সাক্ষরতা বনাম তিন ‘আর’

Spread the love

সাক্ষরতা শব্দটি বহুল পরিচিত। আমাদের এ অঞ্চলে সাধারণভাবে কোনো রকমে নাম লিখতে পারলেই কাউকে সাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে অনেক বছর ধরেই সাক্ষরতা বোঝাতে তিন ‘আর’ বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তিনটি ইংরেজি শব্দ – রাইটিং, রিডিং ও অ্যারিথমেটিক থেকে নেওয়া হয়েছে ‘আর’।

পড়া, লেখা ও অঙ্ক কষা – তিনটিতেই নূ্যনতম জ্ঞান চাই সবার জন্য।

লেখার শুরুতে আমরা একটু পেছনে তাকাতে চাই। ১৮৭১ সালে ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল ছিলেন মায়ো। এই উপমহাদেশে তিনিই প্রথম লোকগণনার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। মোগল সম্রাটরা শত শত বছরেও এটা চালুর চেষ্টা করেননি। তবে এই গভর্নর জেনারেলের পরিণতি হয় ভয়াবহ। ব্রিটিশ শাসকরা এ ভূখণ্ডের প্রতিবাদী ব্যক্তিদের নির্বাসনে পাঠাত আন্দামানে। অনেক দাগী অপরাধীকেও সাগর পাড়ি দিয়ে রেখে আসা হতো নির্জন ওই এলাকায়। এদেরই একজন তাকে সেখানে হত্যা করেছিল। সম্ভবত ওই কয়েদিকে পাঠানো হয়েছিল আফগানিস্তান থেকে। গভর্নর জেনারেল মায়ো তার এক বন্ধুকে চিঠিতে লিখেছিলেন, এ ভূখণ্ডের সাধারণ মানুষকে শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে আমরা কিছুই করিনি। বাবুরা এটা কখনোই করবে না। তাদের যত বেশি শিক্ষা দেওয়া হবে, সেটা রেখে দেবেন নিজেদের কাছে। এই বাবুদের কাছ থেকে শিক্ষা কবে কৃষকদের কাছে হস্তান্তরিত হবে সে জন্য যদি আমরা অপেক্ষা করি, তাহলে আমাদের হয়তো পাথর হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আমরা বাবুদের ইংরেজি শেখায় আপত্তি করি না। কিন্তু যেহেতু তারা গ্রামীণ জনপদে থাকা কোটি কোটি মানুষকে শেখাবে না, তাই আমাদেরই এ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের দেশে সাক্ষরতার প্রসার ঘটেছে_ তাতে সন্দেহ নেই। এর হার কত, সেটা নিয়ে নানা মত রয়েছে। তবে একটি বিষয়ে সবাই একমত যে, তিন ‘আর’ বিবেচনায় নিলে এই হার খুব একটা বেশি হবে না। অথচ শিক্ষার গুরুত্ব এখন সর্বজনবিদিত। একটি দেশ শিক্ষায় এগিয়ে গেলে তার অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা যে কত দ্রুততর হয়, সেটা উপলব্ধি করার মতো আমাদের এই দেশের লাখ লাখ লোক রয়েছেন এবং তাদের অনেকে দায়িত্ব পালন করছেন গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩০ সালে গিয়েছিলেন রাশিয়ায়। তখন দেশটি কমিউনিস্ট শাসিত। সেখানের আর্থ-সামাজিক উন্নতি তাকে মুগ্ধ করে। ফিরে এসে তিনি লিখেছিলেন ‘রাশিয়ার চিঠি’।

কেন রাশিয়ার এই উন্নতি, তার জবাবে তিনি বলেছিলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনই পিছিয়ে পড়া দেশটিকে বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্র থেকে কৃষক ও শ্রমিকদের শিক্ষাদানের বিপুল আয়োজন কবিগুরুকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি লিখেছেন, মাত্র কয়েক বছরে যেটা রাশিয়ায় সম্ভব হয়েছে, ভারতবর্ষে দেড়শ’ বছরেও তা অর্জন করা যায়নি। এ জন্য রুশ বিপ্লবের সংগঠকদের কৃতিত্ব দিয়েছেন তিনি।

১৯১৭ সালের বিপ্লবের পর রাশিয়া যে সর্বজনীন শিক্ষার পথে অগ্রসর হয়েছে, তার প্রেরণা ছিল মার্কস ও এঙ্গেলস রচিত কমিউনিস্ট ইশতেহার। এতে স্পষ্ট ভাষায় সর্বজনীন শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আমরা জাপানের উদাহরণও টানতে পারি। এ দেশটিতে প্রাকৃতিক সম্পদের ঘাটতি রয়েছে। তারপরও কেন তারা বড় আকারের বিভিন্ন বিপর্যয় কাটিয়ে উন্নতির শিখরে উঠতে পারছে? ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল মায়ো যখন কৃষকদের শেখানোর ওপর জোর দিয়েছেন, ঠিক সেই সময়েই (১৮৭২) জাপানে মৌলিক শিক্ষা কোড অনুমোদিত হয়। আধুনিক জাপানের সূচনা বছর হিসেবে ১৮৬৮ সালকে গণ্য করা হয়। এর ঠিক চার বছর পরেই অনুমোদিত শিক্ষা কোডে বলা হয়, কোনো সমাজের কোনো অংশে কোনো সাক্ষরজ্ঞানবিহীন পরিবার থাকবে না। কোনো পরিবারেও থাকবে না সাক্ষরজ্ঞানবিহীন কোনো সদস্য। শিক্ষার পেছনে তারা বিপুল বিনিয়োগ শুরু করল সে সময় থেকেই। এর ফল হিসেবেই তারা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সামরিক বিপর্যয়ের পর দ্রুত তার ধকল কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সাধন করে। তারপরও জাপান যে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তার প্রধান কারণ শিক্ষার বিস্তার। কেবল সংখ্যায় নয়, মানেও তারা এগিয়ে যাচ্ছিল।

এখন বাংলাদেশের দিকে তাকানো যেতে পারে। তুলনার জন্য আমরা আশপাশের কয়েকটা দেশকেও বেছে নেব। এশিয়ার দুটি দেশ উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া। এক সময়ে এক দেশ ছিল। উত্তর কোরিয়া কমিউনিস্টশাসিত। অর্থনীতিতে খুবই পিছিয়ে। গণতন্ত্র সেখানে অনুপস্থিত। আরেকটি অংশ দক্ষিণ কোরিয়া। তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অভাবিত পর্যায়ে পেঁৗছেছে। তবে উভয় অংশেই শিক্ষার হার একশত ভাগ। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ চীনে শিক্ষার হার ৯৬ শতাংশ। বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে এই হার ৯০ শতাংশ। ইরানে ৮৩ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলংকায় শিক্ষার হার ৯০ শতাংশ। তবে এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর চিত্র উৎসাহব্যঞ্জক নয়। বাংলাদেশে বলা হচ্ছে, এই হার ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ। কিন্তু সম্ভবত কেবল কোনো রকমে নাম লিখতে পারাকেই এ যোগ্যতা বা মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়েছে। ভারতে শিক্ষার হার এখন ৭৪ শতাংশ। কিন্তু নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অমর্ত্য সেনের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের একবার পরীক্ষা নেওয়ার ঠিক এক বছর পর ফের একই বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হলে দেখা গেছে, তারা এ সময়ে তেমন কিছুই বাড়তি শেখেনি। আগের বছর যারা পাস করেছে, তাদের একটি অংশ পরের বছর একই ধরনের প্রশ্নের পরীক্ষায় ফেল করেছে। বিশেষ করে সাধারণ গণিতে উন্নতির হার খুব ধীর। বাংলাদেশে আমরা দাবি করছি ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ শিক্ষার হার। কিন্তু তিন ‘আর’ বিবেচনায় নিলে প্রকৃত চিত্র সেটা অনেককে গভীরভাবে হতাশ করবে। আমরা একটি ভালো চিত্র অবশ্যই তুলে ধরতে চাই। কিন্তু যা নেই সেটা প্রচার করে কোনো লাভ নেই। বরং ক্ষতির শঙ্কা থাকে। বাস্তব এখন এটাই যে, বাংলাদেশের অর্ধেক লোক পড়তে, লিখতে এবং অতি সাধারণ অঙ্ক কষতে জানে না। এর অর্থ হচ্ছে, এদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ, দেশাত্মবোধ এবং দেশ সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা মোটেই সহজ হবে না। এই অর্ধেক নাগরিক বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা পাঠ করেনি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের কোনো লেখা পড়েনি। এদের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাহলে কীভাবে সৃষ্টি হবে? কীভাবে তারা জানবে সুফিবাদ সম্পর্কে, যা সবার ওপরে মানুষের জয়গান গাইতে শেখায়? আমাদের সমাজে সহিষ্ণুতার বড় বেশি প্রয়োজন_ এটা বিজ্ঞজনরা বলছেন। কিন্তু কীভাবে সাক্ষরজ্ঞানহীন মানুষ এর প্রয়োজন উপলব্ধি করবে? দুর্নীতি কীভাবে আমাদের অগ্রযাত্রার পথে প্রতিবন্ধক হয়ে রয়েছে, সেটা তারা জানতে পারবে কীভাবে?

চীনে শিক্ষার হার প্রায় শতভাগ। বিশাল এই দেশে বসবাস করছে প্রায় দেড়শ’ কোটি লোক। তারা এক থাকতে পারছে যেসব কারণে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ সম্ভবত এই যে, তারা সবাই শিখছে একই হরফে। চীনের সর্বত্র উচ্চারণ অভিন্ন নয়। আঞ্চলিক ভাষাও রয়েছে। কিন্তু হরফ সর্বত্র এক। লিখিত অক্ষর এক। এক সূত্রে দেশটিকে গেঁথে ফেলার পেছনে এর অবদান সবাই স্বীকার করেন। তারা সবাই এক হরফে কনফুসিয়াস পড়তে পারে। দেং শিয়াও পিংয়ের উন্নয়ন দর্শন জানতে ও বুঝতে তাদের সমস্যা হয় না।

বাংলাদেশের অর্ধেক লোক পড়তে বা লিখতে পারে না। বাকি অর্ধেকও যেভাবে দাবি করা হয় সেভাবে শিক্ষিত নয়। জনগণের মধ্যে পরিচয় সংকট রয়ে গেছে। বাঙালি হিসেবেই আমরা আত্মপরিচয়ের সন্ধান করেছি ১৯৭১ সালে। কিন্তু এখন কেউ কেউ দাবি করছেন নিজেদের পরিচয় হওয়া উচিত বাংলাদেশি। আবার আদিবাসীদের পরিচয় নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে নতুন সংকট। এখানে ‘বাবুদের’ কথা ভুললেও চলবে না। ব্রিটিশ আমলের বাবুরা এখন বদলে গেছে। এখানে শিক্ষার সুযোগপ্রাপ্ত নতুন একটি জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। তারা সমগ্র জনগোষ্ঠীকে শিক্ষিত করে তোলায় এ পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে মনে হয় না। রিকশাচালক বা কাজের বুয়া নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করতে করতে পথে চলবে কিংবা ঘরের কাজ করবে_ সেটা ক’জনেই-বা চায়! প্রকৃতপক্ষে এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অনেকে সেজন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারেনি বলেই অনেকে বলছেন। কিন্তু গোটা বাংলাদেশকে যদি অভিন্ন সূত্রে গেঁথে ফেলতে চাই, যদি একবিংশ শতকের আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলতে চাই, যদি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, তাহলে শতভাগ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হবে না?

কিন্তু কীভাবে এটা সম্ভব হতে পারে? প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক নানা আয়োজন এজন্য রয়েছে। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল শক্তি এজন্য কাজে লাগানো যায়। একটি উদাহরণ দিই। বর্তমানে আনসার ও ভিলেজ ডিফেন্স পার্টির (ভিডিপি) নিয়মিত ও অনিয়মিত সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫৭ লাখ। ভিডিপিতে মহিলা ৫০ শতাংশ। তাদের যদি সাক্ষরতা কর্মী হিসেবে কাজে লাগানো যায়, দ্রুত আমরা বৃত্তের বাইরে থাকা অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে তিন ‘আর’ শেখাতে পারি। আনসার-ভিডিপি সদস্যদের মাধ্যমে প্রযুক্তি জ্ঞানও ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। আমরা থ্রিজি প্রযুক্তি ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগী হয়েছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সচেষ্ট রয়েছি। অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে নূ্যনতম শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত রেখে এ লক্ষ্য কীভাবে অর্জন করতে পারব? আমরা মাত্র ১০ হাজার টাকায় ল্যাপটপ বিক্রির পরিকল্পনা নিয়েছি। দেশের সব মানুষের কাছে এ সুবিধা পেঁৗছে দেওয়ার উপায় তো হাতের কাছেই রয়েছে। এরা সবাই শিক্ষা কর্মী হতে পারে।

মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোও শিক্ষার প্রসারে প্রত্যক্ষভাবে অবদান রাখতে পারে। গার্মেন্টশিল্প অনেক নারী কর্মী টেনে নিয়েছে। তারপরও কিন্তু আমরা ঘরে ঘরে কাজের জন্য বিপুল সংখ্যককে নিয়োগ করতে পারছি। আমাদের প্রতিটি পরিবারে রয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা। কাজের মেয়ে-বুয়াদের মধ্যে কেন এটা ছড়িয়ে দিই না?

আমাদের ছাত্র সংগঠনগুলোও নিজেদের এ ভূমিকায় নিতে পারে। তারা দলীয় রাজনীতির বৃত্তে বন্দি হয়ে পড়েছে। নিজেরা যা শিখছে সেটা অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে আগ্রহ নেই। তারা এগিয়ে এলে প্রকৃতই অসাধ্য সাধিত হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে আমরা যদি দৃঢ়সংকল্প নিয়ে অগ্রসর হতে পারি, ১০০ ভাগ শিক্ষিতের দেশে পরিণত হওয়া দুরূহ কাজ হবে না। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন_ চিত্ত যেথা ভয়শূন্য…।

সব মানুষকে এভাবে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার বিকল্প নেই। আর এ লক্ষ্য অর্জনের মতো প্রবল শক্তি আমাদের সমাজেরই রয়েছে। কেবল তা সুসংগঠিতভাবে কাজে লাগানোর অপেক্ষা।

(দৈনিক সমকালে ৯-২০-২০১৩ তারিখে প্রকাশিত)

Leave a Reply