এক তরফা নির্বাচন কি নিয়তি-নির্ধারিত?

Spread the love

বাংলাদেশে নির্বাচন যে আসন্ন সে কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা।  সর্বশেষ খবর অনুযায়ী নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের দিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষনা করবে। ধারণা করা হচ্ছে,   ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অথবা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ভোট গ্রহণ করা হবে। কিন্ত সে নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে, গ্রহণযোগ্য এবং  সুষ্ঠূ হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা দূর হবার মতো কোন কারন ঘটেনি। প্রধান বিরোধী দল এখন পর্যন্ত  যে বক্তব্য দিয়েছে তাতে মনে হয় তাঁরা নির্বাচনে যেতে উৎসাহী হলেও শেষ পর্যন্ত  নির্বাচনে অংশগ্রহণ নাও করতে পারে। সেক্ষেত্রে সাংবিধানিক বাধ্যবাধ্যকতার কারনে হলেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলেই আমরা ধরে নিতে পারি।

বাংলাদেশে গত ৪২ বছরে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেছে তিনটি রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জাতীয় পার্টি (জাপা)। এর মধ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে নয়টি; চারটি নির্বাচন হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। বাকী পাঁচটি নির্বাচনের মধ্যে দুটো নির্বাচন হয়েছে যেখানে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো অংশ নেয়নি। এই দুটি নির্বাচনের সময় ক্ষমতায় ছিল জাতীয় পার্টি এবং বিএনপি। জাতীয় পার্টির শাসনে করা নির্বাচন হয় ১৯৮৮ সালে যেখানে বিরোধীরা কেউই অংশ নেয়নি। সেসময় দেশে প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি চালু ছিল। ১৯৮৬ সালে বিএনপি এবং বাম দলের জোট’ (পাঁচ দল)-কে বাদ দিয়ে করা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গড়া সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হয় ৬ ডিসেম্বর ১৯৮৭ সালে। তাঁর তিন মাসের মাথায় ৩ মার্চ ১৯৮৮ সালে সংসদ নির্বাচন করা হলে তাতে বিরোধীরা কেউ অংশ নেয়নি। অন্তর্বর্তী সময়ে কোনো প্রধানমন্ত্রী থাকা না থাকা বিবেচ্য বিষয় ছিলনা, কেননা ক্ষমতা তখন রাষ্ট্রপতির হাতে। বিএনপি’র শাসন আমলে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন হয় তা হয় তাতে আমারা জানি যে প্রধান কোনো রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি।  কিন্ত সে সময় একজন প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি ‘অন্তর্বর্তী’ সরকার ছিল। যেহেতু সেই নির্বাচন হয়েছিল সংসদীয় ব্যবস্থায় সেহেতু প্রধানমন্ত্রীর হাতেই ছিল ক্ষমতা। (এর আগে ১৯৭৩ সালের নির্বাচন হয়েছিল যখন সংসদীয় ব্যবস্থা চালু ছিল, একটি অন্তর্বর্তী সরকারে অধীনে নির্বাচন হয়েছিল)।

নির্বাচনের  এই ইতিহাস থেকে বলা যায় যে প্রধান বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করার ইতিহাস বিএনপি এবং জাপা’র রয়েছে। একে যদি আমরা কলঙ্ক তিলক বলে বর্ননা করি তবে বলতেই পারি যে বাংলাদেশের এ যাবতকালের তিন ক্ষমতাসীনের মধ্যে দুই দলের কপালেই এই কলঙ্কের তিলক রয়েছে। আওয়ামী লীগের তা নেই।  আসন্ন নির্বাচনে কি সেই ইতিহাস পরিবর্তিত হবে? আওয়ামী লীগের জন্যে এখন সেই পরীক্ষা।  দল হিসেবে সে অন্য ক্ষমতাসীনদের মতো এই কলঙ্ক তিলক পড়তে চায় কিনা সে সিদ্ধান্ত ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে।

অনেকেই হয়তো বলবেন বিএনপি না এলেও অন্য দলেরা এতে অংশ নেবে এবং আওয়ামী লীগকে অন্য দুই দলের কাতারে দাঁড়াতে হবে না। তাঁদের জন্য এই তথ্যগুলো জানিয়ে রাখি যে, যে দুই নির্বাচনের কারনে জাপা এবং বিএনপি’কে আমরা এই কলঙ্কের তিলক পড়িয়েছি সেই দুই নির্বাচনে তাঁরা একা ছিলোনা। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী ১৯৮৮ সালে একটি মোর্চা সহ ৮টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিলো; ৭৬৩ জন প্রার্থী রাজনীতিক দলের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র জমা দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। স্বতন্ত্রদের কথা না হয় বাদই দিলাম। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে, নির্বাচন কমিশনের কাগজপত্র জানাচ্ছে ৪৩টি দল অংশ নিয়েছিল। ফলে সংখ্যার  বিবেচনায়, সরকারী হিসেবে কোনো নির্বাচনই ‘এক-দলীয়’ বা ‘এক তরফা’ নির্বাচন হয়নি।   কিন্ত এই দুই নির্বাচনকে আমরা কি আর অন্য কোনভাবে বর্ণানা করতে পারি?  এই ধরণের নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা যে  থাকেনা সেটা সবাই জানেন। প্রশ্ন হচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামি লীগ যে এই পরীক্ষার মুখোমুখি সেটা উপলব্ধি করে এই শেষ দিনগুলোতে কী ব্যবস্থা নিতে পারে।  না কি তাঁরা একে ‘নিয়তি নির্ধারিত’ বলেই ধরে নেবে?

Leave a Reply