হারাচ্ছে প্রবৃদ্ধি, হারাচ্ছে একটা প্রজন্ম

Spread the love

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে না। ফলে একটা প্রজন্মকে আমরা হারাতে বসেছি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট কর্মোপযোগী মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ। এর মধ্যে কর্মে নিয়োজিত ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষ। বাকি ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ না আছে শিক্ষায়, না প্রশিক্ষণে, না কাজে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, দেশে প্রকৃত বেকার মোট কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৪৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। তদুপরি, যারা কর্মে নিয়োজিত, তাদের মধ্যে খণ্ডকালীন বেকারের সংখ্যা ১৪ লাখ ৬৫ হাজার। এরা সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার কম কাজ করে। আবার কাজে নিয়োজিতদের প্রায় ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। সম্প্রতি ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে, দেশে শিক্ষিত যুবকদের শতকরা ৪৭ ভাগ বেকার। বোঝা যায়, কথিত উন্নয়ন জোয়ারের ছোঁয়া থেকে ব্যাপকসংখ্যক শিক্ষিত যুবকেরা বঞ্চিত। এসব যুবক হতাশ ও ক্ষুব্ধ।

বেকার সমস্যার সবচেয়ে বড় শিকার ১৫-২৯ বছর বয়সী যুবকেরা। বর্তমানে ১৫-৬৫ বছরের কর্মক্ষম জনশক্তির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। যদি তা যথাযথভাবে ব্যবহার করা যায়, এই পরিমাণ কর্মক্ষম জনশক্তি যেকোনো দেশের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এক বিরাট সম্পদ। একে জনমিতিক লভ্যাংশ (Demographic Dividend) বলা হয় এবং প্রতিনিয়ত আমরা এ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।

জিডিপি ও কর্মসংস্থানে শিল্প খাতের তথা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের অবদান বাড়লে অর্থনৈতিক বিকাশের ধারা সুসংহত হয়। কিন্তু কর্মসংস্থানে শিল্প খাতের অবদান আশানুরূপ নয়। ২০১০ সালে শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের অবদান ছিল ২৩.৩ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ২০.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। শ্রমবাজারে পর্যাপ্ত জনশক্তির উপস্থিতি থাকলেও নতুন শিল্পে অটোমেশন এবং উন্নত প্রযুক্তি প্রবর্তনের ফলে প্রত্যাশা অনুযায়ী শিল্প খাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে না। অধিকাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। না আছে উপযুক্ত মজুরি, না আছে অধিকার। অগ্রযাত্রা নিয়ে কথা বলা হলেও অগ্রযাত্রার মৌল সূচক শোভন কর্মসংস্থান নিয়ে কথা নেই।

একদিকে মূল্যস্ফীতি ঘটছে, অন্যদিকে মজুরি কমছে। পরিসংখ্যান ব্যুরো সম্প্রতি কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের কর্মীদের প্রকৃত আয়ের সূচক প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের মজুরি ২০১০-১১ থেকে ২০১৪-১৫ সময়ে বেড়েছে ২৪.৭ শতাংশ। কিন্তু এ সময়ে ভোক্তামূল্য সূচক বেড়েছে ৩২.৬ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১০-১১-এর তুলনায় শ্রমিকদের প্রকৃত আয় কমেছে ৭.৯ শতাংশ। এ থেকে প্রতীয়মান যে উচ্চ প্রবৃদ্ধির হার দাবি করা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ তাদের আয়-বৃদ্ধি থেকে শুধু বঞ্চিত হয়নি, বরং তাদের আয়ও হারিয়ে যাচ্ছে।

দারিদ্র্য
এবারের বাজেটে বরাদ্দ কমেছে সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ খাতে। জনগণকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নিয়ে আসার দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এ দেশে কমপক্ষে একটি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতাধীন রয়েছে মোট জনসংখ্যার ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ায় এ হার ৮৫ শতাংশ। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি হারে মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আছে।

দেশে দারিদ্র্যের হার কমলেও সাম্প্রতিক সময়ে দারিদ্র্য কমার সেই হারও কমে গেছে। বিবিএস বলছে, ২০০০ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ ছিল। পরের পাঁচ বছরে ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ হারে কমে দারিদ্র্যের হার ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর ২০১০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ৩১ শতাংশ। ২০০৫ থেকে ২০১০ সময়ে প্রতিবছর গড়ে ১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে দারিদ্র্য কমেছে। এরপরের ছয় বছর অর্থাৎ ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দারিদ্র্য কমেছে গড়ে ১ দশমিক ২ শতাংশ হারে। এ ছাড়া দারিদ্র্যের হার কমার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্য প্রকট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপমতে উত্তরবঙ্গের পাঁচ জেলায় দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুরে ২০১০ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ৩৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৪ শতাংশ। কুড়িগ্রামে ৬৪ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭১ শতাংশ এবং লালমনিরহাটে সাড়ে ৩৪ শতাংশ থেকে ৪২ শতাংশ হয়েছে।

সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২২ নম্বর ধারায় সমাজের প্রতিটি সদস্যের সামাজিক নিরাপত্তার অধিকারের কথা ব্যক্ত করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি দুটি ভাগে বিভক্ত করা যায়: (১) সামাজিক বিমা তথা পেনশন, কর্মক্ষমতার (অভাবহীনতা বা প্রতিবন্ধীদের) জন্য ভাতা-সুবিধা প্রদান, বেকার ভাতা এবং (২) মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা যেমন খাদ্য, বস্ত্র, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা প্রদান।

সর্বশেষ খানাভিত্তিক আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, ২০১০ সালের জনসংখ্যার শতকরা ৮৪ ভাগের আয় দৈনিক দুই মার্কিন ডলারের নিচে ছিল (যা দারিদ্র্যসীমা নিরূপণের মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করা হয়)। অতএব বলা যায়, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ হয় দরিদ্র অথবা তাঁরা অত্যন্ত কষ্টকর জীবনযাপন, কিংবা তাঁরা দরিদ্র হওয়ার মতো ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। এ জন্য একটি সুপরিকল্পিত ‘সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা’ চালু করা অপরিহার্য।

বাংলাদেশে জনমিতির ক্রমপরিবর্তন সাধিত হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে বয়স্ক জনসংখ্যার হার বাড়ছে। মোট জনসংখ্যার শতকরা ৮ ভাগ বর্তমানে ষাটোর্ধ্ব। জাতিসংঘের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ এবং ২০৫০ সালে এ সংখ্যা দাঁড়াবে যথাক্রমে মোট জনসংখ্যার শতকরা ১৪ ও ২৫ ভাগ। সরকারি খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পেনশন-ব্যবস্থা চালু আছে। অল্পসংখ্যক বৃদ্ধ ও বিধবাদের মাসিক যৎসামান্য ভাতা দেওয়া হয়। সর্বজনীন পেনশন প্রবর্তনের কথা এবার নিয়ে দ্বিতীয়বার বলা হলো। চালু যে কবে হবে?

আয়বৈষম্য
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবাই সমানভাবে পাচ্ছে না। ফলে দিন দিন আয়বৈষম্য বাড়ছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ খানা আয় ও ব্যয় জরিপ-২০১৬ বলছে, দেশের সব মানুষের যত আয়, এর মাত্র ১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ আয় করেন সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষ। ছয় বছর আগেও মোট আয়ের ২ শতাংশ এই শ্রেণির মানুষের দখলে ছিল। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের আয় বেড়ে মোট আয়ের ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। ছয় বছর আগে এর পরিমাণ ছিল ৩৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশের মোট আয়ের দুই-তৃতীয়াংশের মালিক ওপরের দিকে থাকা ৩০ শতাংশ মানুষ। এই ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে জিনি সূচকে। আয়বৈষম্য নির্দেশক জিনি সূচক ২০০০ সালের দশমিক ৪৫১ থেকে ২০১৬ সালে দশমিক ৪৮৩ হয়েছে। এর সঙ্গে সম্পদবৈষম্য যুক্ত হয়েছে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের জন্য এখন প্রয়োজন প্রাজ্ঞ নীতিমালা। কাঠামোগত বাধা অতিক্রমের জন্য স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি কৌশল গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন জরুরি হওয়া সত্ত্বেও অনুপস্থিত। বর্তমান সরকারের গৃহীত যৎসামান্য আর্থিক পদক্ষেপসমূহ প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে যথেষ্টভাবে কার্যকর নয়।

এসব ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন ও সংস্কার ছাড়া অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। দেশে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ অনুপস্থিত বিধায় নারী-পুরুষ, স্থানিক আয়বৈষম্য বাড়ছে, যার ফলে বেকারত্বও বাড়ছে।

প্রথম আলো;১৪ জুন ২০১৮, ০৮:৪৪

About রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারপারসন, উন্নয়ন অন্বেষণ

View all posts by রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর →

Leave a Reply