জাতীয়তাবাদ ও রাজনীতি : সাম্প্রতিক বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

Spread the love

একটি জটিল ও দু:সহ পথে হাঁটছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি। প্রায় পুরো দেশ বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে দু’টি বিপরীতমুখী ও আগ্রাসী শিবিরে। বাংলাদেশের সর্বস্তরে এ ধরণের রাজনৈতিক মেরুকরণ মোটেও নতুন নয়। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানও শাসনযন্ত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ে সুবিধালাভ ও আদর্শিক বিভক্তির কারণে দুই মেরুর অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এ মেরুকরণ যে ধরণের তীব্র ও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তার তুলনা পাওয়া মুশকিল। প্রচন্ড অসহনশীল ও অবিবেচক হয়ে উঠেছে সমাজ। এই অসহনীয় পরিস্থিতিতে উগ্র ও অন্ধ দলপন্থি ছাড়া বাকি সবার মনেই বেশ কিছু প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে। জনমত ও জরিপগুলো সুষ্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে, সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের আবার ক্ষমতায় আসার সম্ভবনা খুবই ক্ষীণ। এমনিতেই বাংলাদেশে নিয়মতান্ত্রিকভাবে একই রাজনৈতিক দল পরপর দুইবার ক্ষমতায় আসার কোন উদাহরণ নেই, তার উপর আওয়ামী সরকার নানা কারণে জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার এই পালাবদলে ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ভবিষ্যত কি হবে?’ অনেকেই মনে করছেন বিএনপি-জামায়াত জোট এই বিচার স্থগিত করে দিবে। এই আশঙ্কার সাথে সাথে উঠে আসে দ্বিতীয় প্রশ্ন,  ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাস্তবায়নের স্বার্থে আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় রেখে জামায়াত ও হেফাজতের মত উগ্রপন্থীদের উত্থান রোধ করা কি বেশি জরুরি? নাকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার স্থগিত হয়ে যেতে পারে এ আশঙ্কাকে সামনে রেখে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল জরুরি?’ আওয়ামী সমর্থক অথবা আওয়ামী সমালোচক হয়েও যুদ্ধাপরাধের বিচারের স্বার্থে বর্তমান সরকারের নীতির সমর্থক অনেকেই চাইছেন দরকার হলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত এ সরকার বহাল থাকুক, তারপর নির্বাচন। গণতান্ত্রিক পালাবদলের চাইতে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধীদলকে দমিয়ে রেখে হলেও যুদ্ধাপরাধের বিচার হওয়া উচিত এবং সে কারণেই আওয়ামীলীগকে ক্ষমতায় রাখাটা প্রয়োজনীয় বলেও এ ধারার সমর্থকরা বিশ্বাস করেন। এ লেখাটিতে আমি এ দুইটি প্রশ্ন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও জাতি গঠনের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছি। সেই সাথে এ ধরণের ভয়াবহ পরিস্থিতি উদ্ভবের কারণ ও ভবিষ্যত উপলব্ধিরও চেষ্টা করেছি।

বাংলাদেশের রাজনীতি : নির্বাচন ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ভবিষ্যত

আওয়ামী লীগ সরকারের গত নির্বাচনী অঙ্গীকারের অন্যতম একটি বিষয় ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে যে গণহত্যা হয়েছে তাতে পাকিস্তানি সেনাদের সাথে যে বাংলাদেশি দোসররা জড়িত ছিল তারা বিভিন্ন সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান দুইটি দলই যুদ্ধাপরাধীদের দল হিসেবে পরিচিত জামায়াতকে নিজেদের প্রয়োজনে আন্দোলনে অথবা নির্বাচনে নিজেদের পাশে রাখতে চেয়েছে। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ ওবিএনপির দলীয় গঠন, পরিচালনা ও নির্বাচনী বৈতরণী পার হবার কৌশল একই। দুটি দলই আসলে গণতন্ত্রের খোলস পড়া স্বৈরাচারী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, দলীয় প্রধানের নির্দেশই তাদের গঠনতন্ত্র। নির্বাচনে জয়লাভ বা রাজপথে শক্তি প্রদর্শনের জন্য ধিক্কৃত স্বৈরাচারীবা যুদ্ধাপরাধী জামায়াত যে কাউকেই প্রধান দুটি দল কাছে রাখার চেষ্টা করেছে।

এই কাছে রেখে ফায়দা লাভের উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই আওয়ামীলীগ সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচারকে গ্রহনযোগ্য করে তুলতে পারেনি। সাক্ষ্য-প্রমাণ,প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা ও দলীয়করণের নানা অভিযোগ আসে ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে। কাদের মোল্লার রায় ঘোষণার আগে সরকারের সাথে জামায়াতের গোপন আঁতাতের অভিযোগও শোনা যায়। মূলত: এমন আশঙ্কাকে ঠেকাতেই শাহবাগ আন্দোলনের উৎপত্তি। কিন্তু আন্দোলন সরকারের বিরুদ্ধে শুরু হলেও তা আওয়ামী সরকারের পকেটে চলে যায়। এদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তাকে  জামায়াত সুকৌশলে ধর্মবিরোধী আন্দোলন হিসেবে সাধারণ ধর্মভীরু মানুষের কাছে উপস্থাপিত করে।শাহবাগের আন্দোলনকে ধর্মবিরোধী নাস্তিকদের আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।কিন্তু কিভাবে এত সহজেই ধর্মকে পুঁজি করে মানুষকে উত্তেজিত করে তোলা হল? শাহবাগ আন্দোলনের পরে ঐতিহাসিকভাবে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক হেফাজত ও জামায়াতের মধ্যে যে ব্যবধান ছিল তা কমে আসে।বছর জুড়ে পুরো দেশব্যাপী আমরা যে তাণ্ডব দেখছি তার একক কৃতিত্ব দেয়া হচ্ছে জামায়াত শিবিরকে। যে দলটির দেশে সমর্থন শতকরা তিনভাগেরও কম, সেদলটি হঠাৎ করে এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠল? নাকি জামায়াত-শিবিরের এই তাণ্ডবের সাথে সাধারণ ধর্মপ্রিয় মানুষেরওকোন যোগ রয়েছে? শুধু জামায়াত-শিবিরের উপর দোষ চাপাতে গিয়ে আমরা কি সমাজের গভীরে প্রথিত কোন সত্যকে এড়িয়ে যাচ্ছি কিনা সেটা নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।আমার মতে, বাংলাদেশের জাতিগঠনের ভিত্তিতে বোধের বিভক্তি রয়েছে, যে পার্থক্য শহরভিত্তিক শিক্ষিত শ্রেণী ও গ্রামভিত্তিক নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মধ্যে বেশ প্রকট। দুর্নীতি ও সুবিধাভোগের সংস্কৃতিও এই মেরুকরণকে তীব্র করে তুলেছে।এ বিষয়টির আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

ধরা যাক, সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহনযোগ্য নির্বাচন হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করেছে।এ জোট ক্ষমতা গ্রহণ করার পর কি ঘটতে পারে? প্রথমে ইতিবাচক চিন্তা করে দেখি। ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন করা হলো।জামায়াত ছাড়াও আওয়ামী লীগ, বিএনপির মধ্যে থাকা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলমান থাকলো, সাজাপ্রাপ্ত কেউ কারাগার থেকে মুক্তি পেলো না এবং জামায়াত যুদ্ধাপরাধী দল হিসেবে নিষিদ্ধ থাকলো।এ প্রক্রিয়ায় জামায়াত অন্য নামে নিবন্ধন পেতে পারে এবং অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মত রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারে। নেতিবাচকভাবে চিন্তা করলে, বিচার স্থগিত হতে পারে, সাজাপ্রাপ্তরা মুক্তি পেতেপারে এবং দেশব্যাপী ব্যাপক প্রতিশোধমূলক হামলা, লুটপাট ও হত্যাকাণ্ড হতে পারে।অর্থাৎ, সোজা কথায়, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অনিশ্চিত, ভবিষ্যত অন্ধকার।

বাংলাদেশের দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র না থাকলেও আমরা গণতন্ত্রের একদমই প্রাথমিক যে ভিত্তি- ‘নির্বাচন’-তাকে মেনে নিয়েছি। পাঁচ বছর পরপর এর জোরেই দেশের সাধারণ জনগণ নিজেকে কিছুটা প্রয়োজনীয় ভাবেন। এটি আসলেই কতটুকু গণতন্ত্র চর্চা, বা গণতন্ত্রই শ্রেষ্ঠ শাসনপদ্ধতি কিনা, তা নিয়ে হাজারো বিতর্ক রয়েছে।কিন্তু, এখন পর্যন্ত এর বিকল্প আমরা ভাবতে পারি না।তাই যারা ভাবেন বাংলাদেশে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা, বেনেভলেন্ট ডিক্টেটরশিপ, সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা এ মুহূর্তে সম্ভব, তাদের চিন্তার দৈন্যতা নিয়ে করুণা ছাড়া আর কিছু করা সম্ভব নয়।

তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাস্তবায়নের স্বার্থে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রেখে জামায়াত ও হেফাজতের মত উগ্রপন্থীদের উত্থান রোধ করা কতটুকু জরুরি এবং তা সাধারণ মানুষের চাওয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসতে পারে, জামায়াত বিএনপির ঘাড়ে ভর করে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার স্থগিত হয়ে যেতে পারে। এসব আশঙ্কাকে সামনে রেখেই আমি মনে করি সব দলের অংশগ্রহনে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন জরুরি।

কেন বিচার স্থগিত হবার আশঙ্কার মধ্যেও নির্বাচন জরুরি? প্রথমত: নির্বাচনই আমাদের গণতন্ত্রের একমাত্র ভিত্তি। গণতন্ত্রকে আরো বিকশিত করতে দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা, পরিবারতন্ত্রের অবসান, সর্বোচ্চ দুই মেয়াদী প্রধানমন্ত্রীত্ব, সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতামত প্রকাশ করা বা ফ্লোর ক্রসিং এর বিধান রাখা ইত্যাদি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর উপর চাপ প্রয়োগ করা উচিত। কিন্তু আমরা যদি নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে গ্রহনযোগ্য নির্বাচনই না করতে পারি, তাহলে আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনীতি কেবল পেছনের দিকেই হাঁটবে। দ্বিতীয়ত:, একটি সুষ্ঠু গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই কেবল আমাদের এই সহিংসতার পথ থেকে কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। যদিও আওয়ামী লীগ বারবার বলার চেষ্টা করছে যে, জামায়াতকে রক্ষা করতে বিএনপি নির্বাচনে আসতে চায় না, কিন্তু যেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের ক্ষমতায় আসার সম্ভবনা বেশি, সেখানে এ ধরণের যুক্তি ধোপে টিকে না। তাছাড়া, উচ্চ আদালতের নির্দেশেও দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার সুপারিশ করা হয়েছে, যা মেনে চললে বিএনপির নির্বাচনে না আসার কোন কারণ নেই। তাছাড়া, বিএনপি নির্বাচনে আসলে জামায়াত-শিবিরের সহিংসতাও ব্যপকতা লাভ করতে পারত না। কিন্তু,সরকারি দল, সর্বপরি দলীয় প্রধানের একগুয়েমির কারণেই যা সম্ভব হয়ে উঠেনি। বাংলাদেশের চার ভাগের তিন ভাগ মানুষই চেয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিয়ন্ত্রনেই এনির্বাচন হোক। কিন্তু সংবিধান রক্ষার দোহাই দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের যৌক্তিক চাওয়াকে এড়িয়ে যাচ্ছে সরকার। দেড়শ’র বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’হয়ে পুরো পৃথিবীর গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি ‘অনন্য’ কেস স্টাডিতে পরিণত হতে যাচ্ছে আগামী নির্বাচন। তৃতীয়ত:, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কোন ব্যক্তিগত প্রতিশোধের জায়গা নয়। এটি একটি ইতিহাসের প্রশ্ন। বাংলাদেশের শত বছরের ভবিষ্যত এই বিচারের সাথে জড়িত। তাই যেকোনভাবে বিচারিক প্রক্রিয়াগত ত্রুটি নিয়ে ফাঁসি দিয়ে আমরা আমাদের দায় সেরে ফেলতে পারি না। সাক্ষ্য-প্রমাণে দুর্বলতা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া এসব ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধী ভবিষ্যতে একদিন বাংলাদেশের নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। আমরা এমন ভবিষ্যত দেখতে চাইনা। আদালতের বিচারে ফাঁসিতে ঝুলেও ইতিহাসের বিচারে নায়ক হবার নজির পৃথিবীর নানা দেশে রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার যে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে অগণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা দখল করে রাখার অভিপ্রায় নিয়েছেন, তাতে যুদ্ধাপরাধীদের রায় বাস্তবায়ন হয়তো বেশ কিছু সমর্থককে উদ্দীপ্ত করবে, কিন্তু ইতিহাসের বিচারে তা অনিয়মতান্ত্রিক হয়েই থাকবে। তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে হবে নিয়ম মেনে, সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়লাভ করা সরকারের মাধ্যমে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে,পরবর্তী সরকার এসে যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার স্থগিত করে দেয়, তখন কি হবে? এ প্রশ্নের উত্তর সুবিধাভোগী, দুর্নীতিগ্রস্ত ও শৌখিন আন্দোলনকারীদের ভাবিয়ে তুলতে পারে, সত্যিকারের রাজপথের সৈনিকদের নয়। কারণ সত্যিকারের দেশপ্রেমিকরা এ প্রশ্নের উত্তর জানেন, প্যাকেট খাবার, মিনারেল ওয়াটার ও পুলিশি নিরাপত্তা ছাড়াও তারা আন্দোলনে নামতে পারেন। তাই যেসব বীরপুঙ্গব এখন র‍্যাব-পুলিশ-যৌথবাহিনীর ছাতার তলায়‘দেশপ্রেমে’র পাণ্ডা হিসেবে কাজ করছেন, তারা দয়া করে দেশপ্রেমের চূড়ান্ত পরীক্ষার জন্য অপেক্ষা করেন।

বিভক্ত জাতি ও মৌলবাদ

ধর্মীয় উগ্রপন্থি দল হেফাজতে ইসলামের কর্মীরা যেদিন রাজধানীতে নারী সাংবাদিকের উপর হামলা চালায় তখন আমি শিউরে উঠেছিলাম। তাদের ১৩ দফার বাস্তবায়ন বাংলাদেশকে টেনে পেছনে নিয়ে যাবার জন্য যথেষ্ট। এছাড়া গত কয়েকমাস ধরে বিরোধী জোটের ডাকা হরতাল-অবরোধে মানুষ পুড়িয়ে, সম্পদ নষ্ট করে ও গাছ ধ্বংস করার সংবাদ দেখে ও পড়ে আমার বিবমিষা হয়েছিল। এসব সংবাদ আমি টেলিভিশনে দেখেছি, খবরের কাগজে পড়েছি। কিন্তু সরকারি পেটোয়া ‘বীর’ ও যৌথবাহিনীর হাতে অসংখ্য মানুষের নির্যাতিত ও গুম হবার কথা নানা দিক থেকে শুনলেও প্রধান সারির দৈনিক ও টিভি চ্যানেলগুলোতে দেখতে পাইনি। বরং বিরোধী জোটের প্রায় সব প্রধান সারির নেতাদের গ্রেফতারও খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দি করে রাখা বেশ ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা বলেই মনে হচ্ছিল। শেষপর্যন্ত তীব্র দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ বীরদের হাতে আদালত প্রাঙ্গনে একজন নারী আইনজীবিকে নির্যাতিত হবার দৃশ্য দেখার ‘সৌভাগ্য’ হল।

দেশে যখন তীব্র মেরুকরণ হয়, তখন সবকিছুই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে নেয়া, ‘হয় তুমি আমার সাথে নয়তো শত্রুর সাথে’ নীতির মত বাংলাদেশে আজ সব কিছুকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফেলাহচ্ছে। ধর্মভিত্তিক মৌলবাদী দলগুলো যুক্তি মানতে চায় না, নিজস্ব চিন্তার বাইরে আর কোন ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারে না এবং অন্য কারো মতবাদের সাথে সামান্য ফারাক থাকলে শারীরিকভাবে আঘাত করতে চায়। ঠিক তেমনি উগ্র জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসীরাও মৌলবাদী, কারণ এর সব কটি গুণই তারা ধারণ করে মনে প্রাণে। তাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে যে বিভেদ, তা দুই মৌলবাদের ভেতরে বিরোধ। দুই পক্ষই অসহনশীলতার তীব্র চর্চা করে চলছে। তাই কোন ধরণের সমালোচনা শুনলেই ‘রাজাকার’ বা ‘নাস্তিক’ তকমা গায়ে সেঁটে দিতে কারো বিন্দুমাত্র দ্বিধা হয়না। সম্প্রতি, নাগরিক সমাজের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধির নির্বাচন পেছানোর প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রীর বিষোদ্গারের মাধ্যমেএ বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে।

অনেককেই বলতে শুনি, দেশে এখন দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ চলছে। যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন কোন নীতির তোয়াক্কা নেই (যদিও কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়,যুদ্ধেরও নীতি-নিয়ম রয়েছে), শত্রু নিধনই মূল কথা, তেমনি জামায়াত-শিবিরকে যেভাবে হোক নির্মূল করতে হবে। কেন জানি, আমরা যারা স্বাধীনতার পরে জন্ম গ্রহণ করেছি.তাদের মনে যুদ্ধ সম্পর্কে একটা ‘রোমান্টিকতা’ তৈরি হয়েছে। আমরা ভুলে যাই, যুদ্ধএকটা ভয়াবহ জিনিস, যুদ্ধ মানুষের পশু প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে দেয়। আমরা একাত্তরে যুদ্ধ করেছি, মূলত: প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে এবং তারপরে দেশরক্ষার তাগিদে। যুদ্ধ কোন শৌখিনতার বিষয় নয়। আমাদের মনে রাখা উচিত, এ সময়ের যুদ্ধটা লাঠি আর অস্ত্র হাতে নয়। এটা দেশগঠনের যুদ্ধ। তাই ‘নির্মূল’ নয়, সঠিক জাতিগত চেতনায় অর্ন্তভুক্ত করার জন্য শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটানোর দিকেই মনোযোগ থাকা উচিত।

জাতি একটি ‘ইমাজিন্ড কমিউনিটি’। জাতীয়তাবোধের অধুনাতত্ত্ব অনুযায়ি, জাতি আসলে স্বত:স্ফূর্ত ভাবে নয়, বরং ‘তৈরি’ করা হয়। একটি জাতির শিক্ষিত অংশই সাধারণত তৈরি করে সেই জাতির জাতিগত বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সাথে সাথে যে ধরণের সেক্যুলারিজম বাংলাদেশে জাতি গঠনের পরিচয় হিসেবে আনা হয়েছিল, এদেশের গণমানুষের চেতনা তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। পরবর্তীতে বিভিন্ন সরকার এ পরিচয়ের সাথে ধর্মকে নিজেদের প্রয়োজনে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু এ অর্ন্তভুক্তির পথটা আন্তরিক ও মসৃন ছিল না, বরং ভোট পাবার একটি কৌশল ছিল। তাই বাংলাদেশের জাতীয়তাবোধে ধর্ম ও সেক্যুলার পরিচয়ের একটি দ্বন্দ্ব থেকে যায়, এই দ্বন্দ্বের মজুদ বারুদে ধর্মভিত্তিক দলগুলো সহজেই আগুন ধরাতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ধর্ম ও জাতিগত ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে সঠিক জাতিগত পরিচয় নির্ধারণ করাতো দূরেরকথা, এই দ্বন্দ্বকে জিইয়ে রাখতেই যেন সচেষ্ট থাকে রাজনৈতিক দলগুলো। তাই ‘আধুনিক’শিক্ষায় শিক্ষিত আর ‘মাদ্রাসা’র শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেন যোজন যোজন ফারাক, যা থেকে জন্ম নেয় ঘৃণার বাষ্প। এই দ্বন্দ্ব শহর ও মফস্বল ভিত্তিকও বটে। তাই সাম্প্রতিক রাজনীতিতে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভাজনটিও সুস্পষ্ট। নিকট ভবিষ্যতে এ দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠার কোন সম্ভবনা দেখা যাচ্ছে না, বরং তা আরো তীব্র হয়ে উঠতে পারে। ৫ই জানুয়ারির এক তরফা নির্বাচন এবং তার পরবর্তী সংঘাতে আরো রক্তক্ষয় হবে। গণতন্ত্র ওসংবিধান রক্ষার এই পাল্টাপাল্টি লড়াইয়ে গণতন্ত্র বা সংবিধান কোনটাই রক্ষা হবেনা।

এ পরিস্থিতিতে সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন সংঘাতের এ তীব্রতাকে কিছুটা স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া দেশ কোন পর্যায়ে যেতে পারে তার একটি প্রতিকী চিত্র আমরা দেখতে পেয়েছি ২৯ ডিসেম্বর,২০১৩ এ। বিরোধী দলের ডাকা ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ প্রতিরোধ করতে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়’ উদ্বুদ্ধ এক সৈনিক মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সামনে তার যৌনাঙ্গ প্রদর্শন করছেন। যৌনাঙ্গ মানব শরীরের একটি প্রয়োজনীয় অঙ্গ, কিন্তু সামাজিকভাবে আমরা তার প্রকাশ্য প্রদর্শনকে নিকৃষ্ট রুচির পরিচয় বলেই মনে করি। এই যুবক হয়তো বিরোধী জোটের প্রতি তার গভীর ঘৃণার অংশ হিসেবে এ কর্মটি করেছেন, কিন্তু এর মাধ্যমে আমাদের রাজনীতি, দেশপ্রেম আর মূল্যবোধ কোন তলানীতে ঠেকেছে তার একটি চমৎকার উদাহরণ তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। আর কত রক্ত ঝরলে আমরাআমাদের এই নগ্নতা ঢাকতে পারবো, তাই এখন বড় প্রশ্ন!!

About Saimum Parvez

Senior Lecturer, Department of Political Science and Sociology, North South University. (Currently a PhD Candidate, University of Sydney)

View all posts by Saimum Parvez →

4 Comments on “জাতীয়তাবাদ ও রাজনীতি : সাম্প্রতিক বাংলাদেশ প্রসঙ্গ”

  1. সমস্যা হচ্ছে ‘জাতীয়তাবাদ’ আর ‘মৌলবাদ’ এই দু’টো বিষয় আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি। মূল শাহাবাগ আন্দোলন ও এর চেতনা ছিলো(এখনো আছে) দেশের বিভাগীয় শহরের অন্তর্ভুক্ত শহুরে সমাজের ভেতর সীমাবদ্ধ। আর বর্তমান গনজারন মঞ্চের আচরন কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিরক্তিকর। যেমন পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি উত্থাপন। সেটা কী ধরনের সমাধান বা এর ভবিষ্যতই বা কী হতে পারে তা আমার মাথায় আসে না। সরকারি আগ্রাসনের পাশাপাশি তাদের এই অতি জাতীয়তাবাদী কর্মকান্ডও আন্দোলনটির গ্রহনযোগ্যতা হারানোর পেছনে দায়ী বলে মনে করি।

    স্যার, বরাবরই জামাতকে আপনি শক্তিশালী ভাবতে নারাজ কারন সংসদে তাদের আসন কমবেশি মাত্র দুই শতাংশ। দ্বিমত পোষন করতে গিয়ে ‘শক্তিশালী’ শব্দটির বদলে আমি ‘ভয়ঙ্কর’ শব্দটি ব্যাবহার করতে আগ্রহী কারন সেটিই সম্ভবত যুক্তিযুক্ত। জঙ্গী গ্রুপ গুলোকে কেউ সমর্থন করে না। কিন্তু ক্ষেত্র বিশেষে তারা প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। বিএনপির লংমার্চে মাঠে দেখা গেছে শুধুমাত্র তাদের সমর্থক সাংবাদিক ও আইনজীবিদের। তাদের নেতা-কর্মীরা কোথায়? নয়াপল্টন ধুধু করছে। তাদের পক্ষ হয়ে মাঠে নেমেছে শুধু জামায়াত। মালিবাগে তাদের একজন নিহতও হয়েছে। লংমার্চের কথা বাদ দিয়ে আবরোধের কথায় আসি। সারা দেশে শুধুমাত্র জামায়াত প্রভাবিত পকেট এলাকা গুলোতেই আন্দোলনের অস্তিত্ব টের পাওয়া গেছে। এত মানুষের সমর্থনে থাকা দলটির নেতারা আত্মগোপনে। ভিডিও বার্তা পাঠিয়ে দিয়ে ঘরে বসে থাকলেই দায়িত্ব পালন সম্পুর্ন হয় কি? ১/১১ সময়কালে আওয়ামি লীগের প্রথম সারির নেতাদের পথে নেমে পুলিশের লাঠি চার্জের শিকার হবার দৃশ্য আমাদের সামনে থেকে এত তাড়াতাড়ি হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়। ১/১১ কিংবা ছিয়ানব্বইতে অনৈতিকভাবে ক্ষতায় থাকার কারনে আওয়ামি লীগ বিএনপিকে টেনে হিচড়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছিলো। ইতিহাসের পুরাবৃত্তি যখন হচ্ছে সেই তুলনায় বিএনপি কি ইতিমধ্যে ব্যার্থতার পরিচয় দেয়নি? বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে তাই বিএনপিও কি তাদের দায় এড়াতে পারে?

  2. সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত এবং আচরনে চরম দুর্ভোগে আছি , কষ্টে আছি দেশ পিছিয়ে পড়ছে কিন্তু তারপরও ঠিক অবাক হতে পারছি না কারন তাদের কাছে ‘গনতন্ত্র’, ‘সংবিধান’ আর ‘ক্ষমতা’ সমার্থক শব্দমাত্র।
    • “নির্বাচনই আমাদের গণতন্ত্রের একমাত্র ভিত্তি”-একদম ঠিক কথা কিন্তু এই ভিত্তিই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে গনতন্ত্রের কিছু উপাদানের অভাবে। গনতান্ত্রিক মানসিকতা ও সহনশিলতা গনতন্ত্রের অন্যতম উপাদান যা দলগুলোর বিশেষত দলিয় প্রধানদের মধ্য অনুপস্থিত, যার ফলে দলিয় ফোরামের গনতন্ত্রকে গুগলের সহয়তায়ও খুজে না পাওয়া গেলেও দলিয় প্রধানদের একগুয়েমি যেকোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে খালি চোখেই দৃশ্যমান। আর এ কারনয়েই কিছু বিষয়ে তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক ঐক্যমত্যও রয়েছে(‘না ভোটের বিরোধিতা না করা’, ‘ফ্লোর ক্রসিং এরবিধান বাতিলের ব্যাপারে নিরবতা’ , ‘সাংসদের সংসদে নুন্যতম উপস্থিতির বিধানের ব্যাপারে অনাগ্রহ’) এবং মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায় পরবর্তিতেও রাষ্ট্রস্বার্থপরিপন্থি এসকল বিষয়ে তাদের ঐক্যমত্য অব্যাহত রাখবে।
    • “যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে হবেনিয়ম মেনে, সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়লাভ করা সরকারের মাধ্যমে” – বর্তমান বিরোধিদল সরকার গঠন করলে এ বিচার অব্যাহত থাকবে কিনা সে ব্যাপারে সঙ্কা থেকেই যায় কারন বিরোধি দলিয় নেতাতো ইতিমধ্যেই বিচারাধিনদেরকে রাজবন্দি বলে ঘোষোণা করেছেন, আর বর্তমান সরকার বিচারের মাধ্যমে ইতিহাসের কলঙ্কমোচনের কাজ শুরু করছে ঠিকই কিন্তু এর সাথে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল ও একে প্রধান বিরোধিদল ব্যাতিত নির্বাচনের হাতিয়ার বানানোর প্রচেষ্টাও সুস্পষ্ট, যা তাদের হীনমন্যতা ও ক্ষমতালিপ্সারই বহিপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। তাই বিচার পরিচালনা যদি দলিয় সরকারের(নির্বাচিত কিংবা অনির্বাচিত যাই হোক না কেন) মাধ্যমে হয় তাবে তা বিতর্কের উর্ধে রাখা সম্ভব নয়। আমাদের স্বাধিন বিচার বিভাগ যদি সত্যিই সম্পুর্ণ স্বাধিনভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে এ বিচার পরিচালনা এবং সাস্তি কার্জকর করতে পারে শুধুমাত্র তাহলেই জাতীয় কলঙ্ক মোচন সুষ্ঠুভাবে সম্ভব হবে।

  3. সংবিধানের কথা চিন্তা করে যদি নির্বাচন হয় তবে এ সংবিধান জনগনের চাহিদাকে উপেক্ষা করে সরকারী দলের তাবেদারি যন্ত্র হিসেবেই পরিগণিত হবে এবং তা ভবিষ্যৎ সহিংসতা আরও বৃদ্ধি করবে। নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকার কতদিন টিকবে বা এর বিনিময়ে বাংলাদেশকে কি পরিমান জরিমানা দিতে হবে তা এখন দেখার বিষয়।
    এই নির্বাচন সফল করতে সরকারী তৎপরতা ও তার ধরন এবং বিরোধী দলের এর বিপক্ষে গৃহীত কর্মকান্ড আন্তর্জাতিক মহলে কিভাবে পরিবেশিত হচ্ছে তার উপর নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক।
    এক দিকে সরকারের স্বৈরাচারী কর্মকান্ডের পাশাপাশি তাদের উগ্র সমর্থকদের বীরত্ব অন্য দিকে বিরোধী দলের হরতাল, অবরোধের নামে জ্বালাও পোড়াও সাধারণ জনগনের সহিষ্ণুতা কতদিন ধরে রাখতে পারবে সেটাও অনিশ্চিত। এরকম চলতে থাকলে সামরিক শাসনকে উষ্ণ অভ্যার্থনা জানানো, সাধারণ জনগনের কাছে মোটেও অযৌক্তিক মনে হবে না।

  4. স্যারের সাথে বেশ কিছু বিষয়ে একমত। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধ বা যুদ্ধ বিষয়টিকে এক ধরনের রোমান্টিসাইজ করা হচ্ছে। ১৯৭১ এবং ২০১৩ বা ২০১৪ কে এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার যে প্রেসক্রিপসন দেয়া হচ্ছে, আমার মতে তা কোন ভাবেই যুক্তিযোগ্য নয়। ১৯৭১ এর অনেক ঘটনা যে বিতর্কের উর্দ্ধে নয়, তা অনেকে ভুলে যাচ্ছেন। ১৯৭১ নিয়ে আমাদের অনেক ফ্যান্টাসাইজ আছে, যেমন আছে অনেক ‘চুজেন ট্রমার’ বিষয়। তাই ২০১৪ সালের দ্বিদলীয় মারামারি বা সোজা কথায় ক্ষমতার মসনদ দখলের কামড়াকামড়িকে কোনভাবেই নতুন মুক্তিযুদ্ধ বলে চালিয়ে দেওয়া উচিত নয়। দ্বিতীয়ত, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি শুধু মাত্র একটি বিচারিক বিষয় নয়। এর সাথে বাংলাদেশের জাতীয় ভিত্তি, ইতিহাস এবং সবচেয়ে গুরুত্তপূর্ণভাবে দেশের ভবিষ্যত জড়িত। তাই এটিকে নিতে হবে ইতিহাসের এক জঘন্য অধ্যায়ের সঠিক মূল্যায়ন বা এই বিতর্কের সঠিক পরিসমাপ্তি হিসেবে। এই বিতর্ক যদি নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়, তা হলে ইতিহাসের দায় থেকে জাতি মুক্তি পাবে না। আওয়ামীলীগ যে ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থ থেকে এটিকে দেখছে, তা কখনো সমর্থন যোগ্য নয়। এই বিচার বাংদেশে প্রচলিত ‘নায়ক-খলনায়ক’ এর যে বিতর্ক তার সাথেও জড়িত। তাই সব পক্ষকে সাবধান হতে হবে। যুদ্ধ অপরাধীদের কোন ভাবেই ‘নায়কের’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেওয়া যাবে না। তাই এই গোটা বিচার প্রক্রিয়া আরো অনেক গোছালো, স্বচ্ছ এবং প্রকাশ্য হওয়া উচিত।

Leave a Reply