রোহিঙ্গা শরণার্থীঃ মানবিক বিপর্যয় এবং রাষ্ট্রীয় ভূমিকার অসংগতি

Spread the love

‘সমুদ্রজয়’ উদ্যাপনের পর ঢাকা আর বিশ্রাম নেবার সুযোগ পেল না মায়ানমার প্রসংগে। বিস্মৃত রোহিঙ্গারা নাফ নদীর এদেশীয় প্রান্তে আশ্রয় চেয়ে আবারো মনে করিয়ে দিল কাজ আরো বাকী আছে। ‘আমরা গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি’ – ঢাকার বিবৃতিগুলো ঐতিহাসিকভাবে এইসব শব্দাবলীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখেছি আমরা। কিন্তু এবার তাঁরা কড়া ভাষায় কথা বলার সুযোগটা হাতছাড়া করেনি। যাদেরকে নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরক্তি, তাঁরা রাষ্ট্রবিহীন মানুষ এবং একইসাথে উদ্বাস্তুও বটে। কাজেই পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বলে ফেলতে পারলেন বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের এবার আশ্রয় না দেবার সাথে বৈদেশিক সম্পর্কের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনাটি অমূলক। হয়ত কোন পরিবর্তন দেখা যাবেনা, তবে, গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা, সরকার ও সাধারণের প্রতিক্রিয়া আর তাৎক্ষনিক বিশেষজ্ঞ মতামতগুলো নিয়ে এ সপ্তাহে আরো ভাববার অবকাশ রয়েছে। আমরা মনে করি রোহিঙ্গাদের বিষয়টি ভুলভাবে উপলব্ধি করা হয়েছে।

সীমান্তের জীবন-প্রনালী সার্বভৌমত্বের আইনী কাঠামোর কেন্দ্রীয় ভাবনাগুলোকে বরাবরই অবজ্ঞা করে এসেছে। এ কথা দক্ষিণের প্রায় সব দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এই সময়ে অস্বীকার করা খুব কঠিন যে প্রান্তিক মানুষেরা নিয়মিতই এপার-ওপার করে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির স্বাভাবিক কিংবা অবৈধিক কার্যক্রমে অংশ নেবার তাগিদে। সেক্ষেত্রে মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনাসমূহের প্রতিক্রিয়ায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা এবং আচরণে সদয়ভাব থাকা স্বাভাবিকভাবে কাম্য এবং জরুরীও । পৃথিবীর অন্যতম রক্তাক্ত সীমান্তে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দেশ হিসেবে বাংলাদেশেরও তাই সীমান্ত কূটনীতি নিয়ে ভিন্ন ভাবনা থাকার কথা। কেননা, বর্তমানের রোহিঙ্গা বিষয়টি বিচ্ছিন্নভাবে ভাবার সুযোগ নেই। বিষয়টি একইসাথে আমাদের দেশীয় অর্থনৈতিক উদ্বাস্তু, সম্ভাব্য পরিবেশগত উদ্বাস্তু এবং অবৈধ বাংলাদেশী শ্রমিক আর অভিবাসীদের বিষয়ে আঞ্চলিক দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আমাদের প্রত্যাশাগুলোর সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। উপরন্তু, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি আর কূটনৈতিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা আর সংগতিপূর্নতাও এর সাথে জড়িত।

এ পর্যন্ত অনেক যুক্তিই দেখানো হয়েছে সীমান্ত বন্ধ রাখার আর আশ্রয় না দেবার পক্ষে – জনসংখ্যার সংকট, অর্থনীতির সংকট, ভাবমূর্তির সংকট এরকম আরো অনেককিছুর। পলায়নরত রোহিঙ্গাদের ধন্যবাদ। তাঁরা আমাদের সংকটগুলোর বিষয়ে সরকারকে আবারো সজাগ করে তুলল। এই যুক্তি অনুযায়ী, আমরা ধনী হলে আশ্রয় দেবার কথা – অন্য ধনী দেশগুলোরও তাই দেবার কথা। কিন্তূ উদ্বাস্তুর অবস্থানগত পরিসংখ্যান তো সেটা বলেনা। কাজেই সংকট অর্থনীতি বা অন্য কিছুর নয়। এটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চরিত্র-সংকট। আধুনিক উদারতাবাদী রাষ্ট্র ব্যক্তিমানুষের বিশ্বজনীন মানবাধিকার রক্ষার কথা বলে, কিন্তু ওই একই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং নাগরিকতার ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত। এই রাজনৈতিক আবহাওয়ায় উদ্বাস্তু কিংবা রাষ্ট্রবিহীন মানুষরা তাই অনাকাংখিত, অদ্ভুত, অযৌক্তিক। রোহিঙ্গা ইস্যুতে এইসব অসংগতি কি চিন্তাশীলদের দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে? অন্তত ‘অধিকার থাকার অধিকার’ তো থাকতে পারে!

অভিজ্ঞ এবং শ্রদ্ধাভাজন সাবেক এক কূটনীতিক বলেছেন সমস্যাটা আমাদের না, ওদের। এমন বিশ্লেষণ রোহিঙ্গা সমস্যাটির আঞ্চলিক রূপকেই বরং অস্বীকার করে। আরেক সাবেক কূটনীতিক সারাজীবনের অভিজ্ঞতা নীংরে যে বাণী দিলেন তার সারমর্ম হলোঃ রোহিঙ্গারা কোন যন্ত্রনাভোগ করেনি (প্রমান-সাপেক্ষ বিষয়) আর মায়ানমারও জড়িত নয় (থাকবে কি করে, যেহেতু রোহিঙ্গারা ওই দেশের নাগরিকই নয়!)। এসব মন্তব্যে আমরা দুঃখ পেয়েছি তবে বিস্মিত হইনি। প্রথাগত কর্মকান্ডের বাইরে এদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয় কিইবা উদ্যোগ নিতে পেরেছে? গত দুই বছর ধরে আমাদের এই পার্শ্ববর্তী দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে কতটুকু আগ্রহ আমরা দেখিয়েছি? যে অং সাং সূ চীর ব্যপারে বাংলাদেশের মানুষের এতো শ্রদ্ধা, তাঁর সাথে সরকারীভাবে যোগাযোগ স্থাপনে আমরা কতটুকু সচেষ্ট হয়েছি? ১৯৫৫ সালের পর গত বছরের ডিসেম্বরে এই প্রথম কোন মার্কিন সেক্রেটারি অব ষ্টেটস (হিলারী ক্লিনটন) মায়ানমার সফর করলেন। ১৯৪৮ সালে দেশটি স্বাধীন হবার পর এই প্রথম কোন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী (ডেভিড ক্যমেরন) মায়ানমার সফর করলেন তিন মাস হলো। প্রায় ২৫ বছর পর ভারতের কোন প্রধানমন্ত্রী (মনমোহন সিং) দেশটিতে পা রাখলেন মাত্র গত মাসেই। এরা প্রত্যেকেই রাষ্ট্রপ্রধান আর সূ চীর সাথে দেখা করেছেন, সম্পর্কের শর্ত-সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছেন। আমরা অবশ্য নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। কারণ ওরা বার্তা দিয়েছে এদেশের একটি ইসলামী দল রোহিঙ্গাদের উস্কানী দিচ্ছে।

নিজেদের গাত্রবর্ণ অনুকূলে না থাকায় রোহিঙ্গাদের প্রতি বর্ণবাদী হবার সম্ভাব্য সুযোগ হারিয়েছি আমরা, তাই জেনোফোবিয়াতেই যেন ভরসা খুঁজে পাই। হেন কোন দোষ নাই যা আমরা রোহিঙ্গাদের মধ্যে দেখিনা। আবার একইসাথে তাদের ব্যবহারও করেছি নিজেদের আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক হিসেব-নিকেশ-কৌশলে। কূটনৈতিক চাপের ব্যবস্থা হিসেবে একাধিকবার ঠেলা-ঠেলিও করেছি সীমান্তে নিয়ে। নানাবিধ অপরাধচক্রও বেশ সক্রিয় এইসব অধিকারবিহীন মানুষদের অসহায়ত্বকে চূড়ান্তভাবে কাজে লাগানোর জন্য। এতোসবের পর আমরা সদম্ভেই বলছি, অনেক করেছি, আর পারব না। তবে এরইমধ্যে মুসলিম উম্মাহর কথা বলে ইসলামপন্থীদের ‘সেক্যুলার’ সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় আর বৌদ্ধধর্মের শান্তিবানীর অসারতা প্রমানে সচেষ্ট হতে দেখা গেছে। এক ঝোলা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নিয়ে এবারো তারা যথারীতি হাজির। রোহিঙ্গাদের সৌভাগ্য বটে, তাঁরা মুসলমান। নয়ত বিজিবির টহলবাহিনীর সদস্যরা অনাকাংখিত সাথী-সাহায্যকারী পেতেন হয়ত এই সময়ে। উপরন্তু, প্রধান বিরোধী দল যেরকম সময় অতিক্রান্ত করে আশ্রয় দেবার কথা বললেন তাতে বোঝা গেল না এটা কি তাদের ‘দলীয়’ অবস্থান নাকি ‘বিরোধী দলীয়’ অবস্থান।

শরণার্থী নিয়ে যেভাবে বিতর্কটা দেশে শুরু হলো সেটাও আমাদের কাছে সমস্যাপূর্ণ মনে হয়েছে। বলা হচ্ছে মানবিকতা আর বাস্তবতার মধ্যে আমাদের কঠিন সিদ্ধান্তকেই বেছে নিতে হচ্ছে। এধরনের পর্যালোচনা, যা কিনা নীতিশাস্ত্র আর বাস্তববাদের মধ্যে যোজন দূরত্বকে নির্দেশ করে, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের কঠোরতম বাস্তববাদীকেও হতাশ করবে। কে বলেছে ‘মানবিক মূল্যবোধ’ কিংবা ‘আন্তর্জাতিক রীতি’ ‘জাতীয় স্বার্থে’র চিন্তা-চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়? যদি বিশ্বাস করি আমাদের ‘জাতীয় মূল্যবোধের’ সাথে (যেটা কিনা জাতীয় স্বার্থের আর পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়) মানবাধিকারের বিষয়টি জড়িত, তাহলে শরনার্থী বিষয়ে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের নিজেদেরই আরো উদ্যোগী হবার কথা। দক্ষিণ ও দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার যে’কটি দেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে হয়েছে তাদের নিয়ে আমাদের বহুপাক্ষিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এবারের ‘ঘটনা’র পর জাতিসঙ্গঘে মায়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর নজরদারীর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সাথে আমরা যোগাযোগ করেছি কিনা তাও জানা গেলনা। তবে আমরা মনে করি, আরো কার্যকরী ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। শরণার্থীদের সীমান্তবর্তী অবস্থান রাষ্ট্রকে তার প্রান্তিক অঞ্চলে আরো ব্যপক ও কার্যকরভাবে উপস্থিত হবার সম্ভাবনা নিশ্চিত করে দেয় যার কৌশলগত সুবিধা আমাদের বুঝে নিতে হবে। কাজেই শরণার্থী অধ্যুষিত এলাকাকে অনুন্নত রেখে নতুন শরণার্থীদের প্রবেশ অনুৎসাহিত করার যে নীরব কৌশলের উপর আমরা নির্ভর করে এসেছি বহুদিন তা রাষ্ট্রের জন্য মংগলজনক নয় এবং তা কার্যকরীও নয়। এতে কেবলই অনুন্নত অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া স্থানীয়দের সন্দিহান করে তুলে বহিরাগতদের সম্পর্কে আর আশংকায় পড়ে এই ভেবে যে তারা একটি অসম প্রতিযগিতায় লিপ্ত হতে বাধ্য হয়েছে। আমরা জানি ঠিক এরকম নেতিবাচক চিন্তাভাবনাই মূলত সরকারকে গত বছর জাতিসংঘের ৩৩ মিলিয়ন ডলারের একটি সাহায্য-প্রকল্প (যা কিনা শরণার্থী আর স্থানীয়দের উদ্দেশ্য করে এসেছিল) ফিরিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করেছে। অথচ, শরণার্থীদের প্রতি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের সুযোগ ছিল বৈশ্বিক সাহায্য-প্রবাহ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আকর্ষণ করবার। এধরনের চ্যলেঞ্জের প্রতি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয় বরাবরই নিজেদের গূটিয়ে রেখেছেন।

আরো সব অদ্ভুত যুক্তি আসছে, সরকারের পাশাপাশি সাধারণের কাছ থেকেও যারা মুক্ত ইন্টারনেটের সকল সুবিধা প্রয়োগ করছেন এসব ছড়িয়ে দেবার কাজে। যেমন বলা হচ্ছে আশ্রয় দেয়াটা মায়ানমারকে প্রশ্রয় দেবার সামীল। বিষয়টা বোধগম্য হচ্ছে না। তাহলে কি বিপদগ্রস্ত প্যলেষ্টাইনী শরণার্থীদের স্থান করে দেয়াটা ইসরাইলকে প্রশ্রয় দেবার সামীল? নাকি পাকিস্তানকে প্রশ্রয় দেবার জন্যই ভারত এক কোটি বাঙ্গালীকে আশ্রয় দিয়েছিল ৭১-এ ? বলা হচ্ছে ৪০ বছর আগের এই অতি প্রাসংগিক উদাহরনটিও নাকি অচল। কারণ আমরা ভালো, ফিরে এসেছি। রোহিঙ্গারা পচা, ফিরে যায় না, যাবেও না। মাত্র নয় মাসে যুদ্ধ শেষ হবার সুফল অনেক। এখন আমরা নানা যুক্তি দিতে শিখেছি। অনেকে জানেই না যে পূর্ব বাংলা থেকে সেই পঞ্চাশের দশক থেকেই লক্ষ-লক্ষ মানুষ পশ্চিম বাংলায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল যারা আর ফিরে আসেনি, আসাটা সম্ভব হয়নি। বিংশ থেকে একবিংশ শতকের দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস মূলত উদ্বাস্তু মানুষের ইতিহাস। ব্যক্তি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও ভুলে গেলেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা। তিনিও রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রার্থী ছিলেন, প্রথমে যুক্তরাজ্যে, পরে ভারতে। ফিরে কি আসতে পেরেছিলেন ৮১ সালের আগে? পরিস্থিতি কি অনূকূলে ছিল? এই মার্চেই “৭১ এর বন্ধু” হিসেবে UNHCR কে মনোনীত করে একটি সার্টিফিকেট আর ক্রেষ্ট ধরিয়ে দিলেন প্রধানমন্ত্রী এইকারণে যে এই সংস্থাটি সেইসময়ে অসাধ্য সাধন করেছিল। তারা শুধু এক কোটি শরণার্থীদের দেখ-ভালের কার্যক্রমই পরিচালনা করেনি, পরবর্তীতে প্রায় আড়াই লক্ষ আটকে পড়া বাঙ্গালীদের পাকিস্তান থেকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও নিশ্চিত করেছিল নিজেদের তদারকিতে। ইদানীংকার ঘটনাবলীতে একই সংস্থা কিছু অনুরোধ রেখেছে বাংলাদেশের কাছে। এতে ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র খুঁজে পেয়েছেন অনেকে।

ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের উদ্বাস্তু সংকটের ভয়াবহতা পশ্চিমকে উদ্বুদ্ধ করেছিল ১৯৫১ সালের শরণার্থী বিষয়ক কনভেনশনটির রচনা ও  বাস্তবায়নে। কিন্তু তারা দায়িত্বশীল আচরণে ব্যর্থ হয়েছে নব্বই পরবর্তী বৈশ্বিক উদ্বাস্তুর সংকট মোকাবেলায়। যদিও বৈশ্বিক শরণার্থীদের একটি অংশ, এমনকি রোহিঙ্গারাও, নিয়মিতভাবেই পশ্চিমে পূনর্বাসিত হচ্ছে (সংখ্যায় তেমন নয় আর গনমাধ্যমের গুরুত্বহীন খবর) কিন্তু উওরাঞ্চলের ওইসব ধনী দেশগুলোর আভ্যন্তরীন রাজনৈতিক বিবেচনায় রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় পরিচয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে। গত দুই দশকে নব্য-ফ্যসিবাদী, অভিবাসী-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান পশ্চিমের প্রায় সব দেশেই প্রকটতর হয়েছে। ৯/১১ এর পর পরিস্থিতি পশ্চিমা সরকারগুলোকে আরো শরণার্থী-বিমুখ করে তুলেছে।

আমরা আশংকা করছি শরণার্থী বিষয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অবস্থান তাঁর পররাষ্ট্রনীতির নৈতিক ভিত্তিকে (যদি সেরকম কিছু থেকে থাকে) নাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের কাঁটাতার – যা কিনা বর্তমানের বাংলাদেশ থেকে আগত অর্থনৈতিক অভিবাসী আর ভবিষ্যতের পরিবেশগত শরণার্থীদের উদ্দেশ্য করেই মূলত তৈরী – তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে উচ্চকিত হওয়াটা এদেশের সাধারণের কাছে বিব্রতকর হয়ে দাঁড়াবে। অর্থমন্ত্রী কিভাবে তাঁর তিন বছর আগের দাবীটি পূনর্ব্যক্ত করবেন যখন তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে আগামী ৪০ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০ মিলিয়ন বা ২ কোটি মানুষ পরিবেশগত উদ্বাস্তু হয়ে দেশ ছাড়তে ‘বাধ্য হবে’ আর একারণে ব্রিটেনসহ ধনী দেশগুলোর উচিৎ সীমান্ত উন্মুক্ত করে বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয় দেবার দায়িত্ব নেয়া? অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের বিষয়ে ভারত-বাংলাদেশের শীতল সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই বিদ্যমান আর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয় বছরের একটি বড় সময় ব্যয় করে মধ্যপ্রাচ্য আর দক্ষিন-পূর্বের দেশগুলোতে অবৈধ বাংলাদেশী শ্রমিকদের বৈধ করবার দেন-দরবারে। পরিস্থিতি যখন এরকম, তখন অভিবাসী শ্রমিক, উদ্বাস্তু, শরণার্থী কিংবা বিদেশে অবৈধভাবে অবস্থানরত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশীদের বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের কূটনৈতিক কার্যক্রমে একটি সংগতিপূর্ণ আচরণের ছাপ থাকা জরুরী। কাজেই, যে ন্যয়পরায়ন আচরণ আর অধিকারের দাবী নিয়ে আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যাই, সেই বিষয়গুলোর যৌক্তিক অংশীদার আমরাও হতে পারি।

কিন্তু, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অনুরোধ-উপদেশ শুনে আমরা যে মূর্তি প্রায়শই ধারণ করি তাতে বোঝা যায়না যে বাংলাদেশ ভাবমূর্তির ব্যপারে কতোটা সচেতন। উল্টো অনেকে প্রশ্ন তুলছেন এসব সংস্থার সততা-ষড়যন্ত্র নিয়ে আর উপদেশ দিচ্ছেন এই বলে যে তাদের উচিৎ মায়ানমারের উপরই দৃষ্টি নিবদ্ধ করা। তাঁরা মূলত এড়িয়ে যাবার কৌশল বেছে নিয়েছেন। মায়ানমারের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে যারা ওয়াকিবহাল তাঁরা ভালো করেই জানেন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মানবাধিকার বিষয়ক সমালোচনামূলক রিপোর্ট বা অনুরোধমূলক বিবৃতি খুব কমই কাজে এসেছে। আমরাও কি শুনেছি কখনো, – শুনছি? সত্যিকার অর্থে মায়ানমারের ভূমিকা আমাদেরকেও আয়নার সামনে নিয়ে এসেছে। সেদেশের জাতিগত সংঘাত আর সংখ্যালঘুদের প্রতি রাষ্ট্রের এহেন আচরণ আমাদের ইতিহাস-বর্তমানের অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে নেবারও একটা সুযোগ করে দিয়েছে নিশ্চয়।

দরিদ্র আরাকান অঞ্চলে বিদ্যুৎ না থাকলেও নাসাকা ঠিকই বিদ্যুতায়িত সীমান্ত-বেড়া তৈরী করেছে। মায়ানমারের নাগরিকতা সংক্রান্ত বিধি যা ১৯৮২ সালে পরিবর্তিত হয় তা বিশ্বের অন্যতম দমনমূলক আইন হিসেবে কুখ্যাত। এর প্রায়োগিকতায় আর অস্বাভাবিক সামরিকায়নের কারণে রোহিঙ্গারা সব ধরনের মৌলিক অধিকার হারিয়েছে। এখন আরাকানবাসীরা প্রার্থনায় বসেছে ‘বাঙ্গালী সন্ত্রাসী’ রোহিঙ্গারা যেন ‘তাঁদের’ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়। আমরাও রোহিঙ্গাদের দেখছি কেবলই একটি অপরাধপ্রবন জাতি আর সন্তান-উৎপাদনে অতিমাত্রায় ক্রীয়াশীল জনগোষ্ঠী হিসেবে। ঘৃণিত একটি গোষ্ঠীর অস্তিত্বের বিপদ উপলব্ধি করতে প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে এবারো যদি আমরা ব্যর্থ হই আর আন্তর্জাতিক সমাজকে নিয়ে মায়ানমারের রাষ্ট্রীয় আচরণে পরিবর্তন আনতে অক্ষম হই, তাহলে নিশ্চিতভাবেই ক্ষমার অযোগ্য মানবিক বিপর্যয় ঘটে যাবে সেখানে যার প্রভাব থেকে আমাদের সীমান্ত মুক্ত থাকার সম্ভাবনা নেই। মুক্ত চিন্তা্র সংস্কৃতি হতে দীর্ঘকাল বঞ্চিত মায়ানমারবাসীর জন্য সমসাময়িক রাজনৈতিক সংস্কার আর সীমিত আকারের মত প্রকাশের অধিকার যেন ঘৃণার স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। বিভিন্ন ব্লগ আর অনলাইন ফোরামে সেদেশীয় মানুষদের রোহিঙ্গা-বিরোধী মন্তব্যগুলো দেখে আমরা কি টের পাচ্ছি যে কি ভয়াবহ বর্ণবাদী একটি সমাজের পাশেই আমরা অবস্থান করছি? আবারো বলছি, সাম্প্রতিকতম মানবিক বিপর্যয়ের সময় রোহিঙ্গাদের প্রথম গন্তব্যের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রাথমিক দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করে ফেলেছে। আমাদের সিদ্ধান্তের কারণে আপাতত নাফ নদীতে কিছুদিন রোহিঙ্গারা ভাসছে অথবা ফিরে গিয়ে পুনরায় বিপদগ্রস্ত হচ্ছে। এতে নাকি মায়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে আর সংকটের সমাধান হয়ে যাবে। দেখা যাক।

জুলাই, ২০১২

[বীণা’দির অনুরোধ এবং উদ্যোগে লেখাটি তৈরী করেছিলাম। এটি ছিল প্রথম ড্রাফট। পরবর্তীতে আরো পরিবর্ধিত আকারে লেখাটি তৈরীতে তানজীম ভাই এবং বীণা’দি সাহায্য করেছিলেন। প্রথম আলো’তে এর একটি সংক্ষিপ্ত রুপ ছাপা হয়েছে।]

 

About মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে শিক্ষকতা করেছি প্রায় নয় বছর। বর্তমানে ষ্ট্রসলার সেন্টার ফর হলোকষ্ট এন্ড জেনোসাইড ষ্টাডিজ, ক্লার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক।

View all posts by মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান →

One Comment on “রোহিঙ্গা শরণার্থীঃ মানবিক বিপর্যয় এবং রাষ্ট্রীয় ভূমিকার অসংগতি”

  1. বিংশ থেকে একবিংশ শতকের দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস মূলত উদ্বাস্তু মানুষের ইতিহাস।
    Well thought article.
    Looking forward to have more on this issue.

    RGDS.

Leave a Reply