মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশী হত্যাকান্ড এবং বর্ণবাদ-প্রবণতা

Spread the love

২০১৪ সালের আগস্টে মিশোরী রাজ্যের ফার্গুসনে পুলিশী হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনসাধারণের প্রতিবাদ, তা দমনে পুলিশের অযাচিত বল প্রয়োগ এবং সহিংসতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বপর্যায়ে বিরাজমান আপাতঃ ‘গণতান্ত্রিক’ ভাবমূর্তির মুখোশটি খসে পড়ে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে এই বিতর্কিত ভাবমূর্তির অবশ্য আরেকটি প্রকাশ বিশ্ববাসী দেখেছিলো, ২০১১ সালে অক্যুপাই ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলনের সময়। সেই সময় আন্দোলনকারীদরে দমনের জন্য তাদের চোখে-মুখে পুলিশ কর্তৃক ‘মরিচের গুড়া’ ছিটানোসহ টেনে-হিঁচড়ে নির্যাতন ক’রে তাদেরকে গ্রেফতার করার ঘটনা ‘অন্য রকম’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সামনে নিয়ে এসেছিলো।

ফার্গুসনে সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে পুলিশের গুলিতে ১৮ বছরের মাইকেল ব্রাউনের মৃত্যুকে ঘিরে। বিষয়টি আরও জটিল হয়ে পড়ে যখন সেন্ট লুইস কাউন্টির গ্র্যান্ড জুরি হত্যার দায়ে অভিযুক্ত পুলিশ অফিসার ড্যারেন ব্রাউনের বিরুদ্ধে কোনো মামলা না করার সিদ্ধান্ত জানায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগও (জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট) একই রকম অবস্থান নেয়।

২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল বাল্টিমোরের পুলিশ দ্বারা আটককৃত ২৫ বছরের কৃষ্ণাঙ্গ যুবক ফ্রেডি কার্লোস গ্রে’র মৃত্যু আবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশী নির্যাতনের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসে। এ ঘটনাকে ঘিরেও শুরুতে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ এবং পরে পুলিশের সহিংসতা দেখা দেয় এবং সেই সহিংসতায় ৩৪ জন গ্রেফতার হয়, অন্যদিকে ১৫ জন পুলিশ অফিসারও আহত হয়। একইভাবে ১৩ জুলাই ঘটলো পুলিশী হেফাজতে টেক্সাসের অয়ালার কাউন্টি জেলে কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার আন্দোলন কর্মী সান্ড্রা ব্ল্যান্ডের হত্যাকান্ড। পুলিশ অবশ্য এই হত্যাকান্ডকে শুরুতে “আত্নহত্যা” হিসেবে চিহ্নিত করেছিলো। ট্রাফিক আইন ভঙ্গের অভি্যোগে সান্ড্রাকে ১০ জুলাই এ গ্রেফতার করা হয়েছিলো। এই ঘটনার এক সপ্তাহ পরে সিনসিনাটিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় ৪৩ বছর বয়সের আরেক কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক স্যামুয়েল ডুবোস।

শুধু ফার্গুসন, বাল্টিমোর, টেক্সাস বা সিনসিনাটির ঘটনাই নয়, ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ২৭ মে ২০১৫ তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই ধরনের হত্যাকান্ডের সময়পঞ্জকিায় (টাইমলাইন) দেখা যায় যে, ২০১১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ কর্তৃক গুলিবিদ্ধ কিংবা অন্য কোনো সহিংসতায় মোট আটজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে যাওয়া একজন ভারতীয় নাগরকিও পুলিশের নির্যাতনে পক্ষঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়েছেন। এ ঘটনাটি অ্যালবামা রাজ্যে ঘটেছে। নিহতদের তালিকায় ট্যামির রাইস নামের একজন ১২ বছরের কৃষ্ণাঙ্গ বা আফ্রিকান-আমেরিকান শিশুও রয়েছে। এই হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছিল ওহিও রাজ্যের পুলিশ ২০১৪ সালের নভেম্বরে। এখন এমনও বলা হচ্ছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাতে এ ধরনের ঘটনা নিয়মিতই ঘটে থাকে। বিশেষ করে শহুরে এলাকাগুলোতে এবং বাল্টিমোর, ফার্গুসন, টেক্সাস বা সিনসিনাটির ঐ শহরগুলোকেই আসলে পুলিশী অনাচারের প্রতিনিধিত্ব করছে। পুলিশ কর্তৃক গুলিবিদ্ধ বা নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হওয়ার ক্রমবর্ধমান ঘটনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ ব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রশাসনিক কাঠামোতে যে এক রকমের বর্ণবাদ প্রবণতা নিহিত আছে, সেই ব্যাপারটিকে এখন জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে।

এ ধরনের ঘটনায় মূলত কৃষ্ণাঙ্গদের মৃত্যু অথবা কৃষ্ণাঙ্গরা কেন এ রকম অবস্থার শিকার হচ্ছে, তার কারণ খুঁজতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা দুই ধরনের ব্যাখ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন। একদল বিশেষজ্ঞ, সমালোচক, সমাজবজ্ঞিানীরা দায়ী করছেন অপরাধী চিহ্নিতকরণ এবং অপরাধ দমনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের একটি বিশেষ পদ্ধতিকে যাকে তাত্ত্বিকভাবে ‘ব্রোকেন উইন্ডোজ’ বা ‘ভাঙ্গা জানালা’ নামে অভিহিত করা হয়। আরেকদল এই সমস্যাটিকে মনে করছেন রাষ্ট্রের বৈষম্যপূর্ণ শাসন এবং নীতি কাঠামোর ফসল। তবে ব্যাখ্যার ধরন যাই হোক না কেন, এই দুই দল চিন্তাবিদ একটা বিষয়ে একমত যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় বর্ণবাদী প্রবণতা রয়েছে এবং তারই শিকার মূলত আফ্রিকান-আমেরিকান শিশু, তরুণ কিংবা যুবকেরা। এই লেখাটিতে মূলত বিশেষজ্ঞদের দুই ধরনের ব্যাখ্যার উপরই আলোকপাত করা হবে

১। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অপরাধ দমনে পুলিশের ‘ভাঙ্গা জানালা’ পদ্ধতি এবং তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব


অপরাধী চিহ্নিতকরণ বা অপরাধ দমনে পুলিশের কাছে ‘ভাঙ্গা জানালা’ পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ১৯৯০-এর দশকে। সেই সময় নিউ ইয়র্ক শহরের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন রুডি গিউলিয়ানি এবং বিল ব্রাউন নযিুক্ত হন শহরের ট্রানজিট পুলিশের প্রধান কর্তাব্যক্তি হিসেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘ব্রোকেন উইন্ডোজ’ পদ্ধতিকে ঘিরে অপরাধ দমন ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পিছনে দুই রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এরা হলেন জর্জ কেলিং এবং জেমস কিউ. উইলসন। মাসিক আটলান্টিক নামের একটি পত্রিকায় ১৯৮২ সালে প্রকাশিত ১০ পৃষ্ঠার একটি নিবন্ধে তারা এই ধারণাটির প্রবর্তন করেন। ‘ব্রোকেন উইন্ডোজ’ ধারণাটিকে ঘিরে তারা জনমানুষের শান্তি ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি তত্ত্ব প্রদান করেন। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, যদি কোনো ভবনের কোনো একটা ভাঙ্গা জানালা সাথে সাথে মেরামত করা না হয়, তবে ঐ ভবনের অন্য জানালাগুলো কেউ না কেউ ক্রমান্বয়ে ভেঙ্গে ফেলবে। এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে তারা এই অভিমত দেন যে, সব ধরনের বিশৃঙ্খলা এবং অপরাধ অঙ্গাঅঙ্গিভাবে সম্পর্কিত। দমনহীন একটা অপরাধ বা বিশৃঙ্খলা মেরামতহীন ভাঙ্গা জানালার মত অন্য আরেকটা অপরাধ বা বিশৃঙ্খলার ঘটাতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে (কেলিং ও উইলসন, ১৯৮২:৩১)।

‘ভাঙ্গা জানালা’ তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই ১৯৯০-এর দশকে নিউ ইয়র্ক পুলিশ অপরাধ দমন পদ্ধতি দমনে নতুনমাত্রা যোগ করে। আর তার প্রকাশ ঘটে পুলিশ বিভাগের অপরাধ দমন সংক্রান্ত নতুন নতুন শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে। যেমন: ‘জিরো টলারেন্স’ (zero tolerance) ‘স্টপ এন্ড ফ্রিস্ক’ (stop and frisk) বা ‘থামাও এবং জোর তল্লাস কর’, ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ বা ‘স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণমূলক পুলিশী ব্যবস্থা’ ইত্যাদি (টাইবী,২০১৫) ।

কিন্তু উপরে বর্ণিত পদ্ধতগিুলো প্রয়োগের মধ্য দিয়ে অপরাধী চিহ্নিতকরণ এবং অপরাধ দমনে পুলিশের আচরণগত পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যদিও একটা সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে এ ধরনের একটা আগ্রাসী পদ্ধতি পুলিশকে গ্রহণ করতে হয়েছে। সেই সময় নিউ ইয়র্কে ছোটখাটো অপরাধের ঘটনায়ও (street crimes) বছরে ২০০০ জন খুনের শিকার হচ্ছিল। এই আগ্রাসী পদ্ধতি ব্যবহাররে ফলে কয়েক বছরের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা অনেকটা কমে আসে (পূর্বোক্ত)।

তবে এই ‘স্টপ এন্ড ফ্রিস্ক’ বা ‘থামাও এবং জোর তল্লাস কর’ পদ্ধতিতে উৎসাহিত হয়ে এবং ২০০১ সালের টুইন টাওয়ার আক্রমনের ঘটনায় প্রভাবিত হয়ে নিউ ইয়র্কের পুলিশ বর্তমানে ভীষণ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সেই ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, ২০১১ সালে নিউ ইয়র্কে এক বছরে ৬,৮০,০০০ নাগরিক এই ‘থামাও এবং জোর তল্লাস কর’ পদ্ধতির শিকার হয়। এর ৮৯% ছিল নিউ ইয়র্কের কৃষ্ণাঙ্গ বা আফ্রিকান-আমেরিকানরা । ফিলাডেলফিয়া, সিয়াটল, নিউ অরলিন্স এবং বোস্টন রাজ্যের পুলিশ বিভাগ এই পদ্ধতি অনুসরণ করছে।

২০০৮ সালে লস এ্যাঞ্জেলসের পুলিশ ডিপার্টমেন্টও ৮,৭০,০০০ জনকে ‘থামাও এবং জোর তল্লাস কর’ পদ্ধতির আওতাভুক্ত করে। শিকাগো শহরের ক্ষেত্রে এই হার নিউ ইয়র্কের চারগুণ বেশি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ২০০৫ সালে খোদ বাল্টিমোর-এ এই পদ্ধতির আওতায় ১,০৮,০০০ জনকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করা হয়। তখন এই শহরের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৬ লাখ। ২০১৩ সালে ফেডারেল বিচারক শিরা শন্ডিলীন একটি মামলার রায়ে এই পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ করেন। শিরা শন্ডিলীনতার রায়ে তিনি বলেন: ‘নিউইর্য়ক যে নীল নকশা প্রণয়ন করেছে, অন্য রাজ্যগুলো তা অনুসরন করছে’ (পূর্বোক্ত)। এই ‘স্টপ এ্যান্ড ফ্রিস্ক’ পদ্ধতি শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিহ্নিত হয়েছে একটা ‘সংঘবদ্ধ অনাচার’ (organized harassment) হিসেবে।

দীর্ঘ মেয়াদে এই ‘থামাও এবং জোর তল্লাস কর’ পদ্ধতি শেষ পর্যন্ত অপরাধ দমনে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারছেনা, নিউ ইয়র্ক সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় এরকমটাও দাবি করা হয়েছে। তাই এই পদ্ধতিকেই এখন অনেকে দায়ী করছেন পুলিশ কর্তৃক সংঘটিত নির্যাতনের হার বেড়ে যাওয়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিকে। কেননা এই পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে পুলিশ যে কাউকে যে কোন সময় আটকাতে পারছে যেখানে সেখানে আর ‘সন্দহেজনক’ গতিবিধির জন্য পুলিশ গ্রেফতারও করতে পারছে। ‘থামাও এবং জোর তল্লাস কর’ পদ্ধতির যত্রতত্র ব্যবহাররে ফলে ৬৫ মিলিয়ন বা ৬.৫ কোটি মার্কিন নাগরিক পুলিশের খাতায় অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে যা ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার সমান (পূর্বোক্ত)।

তবে এ পদ্ধতির মধ্য দিয়ে সত্যিকারের অপরাধী চিহ্নিত করার চাইতে রাষ্ট্র কর্তৃক নিদিষ্ট সংখ্যালঘিষ্ঠ জনগোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার ইচ্ছা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

২। বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র কাঠামো

বিশেষজ্ঞ বা সমাজবজ্ঞিানীদের যে দলটি পুলিশী নির্যাতনের কারণ খুঁজতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈষম্যপূর্ণ রাষ্ট্র কাঠামোকে দায়ী করেন, তারা অবশ্য নির্যাতনের ঘটনা থেকে সূচিত প্রতিবাদ এবং প্রতিবাদোত্তর সহিংসতাকে বেশি বিবেচনায় নেন। তারা বলেন যে, এই মৃত্যুগুলোকে ঘিরে যে প্রতিবাদ বা সহিংসতা তার কারণ অনেক সুদূরপ্রসারী এবং গভীর। তারা মনে করেন, এগুলোর কারণ হলো মার্কিন সমাজে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বৈষম্য থেকে সূচিত ক্ষোভ। যেমন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৭২.৯% শ্বেতাঙ্গদের রয়েছে নিজেদের বাসস্থান আছে। আর কৃষ্ণাঙ্গদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৪৩.৫% (শ্যাশাটি, ২০১৪)। আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-এর ‘সোশিও ইকোনমিক স্ট্যাটাস’ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দারিদ্র পীড়িত হবার সম্ভাবনা শ্বেতাঙ্গ শিশুদের চাইতে কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের তিনগুণ বেশি। শুধু তাই নয়, কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর দারিদ্রপীড়িত হওয়ার কারণে তাদের মাঝে বেকারত্বের হারও বেশি। এবং স্বাস্থ্যগত চিত্রও তাদের খুব ভাল নয় (দেখুন, http://www.apa.org/pi/ses/resources/publications/factsheet-erm.aspx)। মানব উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে আসলে পিছিয়ে পড়েছে আফ্রিকান-আমেরিকান জনগোষ্ঠী।আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্র ব্যবস্থা সর্বজনের হয়ে ওঠেনি তাদের কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে। বারাক ওবামা রাষ্ট্রপতি হওয়া মানে এই নয় যে, সব কৃষ্ণাঙ্গদের বা মোটা দাগে সব সংখ্যালঘষ্ঠিদের এই রাষ্ট্র ব্যবস্থা সমানভাবে ধারণ করে তাদের অর্থনৈতিক বা উন্নয়ন নীতিতে।

রাষ্ট্রের কাঠামোগত বৈষম্যের বিষয়টি ফার্গুসনের আলোকে আরো বিস্তৃতভাবে তুলে ধরেছেন রিচার্ড রথস্টেইন তার ‘দ্যা ম্যাকিং অব র্ফাগুসনঃ পাবলিক পলিসি এট দ্যা রুটস্ অব ইটস্ ট্রাবলস্’ নামের গবেষণাধর্মী এক প্রতিবেদনে । তিনি উনিশ আর বিশ শতকে কেন্দ্রীয় থেকে স্থানীয় পর্যায়ের মার্কিন সরকারগুলো দ্বারা গৃহীত জননীতিকে (public policies) দায়ী করেন। তাদের গৃহীত জননীতিগুলো শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গদের সামাজিক বিভাজনকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিয়েছে, যদিও একবিংশ শতকে ঐ সব নীতির অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু সেই বর্ণ-বিভাজন এবং বৈষম্য প্রজন্মগতভাবে সুদূরপ্রসারী কুপ্রভাব তৈরি করেছে মার্কিন সমাজে বিশেষ ক’রে ফার্গুসন, সেন্ট লুই বা বাল্টিমোরের মত মেট্রোপলিটনগুলোতে ।

রিচার্ড রথস্টেইন মিশোরী রাজ্যের ফার্গুসনের কাছাকাছি অবস্থতি সেন্ট লুই শহরের উদাহরণ দিয়ে তার গবেষণায় দেখিয়েছেন, কিভাবে গত বিশ শতকের শেষের দিকে সরকারিভাবে গৃহীত উন্নয়ন নীতিমালা অনুযায়ী শহরটিকে শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষতি আলাদা আলাদা অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। ঐ নীতিমালা অনুযায়ী শ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত অঞ্চলকে আবাসিক এলাকা, কৃষ্ণাঙ্গ অঞ্চলকে বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকবিহীন এলাকায় উন্নয়নের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ভর্তুকী র্পযন্ত দিয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার র্শত বেঁধে দেয় যে, ওখানকার কোন ঘর-বাড়ি, জমি বা অন্য কোন সম্পদের মালকিানা কৃষ্ণাঙ্গ কোনো নাগরিকের কাছে হস্তান্তর করা যাবে না।

বাসস্থানকে বা আবাসিক অঞ্চলকে ঘিরে যে বিভাজন/বৈষম্য নীতি তা কিন্তু শ্রমের বাজার বা সম্পদের মালিকানার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। মার্কিন প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণা অনুযায়ী ২০১৩ সালে কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারগুলোর মোট সম্পদ শ্বেতাঙ্গ পরিবারগুলোর চাইতে ১৩ গুন কম যা ২০১০ সালে ছিলো আট গুণ (ফ্রাই ও কোচার, ২০১৪) । বর্ণ বৈষম্যরোধে প্রণীত সিভিল রাইটস্ এ্যাক্ট ১৯৬৪ পরবর্তী ১৯৬০ এর দশকে শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান নাগরিকের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকের বেকারত্বের হার ছিলো ২ থেকে ২.৫ গুন বেশী। ২০১৪ সালে এসেও কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকদের অবস্থার তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। এই সময়ে জাতীয় পর্যায়ে বেকারত্বের হার ৬.২% হলেও কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই হার ১১.৪%। আর শ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের বেকারত্বের হার ৫.৩% (দি গ্লোবালিষ্ট, ২০১৪)। একইভাবেই সেণ্টার ফর আমেরিকান প্রোগ্রেসের ২০১৩ সালের এক হিসেব অনুযায়ী আফ্রিকান-আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের দৈনিক উর্পাজন অহিস্পানিক (non-Hispanic) শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের দৈনিক উর্পাজনের ৬৪%। হিস্পানিক নারীদের ক্ষেত্রে এই চিত্র আরো করুণ। তাদের দৈনিক উর্পাজন অহিস্পানিক (non-Hispanic) শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের দৈনিক উর্পাজনের ৫৪%। তবে এশিয়ান-আমেরিকান নারীরা এক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় আছে। তাদের ক্ষেত্রে এটা ৯০%।

উপসংহার

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আপাত ভাবমূর্তি দেখে এটা বোঝা সম্ভব নয় যে, এই রাষ্ট্রটির রাজনৈতিক কাঠামোতে বৈষম্যমূলক উপাদান এতটা প্রকট। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশী নির্যাতন বা অন্য কোনো কারণে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক বা তরুণদের মৃত্যু রাষ্ট্রটির এই অন্ধকার দিকটিকে সামনে নিয়ে এসেছে। এই অন্ধকার দিকটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশ্লেষজ্ঞ, সমাজ বিজ্ঞানীগণ যে ব্যাখ্যাই দেন না কেন, এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, সব বর্ণের, ধর্মের সংখ্যালঘিষ্ঠ এবং রাজনৈতিক বা অর্থ শক্তিতে দূর্বল জনগোষ্ঠীই সবচাইতে বিপদগ্রস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশী ব্যবস্থাপনা তথা রাষ্ট্রকাঠামোতে। বিশেষ ক’রে ৯/১১ পরবর্তী বিশ্ব-ব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্র হিসেবে আরও বেশি ‘নিরাপত্তাকাতর’ হয়ে পড়েছে। ফলে ফার্গুসন বা বাল্টিমোরের হত্যাকান্ড এবং জনমানুষের প্রতিবাদ, শুধু কৃষাঙ্গ জনগোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক আচরণকে উন্মোচন করলেও, অন্য সংখ্যালঘিষ্ঠ সম্প্রদায় যে একই ধরনের ঘটনার শিকার হচ্ছে না, তা কিন্তু নিশ্চিত নয়। এ কথা স্পষ্ট করেই বলা যায়, এই রাষ্ট্রের মালিকানা সর্বজনের নয়, ধনী আর শক্তিশালীদের পক্ষেই রাষ্ট্রের কাঠামো। এই কর্পোরেট রাষ্ট্র ব্যবস্থায় এ অবস্থার যে দ্রুত পরিবর্তন হবে বিষয়টি তাও নয়। তবে অক্যুপাই ওয়ালস্ট্রিট আন্দোলন থেকে শুরু ক’রে বাল্টিমোর পর্যন্ত জেগে ওঠা মানুষের প্রতিবাদ এটা নির্দেশ করছে যে, খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের মালিকানা করায়ত্ত করতে এখন অনেক সচেষ্ট।

(২০১৫ সালে সর্বজনকথার নভেম্বর ইস্যুতে প্রকাশিত। ২০২০ সালে মে মাসে পুলিশী নির্যাতনে জর্জ ফ্লয়েডের নিহত হওয়ার ঘটনাটি বুঝার জন্য এই লেখাটি প্রাসঙ্গিক)

তথ্যসূত্রঃ

[কেলিং ও উইলসন, ১৯৮২] Kelling, G. L. and J.Q. Wilson (1982), “Broken windows: the police and neighborhood safety”, Atlantic Monthly, March, vol. 249, no. 3, pp. 29–38.

[শাশাটি, ২০১৪] Shashaty, A.F. (2014), “Ferguson Shows Failed US Policy and the Black-White Housing Gap”, 17 August. http://newamericamedia.org/2014/08/behind-fergusons-unrest-failed-federal-policy-and-the-black-white-housing-gap.php

[ রথস্টেইন, ২০১৪] Rostein, R. (2014), “The Making of Ferguson: Public choices at the Roots of Its Troubles”, http://www.epi.org/publication/making-ferguson/. Accessed 17 July 2015.

[দি গ্লোবালিষ্ট, ২০১৪] The Globalist (2014), “African Americans: The State We’re In”, available at http://www.theglobalist.com/african-americans-the-state-were-in/. Accessed 17 July 2015.

[টাইবি, ২০১৫] Taibbi, M. (2015),Why Baltimore Blew Up, The Rolling Stone, 26 May, http://www.rollingstone.com/politics/news/why-baltimore-blew-up-20150526. Accessed 17 July 2015.

[ফ্রাই ও কোচার, ২০১৪] Kochhar, R. and R. Fry (2014), Wealth inequality has widened along racial, ethnic lines since end of Great Recession, available at http://www.pewresearch.org/fact-tank/2014/12/12/racial-wealth-gaps-great-recession/. Accessed 17 July 2015.

Leave a Reply