“বড় হয়ে কী হতে চাও? ডাক্তার?” — স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর স্বপ্ন প্রসঙ্গ

Spread the love

সম্প্রতি একটি সফল ছাত্র আন্দোলন হল। শিক্ষায় ভ্যাট অপসারনের দাবিতে। সরকার এতে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। শিক্ষার মত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন: স্বাস্থ্য। আমাদের জনস্বাস্থ্য খাতকে সামনে আনলে একে একে অনেকগুলো সমস্যার কথা তুলে ধরা যাবে। সেগুলো এগিয়ে যাবার প্রসঙ্গ, প্রগতির প্রসঙ্গ। কিন্তু মেডিকেল কলেজে ভর্তির প্রসঙ্গটি তেমন নয়। এটা অধঃগতির হাত থেকে বাঁচার প্রসঙ্গ। স্বাস্থ্য খাত, শিক্ষাখাত আর সামগ্রিক ভাবে সামাজিক প্রণোদনা কাঠামো, আর প্রজন্মের স্বপ্ন রক্ষার প্রসঙ্গ এর সাথে জড়িত।

এক.

“জীবনের লক্ষ্য কী?” – এমন প্রশ্নের উত্তরে অনেক কিশোরই হয়ত চিকিৎসক হবার কথা বলে। একদিকে রয়েছে সামাজিক মর্যাদা, অন্যদিকে মানুষের সেবা করার সুযোগ। শ্রম, মেধা আর মহত্ত্বের মিশেলে এভাবে শিশু-কিশোরদের স্বপ্ন তৈরি হয়েছে আমাদের সমাজে। মেডিসিনের জনক হিপোক্রেটিস ভুল বলেন নি “Wherever the art of Medicine is loved, there is also a love of Humanity.”। অনেক পড়াশোনা করতে হবে, মানুষের সেবা হেলার কর্ম নয় – এটা জেনেই নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকে মানুষের সেবার স্বপ্ন দেখা শিক্ষার্থীরা। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস রীতিতে পরিনত হলে ভাল ফল করা অথবা বড় ডাক্তার হবার সাথে পরিশ্রম আর মেধার সংযোগ থাকবে না। মহত্ত্বের প্রশ্নটি আর নাই বা উঠালাম। যেভাবে ভাল ফল করতে হবে সেই উপায় খুব সম্মানজনক না হলেও সেই রাস্তা আগে থেকেই চেনার দরকার হবে তার, নেহায়েত নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে। “জীবনের লক্ষ্য কী?” -এই প্রশ্নের উত্তরে কোন রকম আত্মগ্লানি ছাড়াই হয়ত তাকে বলতে হবে, “সময় মত ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন জোগাড় করা”। আর ছোটবেলা থাকে তার সামনে থাকবে অনিশ্চয়তা, পথবিভ্রাটের ভয়, আর মেধা অপচয়ের সংকট। এমন চললে চিকিৎসা পেশাটিকে মহান পেশা বিবেচনা করা কঠিন হয়ে পড়বে।

দুই.

মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সংশয় দেখা দেবার পর সরকার দ্রুত কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছেন বলে জানা গেছে। এতে সংশয় দূর না হয়ে বরং বেড়েছে। ফলে মানুষের মনে আস্থা ফিরে এসেছে বলা যায় না। এই আশংকা সত্যি হলে এই ত্রুটিপূর্ণ ভর্তিপরীক্ষার ফলে যারা ভবিষ্যতে চিকিৎসক হবেন তারা যে উপযুক্ত সেবা দিতে সক্ষম হবেন না সেই ভয় থেকেই যাবে। হৃৎপিণ্ড খুলে যে শৈল্যচিকিৎসক তাতে কাটাছেড়া করবেন, তিনি ফাঁস হওয়া পরশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে চিকিৎসক হয়েছেন এটা জেনেই মানুষের চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে। এই সম্ভাবনাটি খুব আশাব্যঞ্জক নয়। তবু সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় এবং কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টিকে আমলে নিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে না। জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সমস্যা দলমত নির্বিশেষে সবার সমস্যা। পেশাগত দক্ষতার সংকট যে কেবল সাস্থ্যখাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে সেটাও জোর দিয়ে বলা যায় না। একে একে অন্য খাতগুলোতেও এই সমস্যা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তিন.

পাবলিক মেডিকেল কলেজগুলোতে মেধাবি ছাত্র-ছাত্রীদের সুযোগ থাকতো বরাবর। মেধাকে সুযোগ দেবার ক্ষেত্রে, জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তৈরির ক্ষেত্রে এই সুযোগের গুরুত্ব অসামান্য। ভর্তি পরীক্ষা ব্যবস্থার বিপর্যয় সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মেধাবি ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতকে কঠিন করে দেবে। ফলে আরো বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ছুটতে হবে। যাদের সামর্থ নেই তারা হয়ত সুযোগ বঞ্চিতই থেকে যাবে। অন্য দিকে জনগনের করের অর্থে পরিচালিত মেডিকাল কলেজে যারা ভর্তির সুযোগ পাবে তারা সম্ভবত এই সুবিধার ন্যায্য দাবিদার নয়। এতে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি ছাড়াও জনসম্পদের অপচয় হবে। একদিকে জনসম্পদের অপচয়, অন্যদিকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজ থেকে ভ্যট আদায়ের চেষ্টা — এটা দক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার উদাহরণ নয়। ভুলে গেলে চলবে না, জনগনের অর্থ ব্যায়ের ক্ষেত্রে সরকার যখন দক্ষতার পরিচয় দেন, তখন মানুষের মনে আস্থা তৈরি হয়, আর কর দেবার এবং আইন মেনে চলার আগ্রহও তাতে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এভাবে অর্থের অপচয়ের আশংকা তৈরি হলে সামাজিক অনাস্থার পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করতেও বেগ পেতে হবে।

চার.
এবারে একটু খতিয়ে দেখা যাক এই বিপর্যয়ের সাম্ভাব্য কারণ কি? অনুমান করা যায় খুব অল্প সংখ্যক ব্যক্তি হয়ত ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করে আর্থিকভাবে উপকৃত হয়েছেন। এতে বড় মাপের লেনদেন বা দুর্ণীতি হচ্ছে এমন সম্ভাবনা কম বলেই মনে হয়। বরং জনস্বার্থ ঘনিষ্ট এরকম একটি সমস্যার দ্রুত সমাধান করা গেলে সাধারণ নাগরিক আর ভর্তিবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞ হবে। আর “দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন” নীতির বাস্তবায়ন মানুষকেও উৎসাহ দেবে সরকার আর প্রশাসনের অনুগত হতে, আস্থা তৈরি হতে।

শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, জনসম্পদের অপচয়, অনাস্থা এই বিষয়গুলিকে ছাপিয়েও সবচাইতে বড় আশংকা এখন উঠতি প্রজন্মের স্বপ্নের বিপর্যয়। এটা কোন সরকারই চায় না বলে বিশ্বাস করি। হয়ত আপনি একজন সচেতন নাগরিক, হয়ত কোন একটি দলের সমর্থক অথবা সরকারের অংশ। আপনার সাধ্য সীমিত হতে পারে। কিন্তু একটি প্রজন্মকে তাদের স্বপ্ন ফিরিয়ে দিতে আপনার সামান্য সদিচ্ছা এবং উদ্যোগ তাৎপর্যের দিক থেকে হতে পারে অসামান্য। হয়ত এই মুহূর্তের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৫

থাম্বনেইলের সূত্র: চিকিৎসারত হিপোক্রেটিস লিঙ্ক

Leave a Reply