আইনের শাসনের সঙ্গে গুম-খুনের সহবাস

Spread the love

 

বিগত ১৬ এপ্রিল পরিবেশ আইনবিদ সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান এর স্বামী আবু বকর সিদ্দিক নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার একটি পেট্রোল পাম্প থেকে কতিপয় অস্ত্রধারী সন্ত্রাসিদের দ্বারা অপহৃত হয়ে দীর্ঘ ৩৫ ঘন্টা নিখোঁজ থাকার পর অপহরণকারীরা তাকে ছেড়ে দিলে তিনি ১৮ এপ্রিল দিবাগত রাতে ফিরে আসেন। তার অপহরণ হওয়া কিংবা অতি নাটকীয়ভাবে ফিরে আসা সবই রহস্যময়। এই অপহরণের পর সমাজের একটি বৃহৎ অংশ দলমত নির্বিশেষে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছেন। অনেকের সাথেই সৈয়দা রেজওয়ানা হাসান এর কাজ নিয়ে মত ভিন্নতা আছে, অনেক রটনাও আছে। কিন্তু তার স্বামী যখন অপহৃত হল তখন সেটি বাঁধা হয়ে দাড়ায়নি। এখানে আইন বহির্ভূতভাবে জনাব সিদ্দিকিকে আইন বহির্ভূতভাবে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে সবার প্রতিবাদটাই মুখ্য ছিল।

ঘটনার বিবরণে প্রকাশ- দিন দুপুরে একদল সশস্ত্র ব্যক্তি জনাব আবু বকর সিদ্দিককে অস্ত্রের মুখে জোর করে অপহরণ করে নিয়ে যায়। তিনি খুবই ভাগ্যবান মানুষ যিনি সমস্ত জল্পনা কল্পনার মুখে ছাই দিয়ে জীবিত ফিরে এসেছেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে ইতিপূর্বে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া কেউই জীবিত ফিরে আসেননি। দৈনিক সংবাদপত্রের হিসেব অনুযায়ী, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মিলে বিগত এক বছরে মোট ১৫৭ জন ব্যক্তি গুম ও খুন হয়েছেন। তাদের মধ্যে তানভীর মোহাম্মদ ত্বকীসহ মোট বিশজন শিশুও শীতলক্ষ্যায় লাশ হয়ে ভেসে উঠেছে। খুব সম্প্রতি বিগত ২৭ এপ্রিল, নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালত প্রাঙ্গন থেকে একটি মামলায় হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে নারায়ণগঞ্জের পৌর কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র জনাব নজরুল ইসলাম, তার তিনজন বন্ধু ও গাড়ী চালক, অপর একটি গাড়ীতে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার চালকসহ মোট সাতজনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কিছু সশস্ত্র ব্যক্তি “তুলে” নিয়ে গেছে বলে প্রাইভেট টেলিভিশনগুলোর সেদিনের সংবাদ থেকে জানা যায়। একই সাথে সাতজন ব্যক্তিকে “তুলে” নিয়ে যাওয়ার ঘটনা এই প্রথম। তাদের পরিবারের সদস্যরা স্থানীয় থানা ও র‍্যাব কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে তারা কাউকে গ্রেপ্তার করেননি বলে জানান। তারপর এসব পরিবারের সদস্যরা শঙ্কিত হয়ে পড়েন। ২৭ এপ্রিলের পর থেকে নারায়ণগঞ্জ ছিল প্রতিবাদে মুখর। অপহরণের তিনদিন পর ৩০ এপ্রিল বিকেলে শীতলক্ষ্যায় ছয়টি লাশ ভেসে ওঠে, যাদের মুখমণ্ডল ছিল ঝলসানো, পেট কাটা, পায়ে ইটের বস্তা বাঁধা, যাতে লাশ ভেসে উঠতে না পারে। রাতে নিহতদের আত্মীয়-স্বজনরা তাদের লাশ শনাক্ত করেন। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে অপর একটি লাশ ভেসে ওঠে। এভাবে অপহৃত সাত জনের লাশই পাওয়া যায়। স্থানীয় সুত্রে জানা যায়- অপহরণের ঘটনায় স্থানীয় থানায় একটি মামলা হয়েছে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হননি।

২৭ এপ্রিল অপহরণের (তুলে নেওয়ার) পর ৩০ এপ্রিল অপহৃত সাত জনের লাশ পাওয়া যাওয়ার ফলে বোঝা যায়- অপহরণকারীরা তাদের ছেড়ে দেয়ার মত ঝুঁকি নিতে চাননি। এতে সন্দেহ প্রকট হয় যে যারা অপহরণ করেছিলেন তারা অপহৃতদের পরিচিত ছিলেন। এতগুলো মানুষ একসাথে অপহরণ করে যারা মেরে ফেলার সাহস রাখেন তারা অন্তত এতটুকু নিশ্চিত ছিলেন যে তাদের সমস্যা হবে না। এই ভরসার জায়গাটি ভাঙ্গা না গেলে এধরণের অপরাধ বন্ধ করা যাবে না।

নারায়ণগঞ্জেসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গুম, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, হত্যা করে মাথা কাটা লাশ নির্জন এলাকায় ফেলে যাওয়া, বস্তাবন্দি লাশ এসব নিত্য দিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও সংগঠিত প্রতিবাদ নেই। খুব কমসংখ্যক কিছু ঘটনায় পুলিশের সক্রিয় ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে অপহৃত ব্যক্তি উদ্ধার পাচ্ছেন। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনার কোন সুরাহা হয় না। ফলে অপরাধীরা উৎসাহ পায়। নারায়ণগঞ্জের বিগত এক বছরের ১৫৭টি গুম ও হত্যাকান্ডের ঘটনার মধ্যে কেবল সিয়াম হত্যার আসামিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ঘটনাগুলো এখনো তদন্তের পর্যায়ে রয়ে গেছে। তানভীর মোহাম্মদ ত্বকীকে নিয়ে তার বাবা রাফিউর রাব্বির আহাজারি এখনো নারায়ণগঞ্জের বাতাস ভারি করে তোলে। তার সাথে নতুন সাতজনের পরিবার যুক্ত হলেন।

বিগত ২৭ এপ্রিল সাতজন ব্যক্তি গুম হওয়ার পর থেকে, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারকে উদ্ধারের জন্যে মহামান্য হাইকোর্টে একটি “হ্যাবিয়াস কর্পাস” রিট দাখিল করার কথা ভাবা হচ্ছিল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছিল তাঁর “কাস্টুডি” নিশ্চিত করা নিয়ে। সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি “হ্যাবিয়াস কর্পাস” রিট করতে হয় তাহলে এটি নিশ্চিত করতে হবে যে, আটক ব্যক্তি কোন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক আছেন এবং তিনি ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তাদের হাতে আটক আছেন। চন্দন সরকার কিংবা অপর ছয়জন কারো ক্ষেত্রেই এটি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছিল না। পুলিশ কিংবা র‍্যাব কোন বাহিনীই তাদের আটক করেছেন বলে স্বীকার করেননি। এক্ষেত্রে একমাত্র প্রতিকার ছিল সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করা কিংবা তারা যদি ব্যবস্থা না নেন তবে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অপহৃতদের উদ্ধারের জন্যে মামলা করা। যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধেই অভিযোগ থাকে তাহলে, এই বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে তা বলাই বাহুল্য। এছাড়াও- নিখোঁজদের পরিবারের কেউ দাবি করেননি তাদের অপহরণ করা হয়েছে। “অপহরণ” করা বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে সংজ্ঞায়িত একটি অপরাধ, প্রমাণ সাপেক্ষে যার শাস্তি নিরুপন করা আছে। কিন্তু অভিযোগ যদি আসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক আইন বহির্ভূতভাবে গ্রপ্তারের এবং তারা যদি সেটি স্বীকার না করেন তাহলে আইনের ফাঁকে পড়ে সমস্যা হাবুডুবু খেতে থাকে। কারন নিয়ম অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন সদস্য ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষরিত গ্রেপ্তারী পরোয়ানা ব্যতীত কাউকে গ্রপ্তার করতে পারবেন না। বিষয়টি গ্রেপ্তার, অপহরণ নয়। যদি তারা গ্রেপ্তার স্বীকার না করেন আর অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধেই করা হয় তখন সেটি গ্রেপ্তার না হয়ে অপহরণে পরিণত হয়। তাছাড়া, এরকম ক্ষেত্রে যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে থানা কিংবা নিম্ন আদালতের দীর্ঘ প্রক্রিয়া সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মত যথাযথ ও দ্রুত ব্যবস্থা কিনা তা-ও বিবেচনায় আনা জরুরী। কেননা মানুষের জন্যে আইন, আইনের জন্যে মানুষ নয়। চলমান ও ভবিষ্যৎ সমস্যা নিরসনে আইনের এই দিকটি, আইন ও বিচার বিভাগের নজরে আসবে, এই প্রত্যাশা করি।

আমাদের দেশে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো, বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর মত অপহরণ কিংবা অন্য কোন সহিংসতার পর দায়িত্ব স্বীকার করে না। তাই, আমাদের তিমিরেই থেকে যেতে হয়। আমরা অন্ধকারে হাতড়াতে থাকি। আমাদের সন্দেহের তীরগুলো উদ্দেশ্যহীনভাবে এধার ওধার গিয়ে পড়ে।

প্রায় একই চিত্র আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর। তারা যখন বলেন কোন একটি অপহরণের অভিযোগের সাথে তাদের সম্পৃক্ততা নেই তখন একটি গুরুতর ব্যাপার সবার অলক্ষে চোখ এড়িয়ে যায়, তা হল- তাদের বিরুদ্ধে অপহরণ কিংবা তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগই করা হয়। গ্রেপ্তার করার অভিযোগ ওঠে না। তাদের এই অভিযোগ খন্ডনের ক্ষেত্রে যতটা জোরালো কন্ঠস্বর থাকা উচিত তা কিন্তু আমরা দেখি না। তাই তাদের উপরও আমাদের বিশ্বাস ক্ষীণ হতে থাকে। এই অবস্থা নাগরিকদের জন্যে মোটেও সুখকর নয়। কারণ তারা বিপদে আপদে সাহায্যের জন্যে যাদের কাছে ছুটে যাবেন তাদের দিকেই যদি অভিযোগের আঙ্গুল ওঠে তাহলে নিশ্চিত ভরসার জায়গাটিও আর থাকে না। এই অসহায়ত্ব নাগরিকের সাথে রাষ্ট্রের অনেকগুলো চুক্তি ভঙ্গ করে।

গুম আর হত্যার এই মহোৎসবে নিত্যই নতুন নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে। সমস্যা সমাধানে আমাদের পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চাই না। কেননা, আমরা এখন জানি, পুলিশ কোন সময়েই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। তাই তাদের নিয়ন্ত্রনের সুতো যাদের হাতে, তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করে পুলিশের দক্ষতা ও সাফল্য।

সাগর-রুনি যখন তাদের শোবার ঘরে খুন হলেন, তখন তৎকালীন মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরবর্তী আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তারপর কত আটচল্লিশ ঘন্টা গড়িয়েছে তার ইয়ত্তা নাই। পরবর্তীতে নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব হাতে নেয়ার পর সাগর-রুনির চরিত্র হননের চেষ্টা করেন। অক্ষমের কত রকমেরই না আস্ফালন থাকে! তিনিও সাত দিনের মধ্যে সকল অপরাধীকে ধরার নামে অন্য এক ডাকাতি মামলার আসামীদের সাগর-রুনির হত্যাকারী হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। বর্তমান সরকার ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর নতুন করে ক্ষমতায় আসার পর এখনো অবধি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় কারো হাতে ন্যস্ত করেননি। অনুমান করি- বিগত সময়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্মরণে রেখেই এই মন্ত্রণালয় নিজের হাতে রেখেছেন। আমরা এই শ্বাসরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছি- যখন তিনি মাননীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে ডেকে অপরাধী যেই হোক না কেন তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে আমরা আরও স্বস্তি পাব যদি দেখি, ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ দেবার আর প্রয়োজন হচ্ছে না। তার আগেই তারা সকল শক্তি প্রয়োগ করে প্রচলিত আইনে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন, কারো নির্দেশের অপেক্ষা করবেন না। কারণ, অপহরণের মত একটি ফৌজদারি অপরাধ সংগঠনের সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে পুলিশের নিজেদের নিয়মে সক্রিয় হওয়ার কথা। তাদের আলাদা করে নির্দেশ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

দেশের সকল মানুষের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত পৌঁছানোর সাধ্য নেই, সকল সমস্যা তাঁর নজরে পড়বে এমন নিশ্চয়তাও নেই। কিন্তু সকল নাগরিকের আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার আমাদের সংবিধান দিয়েছে। তাছাড়া, রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের চুক্তির মুল শর্তই হচ্ছে, রাষ্ট্র তার নাগরিকের আনুগত্যের বিপরীতে অন্যান্য অধিকার সংরক্ষণের পাশাপাশি তার জীবন ও মালের নিরাপত্তা প্রদান করবে।

দেশে এখনো অনেক মানুষ গুম হয়ে আছেন বা হচ্ছেন বলে প্রতিনিয়ত সংবাদমাধ্যমে জানতে পারছি। এতে দেশের সাধারন মানুষের মনে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে- যে কেউ যে কোন মুহূর্তে গুম হয়ে যেতে পারেন। সমাজে একসঙ্গে থাকতে গেলে হাঁড়িপাতিলের এক সঙ্গে থাকার মত ঠোকাঠুকি হবেই, কিন্তু তাই বলে কথায় কথায় একে অন্যকে হত্যা করতে উদ্ধত হওয়া স্বাভাবিক লক্ষণ নয়। আমাদের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা আমাদের দিনে দিনে অসহিষ্ণু  করে তুলেছে, নিছক চুরির অভিযোগেও পিটিয়ে মেরে ফেলার সংস্কৃতি চলছে। কয়েক বছর আগে কেবল ছিনতাইকারী আর ডাকাতদের পিটিয়ে মারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন কে কখন কাকে মারছেন নিশ্চিত করে বলা যায় না। অব্যাহত সন্ত্রাসের কারণে দেশের সাধারন মানুষ একসময় ক্রসফায়ারের মত বেআইনি হত্যাকে নীরব সমর্থন দিয়েছে, এখন তার নেতিবাচক দিক সবাইকে ভোগ করতে হচ্ছে। আজকের এই অবস্থার জন্যে তাই, কোন বাহিনী বা সন্ত্রাসীরা দায়ী নন, এর দায়ভার সকল নাগরিককেই নিতে হবে। সবার জন্যে সমান একটি আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে না পারার ব্যর্থতা, নিজের স্বার্থের উপরে উঠে অন্যায় কে অন্যায় বলার সৎ সাহস না থাকার ব্যর্থতা, নিজের অধিকার বুঝে নিতে না পারার ব্যর্থতা, সবই আজকের অবস্থার পেছনে দায়ী।

নারায়ণগঞ্জে তানভীর মোহাম্মদ ত্বকীকে যখন গুম করে পরে হত্যা করা হয় তখন অনেকেই মুখ খোলেননি, রাফিউর রাব্বির আন্দোলনের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক ছিল না বলে, তারও আগে যখন ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হলেন, অনেকেই মুখ খোলেননি তার রাজনৈতিক বিশ্বাসের সাথে একমত ছিলেন না বলে, নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক বিশ্বাসও অনেককে হয়ত এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করা থেকে বিরত রাখছে। কিন্তু, এতে একটি গুরুতর সমস্যা নিজের নয় বলে পাশ কাটানোর ব্যর্থ চেষ্টা থাকে, সমাধান থাকে না। একটি জাতি সামগ্রিকভাবে এগিয়ে যেতে হলে আইনের শাসন কায়েম থাকা খুবই জরুরী। গণতন্ত্রের ভাষা বিশ্বের অনেক দেশেই এখন পরিণত, আমরা তাদের কাছেও শিখতে পারি। আমরা কেবল মুখেই গণতন্ত্রের কথা বলছি। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে যেসব গণতান্ত্রিক আচরণ দেখি তা আমরা শিখে উঠতে পারছি না। এদেশে ক্ষমতা এমনই এক জিনিস, পেলে আর কেউ ছাড়তে চান না। সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ায় ফেরী ডুবে তিনশ’র অধিক মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তুমুল সমালোচনার মুখে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা তাই আমাদের বিব্রত করে না। রানা প্লাজাতে যে পরিমান শ্রমিককে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা হয়েছে তাতে অনেক মন্ত্রীর একযোগে পদত্যাগ করাই যথার্থ হত!

জনাব আবু বকর সিদ্দিককে কে বা কারা অপহরণ করেছে- তা আমরা এখনো জানি না। নানান কান কথায় গুরুত্বও দিতে চাই না। পুলিশের তদন্ত যদি নির্বিঘ্নে চলে, তবে আমরা হয়ত শীঘ্রই জানতে পারব সেসব কথা। নারায়ণগঞ্জ একটি ত্রাসের জনপদ। সেখানে নদীতে মাছের পরিবর্তে লাশ ভাসে প্রতি নিয়ত। লাশের মিছিলে সামিল হয়েছে শিশু, কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। রেজওয়ানা হাসান তার স্বামীর অপহরণের পর সাংবাদিকদের বলেন, নারায়ণগঞ্জের টর্চার সেলগুলোতে খোঁজ নিলে হয়ত তার স্বামীকে পাওয়া যাবে। একথার জবাবে, পুলিশের এক কর্তাব্যক্তি জানিয়েছেন যে, তারা সেসব টর্চার সেল আগেই ভেঙ্গে দিয়েছেন। এ কথায় পুলিশের উক্ত কর্মকর্তা মূলত স্বীকার করে নিলেন, নারায়ণগঞ্জে টর্চার সেল ছিল। এসব তারা এতদিন স্বীকার করেননি। রাফিউর রাব্বি কিংবা আইভি রহমান যেসব অভিযোগ করে আসছিলেন এতদিন পর তা সত্য বলে প্রমাণ হল। তাহলে ত্বকীর হত্যাকারীদের খুঁজে বের করতে এতো দেরি কেন? তারা তো জানেন, কোথায়, কার নির্দেশে ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছে।

পরিশেষে বলতে চাই, সাতটি লাশের দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। আমরা আমাদের আইনি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরে পেতে চাই। আমাদের পুলিশ যেন আমাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে ওঠে।

প্রথম প্রকাশঃ ৩ মে, ২০১৪, বিডিনিউজ২৪ডটকম।

 

Leave a Reply