়ে এসেছিল। নামকরণগুলো একসঙ্গে পড়লে লক্ষ করা যাবে বইয়ের এতেও রয়েছে আসাদীয় আত্মতা। তাঁর স্বাতন্ত্র্যের অন্যতম ও উল্লেখযোগ্য নির্ণায়ক হচ্ছে, আধুনিকতা-অভিমুখি সময়ে যখন বাংলা কবিতার লোকজতা ক্ষীণ হতে চাইছে সে সময়ে লোকজীবনবোধকে নিজের মর্মলোকে সমানুভূতিতে রাখতে পারা! তাঁর প্রথম কবিতা-সংকলন ‘তবক দেওয়া পান’ এই গুণেই গুণান্বিত। আবদুল মান্নান সৈয়দেরও শনাক্তি: ‘তবক দেওয়া পানে’র কবিতায় ‘লোকসাহিত্য’, ‘বৈষ্ণব পদ’ কিংবা ‘লালন শাহ’ থেকে উপকরণ সংগ্রহ করেছেন আসাদ চৌধুরী। গ্রামীণ নারীদের বাকভঙ্গি, গ্রামীণ ‘আন্তরিকতা’, ‘অকপটতা ও অকৃত্রিমতা’কে [আবদুল মান্নান সৈয়দের অভিধা] এমনভাবে বিন্যস্ত করেছেন তিনি যে তা-ই তাঁর কবিতাকে আধুনিকতার দুর্বোধ্যতা থেকে মুক্তি দিয়েছিল। তাঁর সক্রিয়তার কালে বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতি ছিল উত্তাল! সেই সংবেদনাও ছিল প্রবল ও প্রবহমান। আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যতার বিপ্রতীপে এ-ও ছিল অন্যতম প্রভাবক!

সমসাময়িক কয়েকজন কবির কবিতা-সংকলনকে গ্রন্থরূপ দেওয়ার সোত্সাহ উদ্যোগী হলেও কিন্তু তাঁর নিজের প্রথম কবিতা-সংকলন বেরিয়েছিল বেশ দেরি করে। হয়তো সে কারণেও, তাঁর বোধের জগতে পূর্বোক্ত বিচিত্র অনুষঙ্গগুলো ভেতরে ভেতর টান টান হয়ে উঠতে পেরেছিল; প্রবল হয়ে উঠতে পেরেছিল তাঁর কবিতায় আসাদীয় ‘আত্মমুদ্রা’ [আবদুল মান্নান সৈয়দ কথিত]; আত্মচারিত্র হতে পেরেছিল ‘স্বচ্ছ স্বাক্ষরিত’ [পূর্বোক্ত]; হয়ে উঠতে পেরেছিল ‘আসাদেরই আত্মকবিতা’ [পূর্বোক্ত]।

এতক্ষণের আলোচনাকে যদি সূত্রবদ্ধ করার চেষ্টা করা যায় তাহলে এমন দাঁড়াতে পারে—কবিতায় তিনি আধুনিকতার চর্চা করেছেন বাংলার লোকায়ত জীবনবোধের সঙ্গে পাশ্চাত্য বুর্জোয়া জীবনদৃষ্টি অনুসারী আধুনিকতার সমন্বয়ে। ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রভাবও প্রবল ছিল তাঁর কবিতায়। সরল ভাষাভঙ্গি দিয়েই তিনি আধুনিকতাকে স্পর্শ করেছিলেন। কথনে তিনি পরিমিত। চিত্রকল্প সৃষ্টিতেও তাঁর ব্যক্তিত্ব ও বাকভঙ্গির বৈঠকী মেজাজ পাওয়া যায়। তাঁর সৃষ্ট চিত্রকল্প চিত্রময়তার চেয়ে ভাবময়তাকেই বেশি ধারণ করে। সমকালের রাজনৈতিক সামাজিক ঘটনাবলির প্রত্যক্ষ প্রভাব যেমন তাঁর কবিতায় আছে তেমনি রয়েছে নিজের অন্তর্জীবনের বৈপরীত্যের কথাও। জীবনের শেষপর্বে ধর্মজীবনের অনুভবকেও ধারণ করেছেন। বইয়ের নামকরণেও এর পরিচয় রয়েছে।

আসাদ চৌধুরীর কবিতা আধুনিকতার মাত্রায় কতটা উত্তীর্ণ, নিজে কতটা তিনি উত্তীর্ণ কবিত্বে তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু এ কথা অনেকেই মানবেন যে, সত্তায় নিবেদন না থাকলে এমন বিরতিহীনভাবে কবিতার চর্চা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সেই দিক থেকে দেখলে বাংলাদেশের কবিতা চর্চার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর যথাস্থান নিরূপণও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সে কাজ অবশ্য আমাদের করতে হবে!

প্রথম প্রকাশ: দৈনিক ইত্তেফাক, ১৩ অক্টোবর ২০২৩। দেখুন, Page 17 – প্রথম সংস্করণ – ই-পেপার | দৈনিক ই-ইত্তেফাক | (ittefaq.com.bd)

Leave a Reply