প্রটোকল, গণতন্ত্র ও আজকের বিশ্ব

Spread the love

http://www.green-evolution.eu/default.asp?pid=59&la=1

প্রটোকল গ্রিক শব্দ। আক্ষরিক অর্থ অনেকটা গ্লু বা আঠা। কিংবা বন্ধনও বলা যেতে পারে। রাষ্ট্রীয়, সরকারি বা সামাজিক বন্ধন। প্রটোকল শব্দের বহুমুখী ব্যবহার হয়ে থাকে। কাউকে স্বাগত জানাতে হলে যে সৌজন্যবিধি মানা হয়, সেটা প্রটোকল। মাননীয় অতিথিদের সঙ্গে আলোচনায় কিংবা খাবার টেবিলে বসার ব্যবস্থাও প্রটোকলের অংশ। রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের সূচনা ষোড়শ শতাব্দীতে। ইংল্যান্ডের রাজা হেনরি দি এইটথ বা অষ্টম হেনরির সঙ্গে ফ্রান্সের প্রথম রাজা ফ্রান্সিস দ্য ফার্স্টের দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ঘটনা থেকে এর সূত্রপাত ধরা হয়। তারা একে অপরের কাছ থেকে ভালো বিষয়গুলো জানতে ও বুঝতে এবং তা নিজের জন্য প্রয়োগ করার উপায় খুঁজতে পরস্পরের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেন। সে সময়টা ছিল শিল্প বিপ্লবের যুগ। পরে দুই দেশের রাজারা আরও নানা দেশ সফর করেন। একে অপরের দেশেও যান। কিন্তু কূটনীতির ইতিহাসে ওই সফর মাইলফলক হয়ে আছে।
এ যুগে প্রতিটি দেশেরই প্রটোকল ম্যানুয়াল রয়েছে। বিদেশি কূটনীতিকরা কী সুবিধা পাবেন, রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা সরকার প্রধানের সফরের ক্ষেত্রে কী করণীয়, আমাদের সমপর্যায়ের যারা অন্য দেশ সফরে যাবেন তখন সেখানে যাওয়া এবং অবস্থানকালে আমাদের কূটনীতিকদের ইতিকর্তব্য কী_ সবকিছু লিপিবদ্ধ থাকে। পলিসি প্রটোকলও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিমানবন্দরে কিংবা অন্য কোনো রুটে অতিথিরা এলে কী আচরণ হবে, আলোচনার সময় কোন পক্ষের কী করণীয় সবই এখন সূত্রবদ্ধ। প্রটোকল যদি ভাঙা হয় সেটাও কখন, কী প্রেক্ষাপটে ঘটবে, সে সম্পর্কে আগেভাগে ধারণা থাকে।
অষ্টম হেনরির সময়টা ছিল রাজা-সম্রাটদের। এখন গণতন্ত্রের যুগ। বিশ্বায়ন একে অপরকে আরও কাছে নিয়ে এসেছে। যাতায়াত সহজ হয়েছে এবং একে অপরের দেশে যাওয়া-আসা চলছে ঘন ঘন। সময়ের বিবর্তনে প্রটোকলে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। সরকারের পাশাপাশি নানা পর্যায়ে চলছে সফর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর চার দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়েছে। আমরা জাতিসংঘের সদস্য। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনেও রয়েছে প্রতিনিধিত্ব। আমাদের রাষ্ট্র ও সরকারে যারা থাকেন তারা নিয়মিত দেশের বাইরে যান। অন্যরাও আসেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ঘন ঘন দেশের বাইরে যাবেন কিংবা অন্যদের দেশে স্বাগত জানাবেন, এটাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রীও নিয়মিত সফরের জন্য বাইরে যান। অন্য মন্ত্রীদেরও সফর করতে হয়। আবার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতাদের সফরের ঘটনাও ঘটে। তিনি অন্য কোনো দেশে গেলে সেখানে বাংলাদেশের যে কূটনৈতিক দফতর রয়েছে তার সদস্যদের করণীয় বিষয়ে সেগুনবাগিচার পররাষ্ট্র দফতরের রয়েছে গাইডলাইন। এ সৌজন্যবিধির কি ব্যত্যয় ঘটে?
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত সরকার। তিনি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে। তার সম্মানে ভোজসভার আয়োজন করা হয়েছে। তিনি যখন দিলি্ল বিমানবন্দরে অবতরণ করেন, তখন ভারত সরকার তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। কিন্তু সেখানে গরহাজির ছিলেন দিলি্লস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনার। তার যদি পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি থাকে তাহলে হাইকমিশনের দ্বিতীয় প্রধান সেখানে যাবেন, সেটাই রেওয়াজ। কিন্তু বাস্তবে সেটা ঘটেনি এবং কেন ঘটেনি তার ব্যাখ্যাও নেই। তার সফর চলাকালেও বাংলাদেশ হাইকমিশনের কেউ কোথাও উপস্থিত নেই। তারা কি কেবল সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন, নাকি গোটা দেশের_ সে প্রশ্ন স্বাভাবিক। সে দেশের রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের বিরোধী নেতার সাক্ষাতের সময় সে দেশের সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার উপস্থিত থাকার প্রশ্ন আসে না। কিন্তু আনুষ্ঠানিক সরকারি ভোজে লোকসভায় বিজেপির নেতা সুষমা স্বরাজ আমন্ত্রিত ও উপস্থিত ছিলেন। ওই দলের প্রবীণ নেতা এল কে আদভানিকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। বাংলাদেশ হাইকমিশনের কেউ আমন্ত্রিত হননি, সেটা ভাবা যায় না।
ধরে নেওয়া যায় যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বিরোধী দলে ছিলেন তখন বিভিন্ন দেশ সফরকালে বিএনপি সরকারের তরফে এমন আচরণই পেয়েছেন। টিট ফর ট্যাট!
উন্নত দেশের কথা থাকুক। বাংলাদেশে যদি ভারতের এল কে আদভানি কিংবা সুষমা স্বরাজ ব্যক্তিগত কিংবা সরকারি সফরে আসেন তাহলে হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ তাকে স্বাগত জানাবেন না, সেটা কি ভাবা যায়? যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলের কোনো সিনেটর ঢাকা এলে ড্যান মজীনাও কি নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারবেন? প্রকৃতপক্ষে, আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা গণতন্ত্রের চর্চার কথা বলেন; কিন্তু বাস্তবে সামান্য প্রটোকল সৌজন্যবিধিও মেনে চলতে রাজি নন। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের কূটনীতিকরা কি কেবলই সরকারের জন্য কাজ করবেন? এর পাল্টা আরেকটি প্রশ্ন, তারা সরকারের জন্য কতটা করবেন? মন্ত্রীর সংখ্যা এখন অনেক। কখন, কে বাইরে থাকেন, তার হিসাব রাখা কঠিন। সফর সরকারি না বেসরকারি, সেটাও জানার উপায় থাকে না। কিন্তু এ সফরের কারণে কিছু দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বিড়ম্বনার শেষ থাকে না। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও ব্যাংককের মতো ট্রানজিট বিমানবন্দরে হাজিরা দিতে দিতে আমাদের দূতাবাস কর্মীদের প্রাণান্ত অবস্থা। প্রায় সব মন্ত্রীই পূর্ণ ‘মর্যাদা’ চেয়ে বসেন। যে দেশের বিমানবন্দর স্বল্প সময়ের জন্য ব্যবহার করছেন তাদের কাছেও বাড়তি কিছু চান এবং তার ব্যবস্থাও করতে হয় বাংলাদেশ দূতাবাসকে। এমনকি সরকারি দলের প্রভাবশালী এমপিরাও এ ধরনের সুবিধা চেয়ে বসেন। এ রেওয়াজ একদিনে গড়ে ওঠেনি। হয়তো অতীতে কোনো কারণে একজন মন্ত্রী কিংবা প্রভাবশালী এমপি এ সুবিধা পেয়েছিলেন। এখন সবাই চাইছেন সমপর্যায়ের সৌজন্য। না পেলে মনে করবেন তার সম্মানহানি করা হয়েছে। যে দূতাবাসের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ উঠবে, সেখানে কর্মরতদের ‘বিরোধী দলের সমর্থক’ বলার ঘটনাও রয়েছে। এ ধরনের বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় স্বাভাবিক কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু মন্ত্রীরা বুঝলে তো! আমাদের মন্ত্রী সংখ্যা অনেক। মন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির সংখ্যাও কম নয়। তারা সবাই এ সুবিধা আশা করেন।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে যাওয়া এবং ফেরার সময়ে বিমানবন্দরে মন্ত্রিসভার সদস্য ও তিন বাহিনী প্রধানসহ অনেককে হাজির থাকতে হয়। এটা সৌজন্যবোধ। কিন্তু ঘন ঘন সফর হতে থাকলে এ নিয়ে সমস্যাও হয়। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকেও এ কারণে বিমানবন্দরে বেশ আগেভাগে যেতে হয়। তারা কেন নিজ নিজ দফতরে এ আনুষ্ঠানিকতা সেরে ফেলেন না? এতে অনেকের সময় বেঁচে যায়। প্রধানমন্ত্রী যেন তার অফিস থেকে সরাসরি বিমানে উঠে যেতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা কি আদৌ কঠিন? এক সময়ে বিমানবন্দরে মাত্র তিন-চারজন মন্ত্রীর হাজির থাকার নির্দিশ জারি হয়েছিল। কিন্তু এখন তা মানা হয় বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী দেশের ভেতরে যেসব আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন সেখানে মন্ত্রী ও সচিবসহ পদস্থ ব্যক্তিদের হাজির থাকার নিয়মও শিথিল করা যেতে পারে।
প্রটোকল বিড়ম্বনা একুশের প্রথম প্রহরেও ঘটে। মাতৃভাষার জন্য আত্মদানকারী সালাম-বরকতদের স্মরণে ‘একুশের প্রথম প্রহরে’ শ্রদ্ধা জানানো হয়। এক সময়ে সবাই সেখানে যেত খুব ভোরে এবং সে কারণেই নাম হয়েছে প্রভাতফেরি। কিন্তু এখন রেওয়াজ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী রাত ১২টার পরপরই প্রথম ফুল দেবেন। বিরোধীদলীয় নেতা এবং কূটনীতিকরাও একে একে ফুল দেন। টেলিভিশনে সরাসরি এ অনুষ্ঠান দেখানো হয়। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হওয়ায় গোটা বিশ্বের নজর থাকে এ দিনের অনুষ্ঠানের প্রতি। কিন্তু আমরা কি যথাযথ ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা করতে পারছি? গত কয়েক বছর ধরে দেখা যায়, প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ফুল দিয়ে চলে যাওয়ার পরপরই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অথচ এ সময়ে সেখানে অপেক্ষা করে থাকেন বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক মিশনের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা। কখনও কখনও মনে হয়, তাদের নিরাপত্তাও যেন হুমকির মুখে। এমন একটি স্মরণীয় অনুষ্ঠান প্রশ্নবিদ্ধ হবে, সেটা কাম্য হতে পারে না। এ নিয়ে আমাদের গভীরভাবে চিন্তাভাবনার সময় এসেছে। রাতেই বিদেশি কূটনীতিকদের শহীদ মিনারে আসতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতার প্রয়োজন আছে কি? এক সঙ্গে তাদের আনারও যুক্তি দেখি না। এর পরিবর্তে দিনের বেলা কয়েক ভাগে তাদের নিয়ে আসা যায়। শহীদ মিনারের সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা করতে না পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। গোটা বিশ্বের নজর থাকে এ অনুষ্ঠানের প্রতি। বিশ্বায়নের যুগে আমরা এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারি। আমরা কেন এ সুযোগ নিয়ে হেলাফেলা করছি?

প্রথম প্রকাশঃ দৈনিক সমকাল, উপসম্পাদকীয়, ডিসেম্বর ১, ২০১২।

Image Source: http://www.green-evolution.eu/default.asp?pid=59&la=1

Leave a Reply