April 24, 2024

আইন প্রণয়নের দিক থেকে বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য যে কোন দেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে। চিন্তা করা যায় এমন প্রায় সব বিষয়েই আমাদের লিখিত আইন (written law) আছে। কিন্তু তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের যত অনীহা। সেটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থা থেকে শুরু করে বিচার ব্যাবস্থা এবং সর্বোপরি দেশের নাগরিকদের মধ্যে আইন না মানার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বিচার ব্যাবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা ছাড়াও আরও অনেক দিক রয়েছে যা প্রতিনিয়ত আমাদেরকে আইন না মানার জন্য উৎসাহী করে তোলে। এটি নিয়ে আমাদের দেশে একাডেমিক আলোচনা হয় না বললেই চলে। এটি মূলত যতটা না আইনের অপপ্রয়োগের বিষয় তারচেয়েও নাগরিকের অধিকার সমুন্নত রাখার বিষয়। এই আলোচনা অনেক ক্ষেত্রে আদালত অবমাননার অভিযোগের জন্ম দেয়। ১৯২৬ সনে প্রবর্তিত এই আদালত অবমাননা আইনটি, মূলত সাম্রাজ্যবাদী শাসকের “বিরুদ্ধ কণ্ঠ” রোধ করার মানসে সৃষ্ট হলেও বর্তমানেও এটির ব্যবহার কম নয়। অথচ ভারত ও পাকিস্তান তাদের আইন ব্যবস্থা থেকে এটিকে অনেক আগেই বিদায় করেছে। আমাদের দেশে এই আইনটিকে ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ তারিখে সংশোধন করে নতুন মোড়কে পাস করা হয়। পরবর্তীতে মহামান্য হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ বিগত ২৬ সেপ্টেম্বর এই আইনের মাধ্যমে আদালতের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে বিধায় তা বাতিল ঘোষণা করেন। এর ফলে ১৯২৬ ইং সনের পুরনো আইনই এখনো বলবৎ রইল। আমাদের শাসন ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বিশ্বাসহীনতার কারণে নাগরিক অধিকার রক্ষায় আদালত এখনো মুখ্য ভূমিকা পালন করে বিধায় আদালতের নিকট মানুষের প্রত্যাশাও আকাশচুম্বি। ফলে কখনো কখনো প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মাঝে ব্যবধান বাড়লে মানুষের হতাশাও বাড়ে।

কেবলমাত্র একাডেমিক বিশ্লেষণের প্রয়োজনে নিচে কিছু সাম্প্রতিক আইনের প্রয়োগের ভিন্নতা আলোচনা করা হল-

খুবই সাম্প্রতিক কিছু আইনি প্রক্রিয়ার কথা ধরা যাক- বিগত এপ্রিল মাস থেকে দেশে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের অধীনে মামলা করা শুরু হয়েছে। চারজন ব্লগার দিয়ে যার জাত্রা শুরু। তাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ না থাকা স্বত্বেও তাদেরকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট কেবলমাত্র পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে অন্য কোন বিষয় বিবেচনা না করে তাদেরকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এভাবে চার ব্লগার আইন বহির্ভূতভাবে ১৫ দিন পুলিশ হেফাজতে আটক ছিলেন। আইন বহির্ভূত বলছি এই কারণে যে- ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে ১৬৭ ধারার অধীনে বিনা বিচারে কাউকে ১৫ দিনের অধিক আটকে রাখার কোন বিধান নেই। তাছাড়া, ২০০৩ সনে, বাংলাদেশ লিগ্যাল সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর একটি মামলায় মহামান্য হাইকোর্ট সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু বিধি বিধান বিলুপ্ত করে নতুন কিছু বিধি বিধান ও নির্দেশনা দেন, যা মেনে চলা সবার জন্য বাধ্যতামুলক। কিন্তু, সেই রায়ের পর থেকে হলফ করে বলা যায় আজ অবধি কারো ক্ষেত্রেই এইসব নির্দেশনা মেনে চলা হয়নি। এখন প্রশ্ন হল- আমাদের পুলিশ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা এই নির্দেশনার বিষয়ে জানেন কিনা? জানলেও তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে কিনা? বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটই বা এবিষয়ে অবগত আছেন কিনা? প্রশ্ন উঠছে এই কারনে যে, এর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। কখনো কখনো দেখা যায়, বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটগণ এক একটি মামলায় ভিন্ন ভিন্নভাবে একই আইন প্রয়োগ করছেন। এর ফলে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি Unified Pattern  দাঁড়াচ্ছে না। জামিনের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য ভীষণ রকম প্রকট। যদিও জামিন বিচার প্রক্রিয়ার কোন অংশ নয় এবং কোন অভিযুক্ত ব্যক্তি এটিকে অধিকার হিসেবে দাবী করতে পারেন না, তথাপি দীর্ঘদিনের চর্চার ফলে এক এক কোর্টে এক এক রকম প্র্যাকটিস দাঁড়িয়ে যায়। সেটি নিম্ন আদালত ও উচ্চ আদালত উভয়ের বেলাতেই প্রযোজ্য। সে যাই হোক, দীর্ঘ ১৫ দিন পুলিশ হেফাজতে আটকে রাখার পর পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় অভিজোগপত্র দাখিল করে এবং এইভাবে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের মাধ্যমে একটি নিয়মিত নন-এফ,আই,আর, মামলা রজ্জু হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় যখন তারা গ্রেফতার ছিলেন তখন ম্যাজিস্ট্রেটের জামিন দেয়ার সুযোগ থাকলেও ৫৭ ধারায় সে সুযোগ ছিল না। অতঃপর মামলা বিচারের জন্য মহানগর দায়রা আদালতে বদলি হলে তিনি পরবর্তীতে জামিন দেন। জামিন দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি তিনজনকে স্থায়ী জামিন দেন আর একজন অভিযুক্তকে অস্থায়ী জামিন দেন। একই আইনে গ্রেফতার হলেও কেন এই দ্বৈত নীতি তা জানা যায় নি। আগেই বলেছি, জামিন অধিকার নয়, বিচারকের স্বেচ্ছাধীন (discretion) একটি বিষয়। তাই তিনি যেকোন শর্তে জামিন দিতে পারেন। তবে কথা থাকে তিনি, আইনের আওতায় থেকে তাঁর discretion প্রয়োগ করবেন। এক্ষেত্রে সেটা হয়েছে কিনা তা ভেবে দেখার বিষয়। একই রকম অভিযোগে যখন আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ধরা হল, তখন তাঁর বিরুদ্ধে আই,সি,টি অ্যাক্টের ৫৭ ধারায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তার জামিন এখনো হয়নি। এর পরে যখন আইনজীবী আদিলুর রহমানকে ধরা হল, তাকেও রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করা হয় কিন্তু, মহামান্য হাইকোর্ট, তাকে রিমান্ডে নেয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে রিমান্ড অবৈধ ঘোষণা করে। এর দুইমাস পরে তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্তি পান। জানিনা, চার ব্লগারের রিমান্ড নিয়ে এমন আবেদন করলে একই রকম ফল পাওয়া যেত কিনা? আবেদন করা হয়নি যখন তখন সে আলোচনাও নিষ্প্রয়োজন।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের আরও একটি প্রকৃষ্ট উদাহারন হতে পারে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মাননীয় বিরোধী দলীয় নেত্রীর ব্যক্তিগত ফোনালাপ টিভি ও প্রিন্ট মিডিয়ায় তাঁদের অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করা। এটি নিসন্দেহে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের অন্তর্গত বিষয়। কোন পক্ষই এই ফোনালাপ প্রকাশের দায়িত্ব স্বীকার করেননি, তাই ধরে নেয়া যায়, কেউ তাঁদের এই ব্যক্তিগত ফোনালাপ হ্যাক করে অবৈধভাবে প্রকাশ করেছে। একই রকমভাবে টেলিফোন ও স্কাইপি আলাপচারিতা হ্যাক করা নিয়ে করা মামলায় জনাব মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা হলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রীর ফোনালাপ প্রকাশ করার বিষয়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কোন উৎসাহ দেখা যায়নি। ২০শে আগস্ট তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের সংশোধনী এনে পুলিশকে মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতায়ন করা হয়েছে। তাঁদের এখন আর কাউকে গ্রেফতার করার আগে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি নেয়ারও প্রয়োজন নেই। ক্ষমতা প্রয়োগের এমন সুবর্ণ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও পুলিশ নির্বিকার। রাজনীতির মাঠ গরম থাকলেও কার্যকর কোন ব্যবস্থা এখনো পর্যন্ত নিতে দেখা যায়নি। আমরা সাধারণ নাগরিকরা এখনো জানি না কে, কীভাবে এই ফোনালাপ হ্যাক করলেন আর কিভাবেই বা তা প্রকাশ হল। আর তাকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না কেন? এক্ষেত্রে টেলিভিশন বা অন্যান্য ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া সেটি প্রকাশ করে একই আইনের ৫৭ ধারায় অপরাধ করেছে কিনা? আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই দ্বৈত নীতি কেন?

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, “ ইলেক্ট্রনিক ফরমে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ ও উহার দণ্ডঃ (১) কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরণের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয়, তা হলে তার এই কায হবে একটি অপরাধ। (২) কোন ব্যক্তি উপ ধারা (১) এর অধীন অপরাধ করলে তিনি অনধিক দশ বছরের কারাদণ্ড কিংবা এক কোটি টাকার অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।” আইনটি অন্তর্নিহিত গোজামিলের কারণে এর সরল ব্যাখ্যা দাঁড় করানো মুশকিল হলেও এটি পরিস্কার বোঝা যায় যে, এই আইনের ফাঁদে যে কাউকেই ফেলা যায়। শুধু ইচ্ছা থাকা দরকার।

এই ফোনালাপ প্রচার নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আলোচনা যখন তুঙ্গে তখন, একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে জনাব ফরহাদ মযহার হরতাল চলাকালিন সময়ে কতিপয় টেলিভিশন চ্যানেলের সামনে পিকেটারদের বোমা বিস্ফোরণের স্বপক্ষে রুপক অর্থে বক্তব্য দেন, যাতে তিনি বলেন, “যে গণমাধ্যম পক্ষপাতদুষ্ট, সবার কথা বলে না, তাদের আরও বোমা মারা উচিৎ। পটকা ফোটানো কমই হয়েছে।“ এই বক্তব্য প্রদানের পর তার বিরুদ্ধে তেজগাও থানায় দুটি সাধারণ ডায়রি করা হয়েছে। পুলিশ এখনো কোন ব্যবস্থা নেয়নি। অথচ, একই প্রকার বক্তব্য প্রদানের কারণে পুলিশ ঢাকার প্রাক্তন মেয়র জনাব সাদেক হোসেন খোকার বাড়ীতে হানা দেয় তাকে গ্রেফতার করার জন্য। এরপর থেকে তিনি পলাতক থাকেন অন্তত দুই সপ্তাহ। তিনি বি, এন, পির এক সভায় সবাইকে দা, লাঠি, সরতাসহ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সরকার দলীয় কর্মীদের প্রতিরোধ করার জন্য আহবান করেন। হরতালে সহিংসতায় উস্কানি দেয়ার অভিযোগে একই রাজনৈতিক দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব জেল খেটেছেন। সচিবালয়ে বোমা ফাটানোর মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছিল। তাহলে জনাব মযহারের প্রতি এই আলাদা খাতির কেন? আমি এই বক্তব্যের মাধ্যমে কোনভাবেই সরকার কিংবা পুলিশ প্রশাসনের ৫৭ ধারা প্রয়োগের বৈধতা খোঁজার চেষ্টা করছি না বরং আইনের ব্যবহারের ভিন্নতা তুলে ধরতে ঘটনাবলির সহায়তা নিয়েছি মাত্র। আমাদের আইন, ক্ষমতা ও বিত্তহীনদের প্রতি যতটা কঠোর ততটা কঠোর নয় বিত্তবান ও ক্ষমতাশালীদের প্রতি। সমাজে সাম্য না থাকায়, আইনে সাম্য না থাকাটা আমাদের গা-সওয়া হয়ে গিয়েছে।

বিচার বিভাগ কগজে কলমে স্বাধীন হওয়ার পূর্বে ম্যাজিস্ট্রেসি প্রশাসনের অংশ থাকায় এতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কারণে আইনের প্রায়োগিক ভিন্নতা বেশ প্রকট এবং দৃষ্টিকটুভাবেই উপস্থিত ছিল। বিচার বিভাগ স্বাধীন হওয়ার পর বর্তমান অবস্থা কি তা কেবলমাত্র ভুক্তভুগিরাই বলতে পারবেন। রাজনৈতিক মামলা না হলে সংবাদমাধ্যমগুলো রিপোর্ট করে না বিধায় সাধারণের জানার বাইরে থেকে যায় প্রতিনিয়ত বিচারের নামে কি পরিমাণ আইনের ব্যত্যয় ঘটছে। ঔপনিবেশিক সময়ের আইনগুলো বিদ্যমান সময়ের সমস্যা সমাধানে কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে কারো কোন মাথা ব্যাথা নেই।

ঔপনিবেশিক আমলে শাসকরা কেবল সাম্রাজ্য বিস্তার ও শোষণের যে ভাবনা নিয়ে অসম যেসব আইন প্রণয়ন করেছিলেন, তাতে আমাদের নাগরিক হিসেবে কতটুকু মর্যাদা দেয়া হয়েছিল তা আর নতুন করে বোঝাবার দরকার নেই। কিন্তু একটি প্রশ্ন নতুন করে তোলা দরকার সেটা হল, আমাদের দেশের সকল নাগরিকের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আদৌ পালটেছে কি? যদিও বাংলাদেশের সংবিধান বলছে, আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান। কিন্তু আসলেই কি তাই? আমরা কি সত্যিকার অর্থেই ভাবতে শিখেছি আমাদের দেশের সকল শ্রেণী পেশার মানুষের অধিকার সমান? আমাদের আইন ও আদালত কি সত্যিকার অর্থেই সমভাবে প্রতিকার দিচ্ছে সকল নাগরিককে? ঢালাওভাবে না বললেও আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রে নিয়োজিত কর্মকর্তা কর্মচারীগণ অসম আইনের সুযোগ নিয়ে সাধারণ নাগরিকের করের টাকায় যেসকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন তা রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকগণ কি ভোগ করেন? প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীগণ এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগণ নিজেদেরকে কাগজে কলমে জনগণের সেবক বললেও তারা মূলত তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে এমন আইনই প্রণয়ণ ও তার বন্দনা করেন। সমাজ যেমন পরিবর্তনশীল সেই সাথে আইনের ব্যাখ্যার দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টানো দরকার। অন্যথায় “আইনের সাম্যতা” একটি সোনার পাথরবাটি হয়ে রইবে।

প্রকাশিতঃ অষ্ট প্রহর, বণিক বার্তা, ৯ নভেম্বর ২০১৩ ইং।

 

6 thoughts on “বাংলেদেশের আইনের দ্বৈত নীতি

  1. এমন দরকারি একটি প্রসঙ্গ যে এই আলোচনায় কিছু পর্যবেক্ষণ রেখে যাবার লোভ সংবরন করা গেলো না।

    এক.
    আজকাল বিভিন্ন আলোচনার টেবিলে একটি বিশ্লেষণের ধারা সম্পর্কে আলোচনা ঘুরে ফিরে আসে। সেটা হচ্ছে উত্তরোপনিবেশবাদ বা পোস্টকলনিয়ালিজম। কিন্তু একেবারেই সহজ করে দেখলেই আমরা লক্ষ্য করব, ঔপনিবেশিক একটা অতীত থাকার দরুন কোন জাতির মন-মননে তার একটা ছাপ থেকে যায়। কিন্তু একই সাথে একটি ছাপ যে সেই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং বিধি-বিধানের ওপরো থেকে যায় সেটাও কিন্তু লক্ষ্যনীয়। একজন নাগরিক হিসাবে আমার মনে প্রশ্ন এসেছে, যেসব সমাজের অতীতে ঔপনিবেশিকতা ছিলনা তারা কিন্তু নিজেদের প্রয়োজন মত করে আইন নিয়ে ভেবেছে, হয়ত সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছে সেই সমাজ/রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো। ফলে সেই সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক বিধি-বিধানে নাগরিক মানসের প্রতিফলন ঘটার একটি সুযোগ ছিল। কিন্তু যেসব সমাজ (যেমনঃ আমরা) উপনিবেশকালীন প্রচলিত অবস্থার ধারাবাহিকতায় নানারকম বিধিবিধান পেয়ে গেছি তারা কিন্তু কখনই নিজদের প্রয়োজন মাফিক আইনগুলোকে সাজানোর সুযোগ পাইনি। কেননা এই যুক্তি থেকেই যাচ্ছে যে “আইনতো আছেই, আবার নতুন করে সেটা নিয়ে ভাবার দরকার কী?” কিন্তু যেই আইন উপনিবেশিক শাসনের (পড়ুন শোসনের) নিয়ন্ত্রনের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তৈরি, সেই আইন ছত্রে ছত্রে একটি স্বাধীন গনতান্ত্রিক দেশের জন্য কতটা প্রযোজ্য? এছাড়া যেই সমাজ তাদের সমস্যাগুলোকে নিজেদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ভাবার সুযোগ পেলনা, তারা কী করে একটা মুক্ত এবং সংবেদনশীল (sensitive/reflexive অর্থে) সামাজিক মানস গঠন করতে পারে? একটা অদৃশ্য সত্ত্বা এখনো সেই সমাজকে কিন্তু নিয়ন্ত্রন করে যাচ্ছে, বিদ্যমান আইনের মোটা মোটা বইগুলোর ভেতর থেকে। আমি বুঝতে পারছি এটা পুরোপুরি আইনের প্রসঙ্গ নয়। কিন্তু আইনজ্ঞরা এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। এমন একটা স্পেইস তৈরি হওয়া দরকার যেখানে আইনজ্ঞরা দেশের নাগরিকদের সাথে আলোচনা করতে পারবেন। নাগরিক দায়-এর যায়গা থেকে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় ফিডব্যাক নিশ্চিত করার একটা পথ সেখান থেকে হয়ত রচিত হতে পারে। সেই দিক থেকে দেখলে এই লেখাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    দুই
    লেখাটা পড়তে কিছু প্রসংগ মনে আসল। যেমন আপনি সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছেন আমাদের দেশে আইনের স্বল্পতার সমস্যা নেই। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনুসারে আইন প্রণয়নে কতটা বিশদ পর্যায়ে যেতে হবে সেটা নিয়ে সব সময় একটা দ্বন্দ্ব থেকে যায়। একটা ছোটখাট সমীতি গঠনের সময়ও দেখা যায় খুটিনাটি অনেক বিষয় সাধারণ প্রজ্ঞা, সদস্যদের বিবেচনাবোধ এবং নর্মের ওপর ছেড়ে দেয়ার দরকার হয়। সেই যুক্তির যায়গা থেকে বিচারকের ডিস্ক্রেশনারি চিন্তার সুযোগ থাকার যৌক্তকতা পাওয়া যায়। আর যেখানে সেই সুযোগ থাকবে, তাতে কিছু আপাত দ্বৈততা থাকার সুযোগও তৈরি হবে বলে মনে হয়। তবে আপনি যেসব উদাহরন দিলেন তাতে সব ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয় হয়ত। বিশেষ করে ৫৭ ধারা প্রসঙ্গে যেটা মনে হচ্ছে এটা কেবল বিচারকের নয়, পুরো শাসন এবং বিচার ব্যবস্থার ডিসক্রেশানের উপরই হয়ত নির্ভর করছে যে কোনটাকে “অপরাধ” হিসাবে বিবেচনা করা হবে আর কোনটাকে হবে না।

    তিন
    মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি নিয়ে আমাদের সমাজে নানা আঙ্গিকে আলোচনা সম্ভবত অতীতে হয়েছে। কিন্তু এটা নিয়ে কি কার্যত কোন নাগরিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্যমত প্রতিষ্ঠা করা গেছে? যেখানে স্পষ্ট মতৈক্য নেই — সামাজিক ভাবে মানুষের জানা নেই মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে কোন পর্যায় পর্যন্ত চর্চা করা যাবে, আর কোনটা করলে সেটা “বাড়াবাড়ি” হবে — সেখানে নাগরিকরা কীভাবে মত প্রকাশ করবেন তার মধ্যে অস্পষ্টতা থেকে যায়। আমরা নিশ্চয়ই এমন কোন ব্যবস্থা চাইনা যেখানে প্রচলিত ব্যবস্থার মানুষকে ক্রিটিকাল হবার সুযোগ দেবে না। বিশেষ করে যারা শাসন ব্যবস্থায় থাকেন তারা নিশ্চয়ই জানেন গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটা সময় পরপর সরকার পাল্টায় — ফলে যেকোন সময়ে যারা শাসন করছেন বিরোধী অবস্থানে থেকে নাগরিক অধিকার নিয়েও একদিন তাদেরকে দাড়াতে হবে। এমনকি এখন যেই ধরনের দ্বিদলিয় ব্যবস্থা মোটামুটি স্থির হয়ে আছে — সেটাকে স্থির রাখতে চাইলেও নাগরিক অধিকারের পরিসর বিস্তৃত রাখাটাই ভাল রাস্তা হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই যায়গাটাকে সংকীর্ন করে নিয়ে আসার একটা প্রবনতা লক্ষ্য করা গেছে। এতে করে দীর্ঘমেয়াদের গনতান্ত্রিক ভারসাম্য বিনষ্ট হবার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

  2. জনাব ব্যারিষ্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়াকে ধন্যবাদ।আপনি ঠিকই বলেছেন, উপনেবেশিক শাসন আমলের আইনকে আমার স্বাধীন দেশে গ্রহণ করে নিয়েছি। এই আইন দিয়ে আমার জানা মতে, বাংলাদেশ,ভারত এবং পাকিস্তান চলছে। শুনেছি , এই আইনের যারা প্রণেতা তাদের দেশে অর্থাৎে বৃটেনের ডাষ্টবিনেও এ্ই আইন পাওয়া যায় না। আমাদের শাসন করার জন্য যা কিছু করার তারা সেটা আইন দিয়ে করার চেষ্টা করেছে। কিন্ত স্বাধীনতার ৪২ বছরেও স্বাধীন দেশের উপোযোগি আইন যে আইনে আমার দেশের মানুষের আশা আকাংখার প্রতিফলন ঘটবে তা করা হয়নি। ভবিষতে হবে কীনা জানি না। এবার আসা যাক ৫৪ ধারা প্রসংগে দেশের ফৌ:কা: বি: ৫৪ ধারা হলো সন্দেহ মূলক আটক/গ্রেফতার। এটি পুলিশকে ক্ষমতা প্রদানের একটি আইন। তবে এই আইনে গ্রেফতারের ক্ষেত্রেও কিছু নিয়মনীতি অনুসরণ করা আবশ্যক। কোন পুলিশ অফিসার বিনা ওয়ারেন্টে কোন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করতে হলে যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকতে হবে যে ওই ব্যক্তি আমলযোগ্য অপরাধের সাথে সম্পর্কযুক্ত।তা না হলে তাকে বিনা বিচারে জেলে পাঠিয়ে দেওয়ার পর যদি সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুক্তসঙ্গত আমলযোগ্য কোন মামলা দেওয়া না হয় তাহলে ন্যায় বিচারের স্বার্থে তিনি জামিন পাওয়ার হকদার।
    আর জামিনযোগ্য অপরাধে একজন ব্যক্তির জামিন পাওয়া তার অধিকার । আমলযোগ্য ক্ষেত্রে আদালতের বিবেচনার উপর নির্ভর করবে জামিন পাওয়া না পাওয়া। আর ১৬৭ ধারায় পুলিশ রিমান্ড মূলত জামিন আইনের ৪৯৭ ধারার সাথে অনেকটাই সাংঘর্ষিক। ৪৯৭ ধারা একজন ব্যক্তিকে জামিন দিতেই বলে রিমান্ড দিতে নয়। রিমান্ড কোন ক্ষেত্রে মঞ্জুর করা যায় তা আপনি আমার চেয়ে অনেক বেশী জানেন। বিস্তারিত আলোচনা যেতে চাইছি না। তবে আমার নিজের ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে হয় স্বাধীন দেশের উপযোগি করে আইন প্রণয়ন করা দরকার । আইন প্রণেতা, সরকারের আইন-বিচার বিভাগকে বিষয়টি ভেবে দেখার অনুরোধ করছি। আপনাকে আবারও ধন্যবাদ।
    এ্যাড. মুরশাদ সুবহানী, পাবনা। ১৩/১১/২০১৩ ইং।

    1. জনাব মুরশাদ সুবহানী, আপনাকে ধন্যবাদ আপনার মতামতের জন্য। আমার লেখায় আরও লিছু তথ্যের অসংগতি আছে- যেমন ব্লগারদের মামলা প্রথম আই,সি টি অ্যাক্টের মামলা নয়। এর আগেও পার্থ নামের এক ছাত্রের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, হুমায়ুন আহমেদের স্ত্রী শাওনকে হুমকি দেয়ায়ও মামলা হয়েছে। কিন্তু আমার লেখার শুরুটা দেখুন, “ঢাক ঢোল পিটিয়ে মামলা করা শুরু হয়েছে।” আমি বলিনি প্রথম মামলা করা হয়েছে।
      যাই হোক- আর পরের প্রসঙ্গ হল- জামিন অধিকার কিনা? আপনি ৪৯৭ ধারার কথা বলেছেন। কিন্তু আপনি যদি, ৪৯৭ ধারার ভাসাটা একটু লক্ষ্য করেন তাহলে দেখবেন- এতে ৫টি শর্ত দেয়া আছে- কখন কোর্ট জামিন দিতে পারেন আর কখন তা বাতিল করতে পারেন। এতে কিন্তু কথাও “শ্যাল” শব্দটি নেই, আছে কেবল “মে”। তাঁর মানে দাঁড়াল- এটি অবশ্যই বিচারকের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতার ব্যাপার। অথচ অস্ট্রেলিয়াতে ফৌজদারি আইনে কিছু শর্তের কথা বলা আছে যা পুরণ হলে একজন অভিযুক্ত জামিন অধিকার হিসেবে দাবী করতে পারেন। এতে বিচারকের ইচ্ছা অনিচ্ছার উপর নির্ভর করতে হয় না। অবশ্য আমি এমন এক দেশের আইন ব্যবস্থা নিয়ে যুক্তি দিলাম যেখানে আসামী সশরীরে আদালতে না গিয়ে অনলাইনে হাজিরা দাখিল করতে পারেন! তাই আমাদের দেশের ব্যবস্থার সাথে এই উদাহারণ যুক্তিযুক্ত না। তবে আমাদের স্বপ্ন দেখতে তো দোষ নেই। তাই আপনার নতুন আইন প্রণয়নের দাবীর প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন আছে।

      1. ব্যারিষ্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আমার প্রস্তাবনার প্রতি সমর্থন দেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আর আমার উপস্থাপিত জামিন আইনের ৪৯৭ ধারা ৫টি শর্ত সম্যক অবগত আছি। May শব্দ বিজ্ঞ আদালতের স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা এর সাথে আইনগতভাবে একমত পোষণ করছি। তবে বিজ্ঞ আদালতের স্বেচ্ছাধীন/অসীম ক্ষমতা যাতে স্বৈরাচারী ক্ষমতায় নিপতিত না হয় সেজন্য আদালাতের স্বেচ্ছাধীন এই ক্ষমতা আমাদের দেশের আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করা আছে।এটা একবারে সীমাহীন ক্ষমতা নয়। আমি আপনার লেখার যে অংশের উপর আলোকপাত করেছিলাম, তা হলো রিমান্ড’র মানে আমার বিজ্ঞ বন্ধু জানেন, তবু বলছি রিমান্ড’র ১৬৭ ধারা সংগায়িত করা না হলেও এর অর্থ হলো কোন ব্যক্তিকে কোর্টের এখতিয়ার থেকে পুলিশের হেফাজতে দেয়া। এই রিমান্ড কোন কোন ক্ষেত্রে দেয়া যায় তারও নীতি নিয়ম আছে। একজন ধৃত হলেই পুলিশ রিমান্ড চাইলেন, আর বিজ্ঞ আদালত হুটহাট রিমান্ড মঞ্জুর করে দিলো, তাতো হবার কথা নয়। সেই ব্যক্তিকে পুলিশের হেফাজতে দেয়া যেতে পারে যাকে সনাক্ত করা যাচ্ছে না, যার কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে যা মামলার স্বার্থে প্রয়োজন, দাগি-আসামী, চোর-ডাকাত যাকে আরো জিজ্ঞাসাবাদ করলে অন্য আসামীদের পরিচয় জ্ঞাত হওয়া যাবে ইত্যাদি। সুনির্দিষ্ট কোন কেস না থাকলে কাউকে রিমান্ডে নেয়া যায় না। জামিন আইনের ৪৯৭ ধারা একজন ব্যক্তিকে (৫টি শর্ত যা বর্ণিত রয়েছে এই ধারায়) জামিনের দিকেই ঝুঁকে আছে।সেই কারণে ১৬৭ ধারা ৪৯৭ ধারার সাথে অনেকটাই সাংঘর্ষিক। আপনাকে ধন্যবাদ।

  3. রিয়াজ উদ্দীন ভাই, আপনার মন্তব্য নিয়ে বিশদ আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। আপনার পয়েন্টগুলো নিয়ে আর একটি পূর্ণাঙ্গ লেখা দেয়ার প্রতিশ্রুতি রইল। আপনার সাথে আপাতত একমত যে আমাদের ঔপনিবেশিক আইনের ধ্যান ধারণা থেকে আমাদের বের হয়ে এসে নিজস্ব আইন প্রণয়নের সুযোগ আমরা পাইনি। আমাদের পোস্ট কলোনিয়াল চিন্তা ধারার একটি সুনির্দিষ্ট ধারা আছে। সেটি প্রায় সব ক্ষেত্রেই ন্যায় বিচারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। টার্ম টা “ন্যায় বিচার”। আমাদের দেশে বিচার হয়- উভয় পক্ষ বিচার পান কিন্তু সেটা সব ক্ষেত্রে ন্যায় বিচার হয় কিনা খুব খুব সন্দেহ আছে। এনিয়ে খোলাখুলি কথা বলার বিপদ আছে- ১৯২৬ সালের আইন খড়গহস্ত হতে পারে! আপনি সব বিষয় বাদ দিয়ে কেবল, বিচারক নিয়োগের বিষয়টি ধরেন না কেন। নিম্ন আদালত ও উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রথমটি পি,এস,সি’ র মাধ্যমে হলেও পরবর্তীটি হয় ৯০ ভাগ আইনজীবীদের মধ্য থেকে যাদের প্র্যাকটিসের বয়স ১০ বছরের উপরে। বাকী ১০ ভাগ আসে জেলা জজ থেকে। আপনার নিশ্চয় অনুমান আছে এই ৯০ ভাগের মধ্যে কারা, কোন বিবেচনায় নিয়োগ পাছেন। এই নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে- যোগ্যতা নিরধারনে এই ১০ বছর প্র্যাকটিসের বাধ্যবাধকতা যথেষ্ট কিনা? ধরুন, আমি ২০১৩ সালে সুপ্রীম কোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হলাম তারপর কোন প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়ে নিলাম আইন কর্মকর্তা হিসেবে, কিন্তু আমি বার কাউন্সিলের ফি এবং সুপ্রীম কোর্ট বারের ফি নিয়মিত পরিশোধ করে গেলাম যাতে আমার মেম্বারশিপ ঠিক থাকে। ১০ বছর পর আমার মনে হল, আমি একি করছি? আমি আইন পেশায় ফিরে গেলাম। তারপর আমি প্রচলিত পন্থায় বিচারক হওয়ার জন্য আদেবন করলাম। আমার অভিজ্ঞতা না থাকলেও আমি আবেদন করতে কোন বাধা নেই। তবে এটা ঠিক যে এছাড়াও অলিখিতভাবে আরও কিছু বিষয় বিবেচনায় আনা হয়- যেমন আপনার পলিটিক্যাল অরিয়েন্টেশন, কোর্টে আপনার উপস্থিতি ইত্যাকার সব বিষয়। এনিয়ে বিস্তারিত পরবর্তীতে লেখার ইচ্ছা রইল।

    1. “আপনার পয়েন্টগুলো নিয়ে আর একটি পূর্ণাঙ্গ লেখা দেয়ার প্রতিশ্রুতি রইল” — অনেক ধন্যবাদ। অপেক্ষায় থাকলাম জ্যোতির্ময় দা। বিচারক নিয়োগ প্রসঙ্গে আপনি যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সেটা বেশ গুরুতর মনে হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে তেমন কিছু জানা ছিলনা। এই ধরনের সমস্যায় আইনবিদদের পেশাজীবি গোষ্ঠী/সংগঠন কোন ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে কিনা সেই প্রশ্ন মনে আসলো। আবার মনে পড়ল কিছুদিন আগে আকবর আলি খানের একটি সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম যেখানে পেশাজীবিদের কাজের মান উন্নয়নের উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং পরিবেশ সম্পর্কে ওনার কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম। http://kathakata.com/archives/608

      তখন উনি উদাহরন হিসাবে আইন পেশার সম্পর্কে কিছু পর্যবেক্ষণ রেখেছিলেন যেগুলো এখানে উদ্ধৃত করে রাখছিঃ

      “আমাদের অনেকগুলি পেশাজীবী সংগঠন সরকার কর্তৃক স্বিকৃত এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে কোন কোন পেশাগত সংগঠন তাদের দায়িত্ব ভালভাবে পালন করতে পারছেননা। যেমন একটি পেশাগত সংগঠন যার সম্বন্ধে প্রায়ই বিভিন্ন অভিযোগ শোনা যায়। যেমন বাংলাদেশে যারা আইনজীবী আছেন তারা অনেকেই সঠিক ভাবে কাজ করেননা। কিন্তু সঠিক ভাবে কাজ না করলে পেশাগত দিক থেকে ব্যবস্থাও গৃহীত হয়না, কারন তাদের সংগঠন তাদের দ্বারা নির্বাচিত। কাজেই তাদের নির্বাচিত সংগঠন তাদের বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করেনা। এই নিয়ে আমি আনেক প্রাক্তন বিচারপতির সাথে আলোচনা করেছি, তারা মনে করেন এই দায়িত্ব বিচারপতিদের হাতে ন্যস্ত করা উচিত। যেমন পাকিস্তান আমলে লিগ্যাল প্রাকটিশনার্স এক্টে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রনের দায়িত্ব বিচারকদের দেয়া হয়েছিল। তারপর আইয়ুব খানের আমলে বার কাউন্সিল এক্ট করে লিগাল প্র্যাকটিশনার্সদের ওপর বিচারকদের ক্ষমতা খর্ব করে দেয়া হয়েছে। আমি অনেক প্রাক্তন বিচারককেই দুঃখ প্রকাশ করতে দেখেছি যে এই ব্যবস্থাটি দেশের বিচার ব্যবস্থার জন্য ভাল হয়নি।”

      বাংলাদেশের সামগ্রিক বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো আগামি দিনে সঠিক লক্ষ্য অনুসারে আগাবে কিনা তার ওপর সামগ্রিক ভাবে বাংলাদেশের সমাজের উত্তরন অনেকাংশে নির্ভর করবে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে যারা পেশাজীবি তারা কী ভাবছেন সে সম্পর্কে নাগরিকদের জানার সুযোগ তেমন নেই। এই ধরনের বিষয় নিয়ে আপনার কাছ থেকে আরো লেখার আশায় থাকলাম।

Leave a Reply