স্বাগতম ঋণ খেলাপ…


Spread the love

ব্যাংক ব্যবস্থাপনার দৈন্যদশা সবার জানা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, অবলোপন করা ঋণসহ খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি। ২০০৯ সালের শুরুতে ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রীও অল্প সময়ের ব্যবধানে নানা রকম বিবৃতি দিয়েছেন। কখনো বলছেন, খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না। পরমুহূর্তে আবার শর্ত শিথিলতার ঘোষণা দিচ্ছেন। বলছেন, ঋণখেলাপিদের জেলে দিলে দেশ চলবে না। ‘প্রকৃত’ ব্যবসায়ীদের সব সুযোগ–সুবিধাই দেওয়া হবে। এসব শর্ত প্রতিপালন করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে সরে আসছে।

পরিচালনা পর্ষদের অযাচিত হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ব্যাংক খাত নিয়ন্ত্রণ, ঋণ পুনর্গঠনের শর্ত শিথিল করা, খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন ইত্যাদি কি এ বিপর্যয়ের মৌলিক কারণ? ব্যাংক ব্যবস্থার বিপর্যয় কি শুধু ব্যাংক খাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? ব্যাংক খাতের এ অবস্থা চললে মধ্য মেয়াদে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা কি টিকে থাকবে? ইতিমধ্যে মোট দেশজ উৎপাদন, তথা জিডিপির অনুপাতে ব্যক্তি খাতের স্থবির বিনিয়োগের ওপর আরও কী প্রভাব পড়বে? ফলে জাতীয় উৎপাদনের চাকা হুমকিতে পড়বে কি?


খেলাপি ঋণ কেন হয়? বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের মূল কারণ রাজনৈতিক। প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক বশ্যতার কারণেই খেলাপি ঋণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। যে পদ্ধতিতে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীন চরিত্র, বৈশিষ্ট্য ও অস্তিত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০১৫ সালে বড় ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দিতে বড় অঙ্কের ঋণ পুনর্গঠনের নীতিমালা অনুমোদন দিয়েছে। এ পক্ষপাতমূলক সুবিধার আওতায় ৫০০ কোটি টাকা বা তার বেশি অঙ্কের ঋণেরই শুধু পুনর্গঠন করা যাবে। অর্থাৎ, নিয়ম পালনকারীরা বৈষম্যের শিকার হবেন। অন্যদিকে, খেলাপির অনন্ত সুযোগ-সুবিধা! নীতিমালা অনুসারে, মেয়াদি ঋণ পুনর্গঠন সর্বোচ্চ ১২ বছরের জন্য। আর তলবি ও চলমান ঋণ পুনর্গঠন হবে ছয় বছরের জন্য। ঋণের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার কম হলে ডাউন পেমেন্ট বা এককালীন জমা দিতে হবে ২ শতাংশ হারে। আর এক হাজার কোটি টাকা ও তার বেশি পরিমাণ ঋণের জন্য এককালীন জমা দিতে হবে ১ শতাংশ হারে।

পরিসংখ্যান বলছে, পুনর্গঠন-সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়ীদের বড় অংশই কিস্তি পরিশোধ করেনি। ইতিমধ্যেই সুবিধাপ্রাপ্তরা নতুন করে খেলাপি হয়েছেন। রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত নতুন ব্যাংকগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। ওগুলোরও খেলাপি ঋণ বেড়েছে। পত্রিকান্তরে পরিচালনা পর্ষদের নয়ছয়ের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এ বছরের নতুন পদক্ষেপ অনুযায়ী, ঋণখেলাপিরা ৯ শতাংশ সুদে ঋণ শোধ করতে পারবেন। অর্থাৎ যাঁরা ঋণ নিয়ে শোধ না করে ইচ্ছে করে খেলাপি হয়েছেন, তাঁরা ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন। ঘোষণা এল, ঋণখেলাপিদের মাফ করে দেওয়া হবে। এখন আবার খেলাপি ঋণের সংজ্ঞায় পরিবর্তন করা হয়েছে। এখন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ না করলে তবেই তা খেলাপি হবে, যা আগে ছিল তিন মাস। তবে আগের ঋণ শ্রেণিবিন্যাস নীতিমালাটি ছিল আন্তর্জাতিক মানের। ঋণ অবলোপনের নীতিমালায় যে সংশোধন আনা হয়েছে, তাতে ব্যাংকগুলো এখন মাত্র তিন বছরের মন্দ মানের খেলাপি ঋণ ব্যালেন্স শিট থেকে বাদ দিতে পারবে। এত দিন কোনো ঋণ মন্দ মানে, শ্রেণিকৃত হওয়ার পাঁচ বছর পার না হলে তা অবলোপন করা যেত না। অন্যদিকে, অবলোপনের জন্য এখন আর আগের মতো শতভাগ প্রভিশন লাগবে না। আবার দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ অবলোপনে মামলা করতে হবে না। এত দিন মামলা না করে অবলোপন করা যেত ৫০ হাজার টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা শিথিলের ফলে এক ধাক্কায় খেলাপি ঋণ আদায় না হলেও তা কাগজ-কলমে কমবে! এ সুবিধার ফলে ঋণখেলাপিরা ও দুর্বল ব্যাংকগুলো আরও উৎসাহিত হবে। এখন ভালো ঋণগ্রহীতারাও ঋণ শোধ না করে খেলাপি হতে চাইলে দায় কার!


ব্যাংক খাতের সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা সম্পর্ক কী? পুঁজি আসে দুই উৎস থেকে। ব্যাংক খাত এবং পুঁজিবাজার থেকে। ব্যাংকগুলো অর্থ সৃষ্টির মাধ্যমে পুঁজি সঞ্চয়ন করে। ব্যক্তি খাতে অর্থ সরবরাহের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও বাড়ায়। ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পায়। এই খাতের দুরবস্থার দরুন ব্যাংকে নগদ অর্থের সংকট থাকায় সাধারণ ঋণগ্রহীতারা ঋণ পাচ্ছেন না। বিনিয়োগে বিঘ্ন ঘটছে; যার প্রভাব পড়বে জাতীয় উৎপাদনে। বিনিয়োগের সঙ্গে মোট জাতীয় উৎপাদন সম্পৃক্ত। বিনিয়োগ বাড়লে জাতীয় উৎপাদন বাড়বে (যদিও বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি দেখানো হচ্ছে, কিন্তু ওই প্রবৃদ্ধিতে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগের হার স্থবির!)। অর্থাৎ টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে ব্যাংকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। নানা আশ্বাসের পরও থামছে না শেয়ারবাজারের দরপতন। নড়বড়ে ব্যাংকব্যবস্থা এবং পুঁজিবাজারের কারণে আস্থাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, পুঁজির অভাব সংকটাকার ধারণ করছে। অন্যদিকে, আস্থাহীনতার কারণেও পুঁজির পাচার ঘটছে। উচ্চ আমদানির পরিসংখ্যানের দিকে নজর দিলে পুঁজি পাচারের বিষয়টি পরিষ্কার হয়। পাচার হওয়া পুঁজির কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় সুদের হার বেড়ে যায়। তারল্য–সংকট ও অধিক সুদের হার থাকায় নতুন বিনিয়োগকারী তৈরি হচ্ছে না। ‘আমেরিকান ইকোনমিক রিভিও’র চলতি সংখ্যার এক নিবন্ধে বিভিন্ন দেশের পরিসংখ্যান ব্যবহার করে প্রমাণ হাজির করা হয়েছে, ব্যাংক ব্যবস্থার দুরাবস্থার ফলে প্রবৃদ্ধি ঝুঁকিতে পড়ে।


ব্যাংকব্যবস্থার এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী? প্রথমে ব্যাংকের মালিকানা বিষয়ে বিভ্রান্তিমূলক প্রচলিত ব্যবস্থার নিরসন হওয়ার দরকার। ব্যাংক যেকোনো সাধারণ কোম্পানির মতো নয়। সাধারণ কোম্পানিতে পুঁজির জোগান উদ্যোক্তারা ও শেয়ারহোল্ডাররা দিয়ে থাকেন। শুধু কারবারি পুঁজি (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) ব্যাংকব্যবস্থা থেকে নেওয়া হয়। কিন্তু ব্যাংকের ক্ষেত্রে এটা ব্যতিক্রম। এখানে উদ্যোক্তা বা শেয়ারহোল্ডারদের পুঁজির তুলনায় ব্যাংকগুলো যে পরিমাণ ঋণ দেয় বা বিনিয়োগ করে, তার অংশ খুবই কম। আমানতকারীরা অধিকাংশ অর্থের জোগান দেন। তার মানে, ব্যাংকের পরিচালকেরা মালিক নন, যাঁর হাতেই পরিচালনা থাকুক না কেন, এটি আসলে আমানতকারীর প্রতিষ্ঠান। মূলত, সে জন্য রেগুলেশন বা পরিচালনের ধরন ভিন্ন হওয়ার দাবি রাখে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি যে ব্যাংক আর দশটি প্রতিষ্ঠানের মতো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি আমানতকারীর প্রতিষ্ঠান। কাজেই আমানতের খেয়ানত করার অধিকার কারও নেই। সে জন্যই ব্যাংকের ক্ষেত্রে অধিক পরিমাণে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যুক্তিসংগত। কিন্তু তা বর্তমানে দৃশ্যমান নয়।

উত্তরণের জন্য লক্ষ রাখতে হবে, কেতাবি কায়দায় সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না; ওই পদ্ধতিই গ্রহণ করতে হবে, যে পদ্ধতি বাংলাদেশে কাজ করে। সৃজনশীল পন্থা অনুসরণ করতে হবে। যেমন পোশাকশিল্পের বেলায় ‘ব্যাক টু ব্যাক’ ঋণপত্রের মাধ্যমে উদ্যোক্তাকে তাঁর কাঁচামাল সরবরাহের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে তাঁর হাতে প্রথমে অর্থ না দিয়ে ব্যাংক রপ্তানির পর প্রাপ্ত অর্থ থেকে দেনা চুকিয়ে উদ্যোক্তার প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে দিচ্ছে। সৃজনশীল পদ্ধতিতে ঋণপ্রবাহ বজায় রাখা হচ্ছে। বিশেষত, তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক বন্দোবস্তের চরিত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার নিত্যসঙ্গী। কিন্তু যেসব দেশ উত্তরণে সফলতা দেখিয়েছে, তাদের পুঁজিপতিদের শৃঙ্খলায় রেখেছে। অথচ বাংলাদেশে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, বিচারহীনতা ও জবাবদিহির অভাব দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য মুদ্রানীতির অন্যতম লক্ষ্য হওয়া দরকার ব্যাংকের সঙ্গে গ্রাহকের চুক্তি কার্যকর। চুক্তি কার্যকর করতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়ানো এবং সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক কাজে লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। স্বাধীনতা ভোগের পাশাপাশি দায় নিয়ে পদত্যাগের সংস্কৃতিও চালু হওয়া দরকার। অন্যথায় রাজনীতিতে বন্দী হলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়বে।

প্রথম আলো, ০৪ মে ২০১৯।

No Comments

Leave a Reply