June 18, 2024

 

প্রথম কিস্তি

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে সাথে মানুষের দৈনন্দিন জীবন যাপনে যেমন এসেছে আমুল পরিবর্তন তেমনি এর ক্ষতিকারক ব্যবহারের ফলে অনেকের জীবন আবার দুর্বিষহও হয়ে পড়েছে। তাই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইন হয়েছে। আমাদের দেশে প্রযুক্তিনির্ভর পেশা তথা কম্পিউটারের মাধ্যমে পেশা এখনো অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোর পর্যায়ে না পৌঁছালেও নব্বই দশকে শুরু হওয়া প্রযুক্তির ছোঁওয়া লেগেছে জাতীয় জীবনে। একারনেই বর্তমান সরকারের বিগত নির্বাচনে মুল শ্লোগানই ছিল ডিজিটাল বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ হওয়ার পথে কি পরিমাণ এগিয়েছে সেটি এখনো বিতর্কের বিষয়। এখানে মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। কিন্তু একথা মানতে হবে যে, দেশের শিক্ষিত যুব সমাজের একটি বৃহৎ অংশ কম্পিউটারকে তাদের জীবনের সঙ্গী করে নিয়েছে। সহজে বহনযোগ্য হিসেবে ল্যাপটপের ব্যবহারই সবচেয়ে বেশী। কেউবা কিনছেন প্রয়োজনে আর কেউবা শখের বশে। ফেসবুক, টুইটার কিংবা অন্য কোন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠছে আগের যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর বিকল্প ব্যবস্থা।

তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে তাবত দুনিয়ায় গড়ে ওঠা তথ্য ভাণ্ডার সবার নাগালের মধ্যে আসার পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতে তৈরি হয়েছে নতুন ধরণের সাইবার অপরাধ। আর্থিকভাবে উন্নত দেশগুলোতে প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে এই অপরাধ সংঘটনের পরিমাণ যেমন বেশী তেমনি এর ধরণও দেশ ভেদে ভিন্ন। উল্লেখযোগ্য অপরাধগুলোর মধ্যে শিশু পর্ণোগ্রাফি,  ম্যালওয়ার বা স্পাই ওয়ারের মাধ্যমে কারো ব্যক্তিগত তথ্য চুরির মাধ্যমে ব্যাংক একাউন্ট থেকে টাকা চুরি, অন্যান্য আর্থিক দুর্নীতি, তথ্য চুরি ইত্যাদি অন্যতম। বিশ্বের কোন কোন দেশে পরিণত বয়স্কদের জন্য পর্ণোগ্রাফি আইনসিদ্ধ হলেও এমন একটি দেশও পাওয়া যাবে না যেখানে শিশু পর্ণোগ্রাফিকে আইনি স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত তথ্য প্রযুক্তিতে উৎকর্ষতা লাভের পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে এর মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ধারা সংযুক্ত করে তথ্য প্রযুক্তি আইন পাশ হয়েছে। সে আইনের কোন কোন ধারা অতি মাত্রায় কঠোর হওয়ার কারণে ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টকে হস্তক্ষেপও করতে হয়েছে। আমাদের দেশে এরকম একটি আইন প্রণীত হয় ২০০৬ সালের শেষ ভাগে। ২০০৬ সালে এই আইন পাশ হওয়ার পর থেকে এই আইনের প্রয়োগ কিংবা এ নিয়ে তেমন আলোচনাও হয়নি। কিন্তু আস্তিনের তলায় লুকিয়ে থাকা সাপ এক সময় না এক সময় ছোবল মারবেই- এত জানা কথা। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৬ ধারায় কাউকে হেয় করে রিপোর্ট প্রকাশের দায়ে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান ছিল যা বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের সরকারের আমলে বাতিল করা হয়। ২০০৬ সালে এর চাইতে অনেক বেশী কঠোর এই নতুন আইনের মাধ্যমে সাইবার অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ নয় বরং বিরুদ্ধ মতের কণ্ঠরোধ করার মানসেই করা হয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।

তথ্য প্রযুক্তি ও যোগাযোগ আইন ২০০৬ এর ৯০টি ধারার মধ্যে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের বা প্রযুক্তি নির্ভর পেশাজীবীদের যে অংশটির সবচেয়ে বেশী অসুবিধা হওয়ার কথা ছিল বা প্রতিবাদ হওয়ার কথা ছিল তা কিন্তু হয়নি। বরং লেখক, শিল্পী, সাহিত্যক, সাংবাদিকরা সোচ্চার হয়েছেন একটি নির্দিষ্ট ধারার বিরুদ্ধে। তাঁদের দাবী- ৫৭ ধারা যদি প্রচলিত থাকে তাহলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে পছন্দ না হলে যে কাউকে দমন পীড়ন চালানো যাবে। এতে মুক্তচিন্তার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে এবং সবার মাঝে এক ধরণের আতঙ্ক বিরাজ করবে। এই আতঙ্কে থাকলে আর যাই হোক চিন্তার স্বাধীনতা থাকে না। যা আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এই অনুচ্ছেদে দেশের সকল নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে নাগরিকের বাক স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এবার আসা যাক শর্তগুলোর কথা- ন্যায়সঙ্গত আইনগত বিধি নিষেধ যেমন- রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা, সামাজিক শৃঙ্খলা, সৌন্দর্য বা নৈতিকতা, আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে উস্কানি দেওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য রাষ্ট্র বিধি নিষেধ আরোপ করতে পারবে। এবার দেখা যাক, তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা, যে ধারাটিকে বলা হচ্ছে কালো আইন। আলোচনার স্বার্থে ধারাটি হুবহু উদ্ধৃত করছিঃ

“ ইলেক্ট্রনিক ফরমে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত অপরাধ ও উহার দণ্ডঃ (১) কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েব সাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরণের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানী প্রদান করা হয়, তা হলে তার এই কায হবে একটি অপরাধ। (২) কোন ব্যক্তি উপ ধারা (১) এর অধীন অপরাধ করলে তিনি অনধিক দশ বছরের কারাদণ্ড কিংবা এক কোটি টাকার অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

বিগত ২১ আগস্ট ২০১৩, মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক জারীকৃত অধ্যাদেশ মুলে এই আইনে সংশোধনী আনা হয় যাতে এই ধারাটিতে পরিবর্তন এনে কারাদণ্ডের মেয়াদ বৃদ্ধি করে অন্যূন ৭ বছর এবং অনধিক ১৪ বছর করা হয়। ধারাটি প্রথম থেকেই ছিল অজামিনযোগ্য কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ এর সকল ধারাই ছিল অআমলযোগ্য। যার অর্থ দাঁড়ায়- পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেটের লিখিত অনুমতি ছাড়া এই আইনে কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে না। নতুন সংশোধনীতে এই আইনকে আমলযোগ্য করায় পুলিশের উপর আর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকল না। পুলিশ চাইলেই যেকোন সময় যেকাউকে এই ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা বলে গ্রেফতার করতে পারবে। এই ধারাতির প্রায়োগিক দিক ভালভাবে বুঝতে হলে ধারাটির প্রত্যেকটি উপাদান বিশ্লেষণ করা দরকার- (ক) এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীলঃ এখানে ওয়েব সাইট বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করার কথা বলা হচ্ছে যা হতে হবে মিথ্যা বা অশ্লীল। এখন দেখা যাক সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেন অনুযায়ী মিথ্যা বা অশ্লীল কোন কিছু প্রকাশে বাধা আছে কিনা? এতে নীতি বা নৈতিকতার কথা বলা হলেও “মিথ্যা” কোন কিছু প্রকাশে কোন বিধি নিষেধ আরোপ করা হয় নি। তবে সাধারণ মানেই ধরে নেয়া যেতে পারে এটি উহ্য অবস্থায় হলেও আছে। কিন্তু, এই আইনে কোথাও বলা হয়নি, কোন কোন বিষয়বস্তুকে অশ্লীল বা মিথ্যা হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে। এক্ষেত্রে আইনটি সুনির্দিষ্টতার অভাবের কারণে দুষ্ট। অথচ যে কোন ফৌজদারি আইনে অভিযোগ হতে হবে সুনির্দিষ্ট। এতে পরিস্কারভাবে বলা থাকতে হবে- যদি কেউ …… বিষয়ে এমন কোন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন তাহলে তা হবে অশ্লীল ও মিথ্যা বক্তব্য। (খ) সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেনঃ এখানে ব্যক্তি বিশেষের বিবেচনার উপর অপরাধ হওয়া না হওয়ার বিষয়টিকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। প্রতিটি মানুষের বিবেচনা সমান হবে না। একজন ব্যক্তি একটি বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নীতি ভ্রষ্ট বা অসৎ হতে পারেন আবার একই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে অন্যকোন ব্যক্তি বিষয়টি আমলে না নিয়ে উড়িয়ে দিতে পারেন। তাছাড়া, নীতি ভ্রষ্ট বা অসৎ হওয়া বলতে কি বোঝাবে তার কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নাই এই আইনে। বর্তমান সংশোধনীর পর পুলিশকে যেহেতু অপরাধ আমলে নেয়ার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তাই বলা যেতে পারে যদি পুলিশের কাছে মনে হয় যে তিনি বা অন্য কেউ এরকম কোন বক্তব্য প্রকাশ বা সম্প্রচার করার ফলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন তাহলে তিনি এটিকে অপরাধ হিসেবে আমলে নেবেন। (গ) যার দ্বারা মানহানি ঘটেঃ এটিও আইনের মুলধারার সাথে সংগতিবিহীন। যদি কেউ ইন্টারনেট ব্যবহার করে মিথ্যা ও অশ্লীল কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন তাহলে তার জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে অন্যূন ৭ বছর এবং সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত। অথচ কেউ যদি বই বা লিফলেট আকারে একই মিথা বা অশ্লীল কোন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন তাহলে বাংলাদেশ দণ্ডবিধি অনুযায়ী তিনি ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ভোগ করবেন এবং এটি জামিনযোগ্য। নতুন আইনে এই অতিরিক্ত শাস্তির বিধান কেন রাখা হয়েছে তা নিয়ে এই আইনের কোথাও কোন উল্লেখ নেই। আইনের অসমতা বিচারিক মানদণ্ডকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিচার প্রক্রিয়া এবং শাস্তির বিধান, দেশ ভেদে ভিন্ন ভিন্ন তাই এর উদ্দেশ্যও ভিন্ন। আইনবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে শাস্তি প্রদানের পেছনে যে যুক্তি তা হল সামাজিক সমতা বিধান এবং অপরাধীকে কারাগারে রেখে সংশোধনের মাধ্যমে সমাজে পুনর্বাসন। বিচার যেহেতু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া তাই সেখানে একটি দেশের জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এই আইনেও তাই হয়েছে। (ঘ) আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়ঃ ইন্টারনেটে কোন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করার ফলে আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটতে পারে এই ভাবনাটাই নতুন। কেননা বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং এর মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম যেমন ফেসবুক, টুইটার কিংবা বিভিন্ন ব্লগ ব্যবহারকারীর সংখ্যা এতই নগণ্য যে তারা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতঃ আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটাবেন এমনটি ভাবা কেবল উর্বর মস্তিষ্ক থেকেই সম্ভব। নতুন আইনে, আইন শৃঙ্খলার অবনতি ঘটবে বা ঘটছে কিনা তা নির্ণয় করবেন পুলিশ। তাহলে প্রশ্ন ওঠে আমাদের পুলিশ ইন্টারনেটে প্রকাশিত বা সম্প্রচারিত কোন মন্তব্য বা বক্তব্য বিচার বিশ্লেষণ করতে কতটুকু সক্ষম? একজন পুলিশ উপ পরিদর্শক তার বিদ্যাবুদ্ধির জোরে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্তৃক করা কোন মন্তব্যের বিচার বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হবেন কিনা? যারা ভাবছেন হবেন তাদের স্বাগত জানাই তাদের উদার চিন্তার জন্য। (ঙ) রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়ঃ এই আইনে কোথাও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বলতে কি বঝাবে তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। সুতরাং এই অস্পষ্টতার কারণে রাষ্ট্র নিজে ভাবমূর্তি সংকটে পতিত হয়েছে। এবার আসি ব্যক্তির ভাবমূর্তি বিষয়ে। কোন বক্তব্যে বা এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করার ফলে কোন ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হওয়ার যেমন আশঙ্কা রয়েছে তেমনি একই বক্তব্য বা এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করার ফলে অপর একজন ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন নাও হতে পারে। ভাবমূর্তি নির্ণয়ের যেহেতু কোন মানদণ্ড নেই তাই এটি ব্যক্তিবিশেষের চিন্তা চেতনার উপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্র একটি গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অপর একটি গোষ্ঠীর প্রতি বিরূপ আচরণ করবেন এটা প্রত্যাশিত নয়। (চ) ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করে বা করতে পারেঃ এটিও অত্যন্ত অস্পষ্ট ও অনির্ধারিত একটি অপরাধ। “ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত করে” পর্যন্ত রেখে যদি এই অনুভুতির ব্যাখ্যা দেয়া থাকত তাহলেও কিছুটা যুক্তি খুঁজে পাওয়া যেত কিন্তু যখনই বলা হচ্ছে “আঘাত করতে পারে” তখনই অপরাধটি অনির্দিষ্ট হয়ে গেল। আর অনির্দিষ্ট কোন অপরাধের কারণে আইন কোন ব্যক্তিকে সাজা দিতে পারে না। অপরাধ অনির্দিষ্ট হওয়া মানে এই আইনের অপপ্রয়োগ করার রাস্তা খোলা রাখা। তদুপরি ব্যক্তির ধর্মচিন্তাও আপেক্ষিক বিষয়। কখন কোন কথায়, কি পড়ে, কার ধর্ম চিন্তায় আঘাত লাগবে তা বলা মুশকিল। তাছাড়া, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার কারণে দণ্ডবিধির ২০৫ ধারায় শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। একটি সুনির্দিষ্ট আইন থাকতে নতুন করে এই আইনে অধিকতর শাস্তির বিধান রাখার মানে হল- কেউ যদি বই লিখে বা লিফলেট আকারে কিছু প্রকাশ করে কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেন তাহলে তিনি ২ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করবেন আর তিনি যদি একই কাজ ওয়েব সাইটে বা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে করেন তাহলে অন্যূন ৭ বছর এবং অনধিক ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ভোগ করবেন। আই অপরাধের ফর যদি একই হয় অর্থাৎ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হয় তাহলে একই অপরাধের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শাস্তির বিধান কেন? এই ধারার সর্বশেষ উপাদানটি হল-(ছ) এ ধরণের তথ্যাদির মাধ্যমে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি প্রদান করাঃ ব্যক্তির বিরুদ্ধে উস্কানি দেয়ার অভিযোগ নাহয় বোঝা গেল কিন্তু সংগঠনের বিরুদ্ধে উস্কানি দেয়া কিভাবে অপরাধ হিসেবে গন্য হতে পারে। ফৌজদারি অপরাধ হল ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপর এক ব্যক্তির কৃত অপরাধ। একজন ব্যক্তি একটি সংগঠনের বিরুদ্ধে যখন অপরাধ করবেন তখন সেটির নমুনা কি হবে? বর্তমানে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ওয়েব সাইট রয়েছে এবং সেখানে তারা একে অপরের প্রতি যে ভাষায় লেখেন তা প্রতি নিয়তই অন্যদেরকে উস্কানি দেয় বলে আমার ধারণা এবং সেটি যদি কোন দলের কেউ অন্য দলের বিরুদ্ধে দাবী করে বসেন তাহলে সেই রাজনৈতিক দল যাদের ওয়েব সাইটে বক্তব্যটি প্রকাশ পেয়েছে বা সম্প্রচার হয়েছে তার বিরুদ্ধে না যিনি বক্তব্যটি আপলোড করেছেন তার বিরুদ্ধে মামলা হবে? উস্কানির ধরণ কি হবে এবং কখন কোন বক্তব্যকে উস্কানি মনে করা হবে তার মানদণ্ড কি হবে, এনিয়েও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে কিছুই বলা হয়নি।

এত গেল ৫৭ ধারার বিভিন্ন উপাদানের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, এবার আসা যাক আমাদের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে। দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল এনিয়ে দুটো কথা লেখার। আমাদের সংসদে মোট ৩০০ আইন প্রণেতা আছেন। তাঁদের প্রত্যেকের আইন প্রনয়নের ক্ষেত্রে কি ভূমিকা থাকে তা একটু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আমার জানা মতে তাঁদের ভোট দিয়ে সংসদে উত্থাপিত বিলটি পাস করা ছাড়া আর কোন ভূমিকা থাকে না। তাহলে প্রশ্ন হল যাদের ভোট দিয়ে আমরা আইন প্রণয়ন ও উন্নয়নের জন্য সন্সদে পাঠাই তারা কি করেন? তাঁদের আইন প্রণেতা না বলে অন্য কোন নামে ডাকা উচিত কিনা? কারা তবে এসব আইন বানান যার ফলে আমার আপনার জীবন কখন সুন্দর, কখনো বা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে? এসব প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজব আগামী পর্বে।

দ্বিতীয় কিস্তি

গত পর্বে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার উপাদানগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছি কিন্তু এর আরও বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা এগোয়নি। এ পর্বে সেটাই বিস্তারিতভাবে বলার চেষ্টা করব। কিন্তু তার আগে আমাদের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে দুটো কথা লিখব বলেছিলাম-সেটা সেরে নেয়া যাক। আমাদের ব্যবসায়ী আইন প্রণেতারা বর্তমানে কি প্রক্রিয়ায় আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখছেন তা আমাদের মত আর্থিকভাবে অনুন্নত দেশগুলোতে নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালেও এতে শ্রেণীস্বার্থ সংরক্ষণের ব্যাপারও জড়িত। দেশের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র শ্রমজীবী হলেও আমাদের হাইব্রিড গণতন্ত্রে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব থাকে না বলে তাঁদের স্বার্থ সংরক্ষণে স্বাধীনতার পর থেকে কোন উলেখযোগ্য আইনই হয়নি। ছিটেফোঁটা যেসব আইন তাঁদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে তা ক্ষমতাশালী, বিত্তশালীদের উচ্ছিষ্ট ভোগ করার মত। সে কারণে দেশের বিচার ব্যাবস্থাও অবশ্যম্ভাবীভাবে ক্ষমতাশালী, বিত্তশালীদেরই প্রতিনিধিত্ব করে। এই বিচার ব্যাবস্থায় প্রতিবছর সহায়ক হিসেবে সংযুক্ত হয় হাজারও আইনব্যবসায়ী, যাদের অধিকাংশই আসে এসব নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত বা শ্রমজীবী শ্রেণী থেকে। কিন্তু তারা জটিল আইনি প্রক্রিয়ার বেড়াজালে পড়ে বুঝতেই পারে না তারা কিভাবে ক্ষমতাশালী, বিত্তশালীদের শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হন। সে যাই হোক- আমাদের আইন প্রণেতারা যদি আইন প্রণয়ন না করেন তাহলে কারা আইন প্রণয়ন করেন? আমাদের আইন মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ শাখা আছে যার নাম সলিসিটর উইং। এখানে একদল বেশ দক্ষ আমলা থাকেন যাদের আইন বিষয়ে ডিগ্রী রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব আমলারাই শিতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে আইন প্রণয়ন করেন। আমলা কর্তৃক প্রণীত আইন তাঁদের শ্রেণীস্বার্থের সাথে সাযুজ্য রেখে প্রণীত হবে এটাইতো স্বাভাবিক। এটিই পরবর্তীতে সংসদে উপস্থাপন করে আমাদের আইন প্রণেতাগণ সংখ্যাগরিস্ট ভোটের জোরে পাস করেন। বেশিরভাগ আইন পাশের আগে তেমন আলোচনা বা বিতর্ক হয় না। জনগণের আলোচনার সুযোগের কথা নাহয় বাদই দিলাম। এই আইন প্রণয়ন হবার পর সাথে সাথে এর প্রয়োগ শুরু হয় বিধায় সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের যে বিপত্তি ঘটে তাও আশ্চর্যান্বিত হওয়ার মত। কখনো কখনো সাধারণ নাগরিকের দৈনন্দিন সংঘাতের মধ্যে আর একটি নতুন উৎপাত যুক্ত হয়ে তাঁদের জীবনকে করে তোলে আরও দুর্বিষহ। অথচ আমরা যদি আমাদের আইনি ধারণা যেদেশের সাথে মিল আছে বলে আমরা দাবী করি অর্থাৎ ইংল্যান্ডের দিকে তাকাই তাহলে দেখব- সরকার কোন নতুন আইন প্রনয়নের আগে এনিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করে নাগরিকের মতামত নেয়ার চেষ্টা করে। এই মতামত নেয়ার চেষ্টা কেবল দায়সারা হয় না কেননা সেখানে মানুষের জন্যই আইন, আইনের জন্য মানুষ নয়। উল্লেখযোগ্য সময় অতিবাহিত হওয়ার পর জনমত যাচাইয়ের ভিত্তিতে যদি দেখা যায় যে এতে বিপুল অধিকাংশ জনগণের সায় আছে তাহলে সেটি নিম্ন কক্ষে স্ট্যাচুটরি ইন্সট্রুমেন্ট (statutory instrument) হিসেবে উত্তাপিত হয়। সেটি পাস হওয়ার পর বিল আকারে উত্তাপিত হয় এবং এটি পাস হওয়ার পর তা রানীর সম্মতি স্বাক্ষরের পর আইন আকারে প্রবর্তিত হয়। এরকম প্রত্যেকটি আইন বলবত হওয়ার সময় নির্ধারণ করা থাকে এক বছর পর। এই এক বছরে সরকার বিভিন্ন উপায়ে সরকারের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ করানো, নাগরিকদের অভিহিতকরণের জন্য প্রচার-প্রচারনা, সেমিনার, কাউন্সিলের মাধ্যমে লিফলেট বিলি করার মাধ্যমে নতুন আইনে আইন প্রয়োগকারিদের প্রশিক্ষণ ও সাধারণ নাগরিকদের অভ্যস্ত করে তোলার কাজ করেন। এতে করে নতুন আইনের প্রভাব ও এর ফলে নাগরিক জীবনে কি কি পরিবর্তন আসে তা নিয়েও অভ্যস্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশে আমরা যে মানের জীবন যাপন করি তাতে ইংল্যন্ডের সাথে তুলনা চলে না। কিন্তু, আমাদের নতুন করে ভাবতে তো দোষ নেই।

এবার ফেরা যাক আমাদের মূল আলোচনায়- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার পুলিশি ক্ষমতায়ন নিয়ে আগের পর্বে লিখেছি, সেটিই সবচেয়ে শঙ্কার বিষয়। কনস্টেবল থেকে পদন্নোতি পাওয়া উপ-পরিদর্শকগণ ফৌজদারি অপরাধ তদন্তে মূল ভূমিকা রাখেন এবং এটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে সৃষ্ট। সে আমলে ব্রিটিশ পুলিশ উপ-পরিদর্শকগণ যে উদ্দেশ্য ও শাসনের ধ্যান ধারণা নিয়ে নিয়োগ পেতেন যার মুলে ছিল শাসনের নামে ব্রিটিশ সামাজ্যবাদ টিকিয়ে রাখা ও দমন তা একরকম পরিবর্তন ছাড়াই আমাদের মত দেশগুলোতে ভিন্ন উদ্দেশ্য সাধনে সফলভাবেই চালু আছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের নতুন বিধান অনুযায়ী পুলিশের উপর অপরাধ আমলে নেয়া ও তদন্ত করার ক্ষমতা ন্যস্ত হওয়ার কারণে যিনি কনস্টেবল থেকে পদোন্নতি পেয়ে উপ-পরিদর্শক (সব ক্ষেত্রে নয়) হয়েছেন তার বিদ্যা বুদ্ধির দৌড়ের উপর আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে নির্ভর করতে হবে। এই আইনের অপরাধগুলো মূলত দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর উপর প্রয়োগ হবে বিধায় এবং এই শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মত প্রকাশ পুলিশের বিচার বিবেচনার উপর নির্ভর করবে বিধায় পুলিশ কর্মকর্তার শিক্ষা ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা একটি ন্যায্য বিষয়। একটি আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে পুলিশ প্রশাসনের সংস্কার কিংবা প্রশিক্ষণ দাবী করাটাও কোন কাজের হবে না। যদিও সাধারণ জনগণের স্বার্থেই ভিন্ন কারণে পুলিশ প্রশাসনে সংস্কার প্রয়োজন- সে দাবীও ন্যায্য, তবে তা সামগ্রিক অর্থে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের প্রয়োজনে নয়।

গত পর্বে ৫৭ ধারার শাস্তির কঠোর বিধান নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করেছি- এবার একটু ভিন্নভাবে তা উপস্থাপন করছি। ২১ অগাস্টের পূর্বে আই আইন ভঙ্গ করার কারণে ৫৭(২)ধারা মতে শাস্তির বিধান ছিল অনধিক দশ বছর কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত হবেন। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী সেই শাস্তির পরিবর্তন এনে কারাদণ্ডের পরিমাণ অন্যূন ৭ বছর থেকে অনধিক ১৪ বছর এবং এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়। এতটা কঠোর শাস্তির বিধান কেন? কেনইবা এই শাস্তির বিধান। সাইবার অপরাধ হচ্ছে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করাও প্রয়োজন। কিন্তু কোন অপরাধটি সাইবার অপরাধ সেটিতো আগে বুঝতে হবে। ভয়ংকর সব অপরাধের চেয়েও সাইবার অপরাধের শাস্তি এত কঠোর কেন? গত বছরের ২৪ নভেম্বরে তাজরিন গার্মেন্টসে মালিকের শাস্তিযোগ্য অবহেলার কারণে ১১২ শ্রমিক পুড়ে মারা যাওয়ার পরও তার বিরুদ্ধে ৩০৪ক ধারায় মামলা হয় না। কিংবা তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা যায় না- আইনি জটিলতার কারণে। অথচ ফেসবুকে কিংবা ব্লগে কেউ কিছু একটা লিখলেই তা যদি পুলিশের কিংবা অন্য কারো পছন্দ না হয় বা তিনি নীতিভ্রস্ট হন বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হন তাহলে তাকে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়াই গ্রেফতার করে অন্যূন ৭ বছর অনধিক ১৪ বছর জেল খাটানো যাবে। কোন বয়সের ব্যক্তি কি কারণে, কোন মনস্তাত্ত্বিক বিচারে নীতিভ্রষ্ট কিংবা অসৎ হবেন তা নিতান্তই আপেক্ষিক বিষয়। দণ্ডের কঠোরতার কারণে, মিথ্যা মামলা দায়ের করার মাধ্যমে এক অপরকে ফাঁসানোর প্রবণতা যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি সাইবার অপরাধ কমার পরিবর্তে বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। যে কেউ ফেসবুকে অন্যের নামে একটি একাউন্ট খুলে ৫৭ ধারার অন্তরগত কোন বিষয়ে কিছু লিখে পোস্ট করলেই ব্যস। শত্রুকে ঘায়েল করার অব্যর্থ অস্ত্র! ধরতে পারলেই হল- জামিন হবে না। রাজনৈতিক বিচারে সমাজের জন্য হুমকি স্বরূপ মনে করায় যার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে গ্রেফতার করা হয়েছে তাকে জামিন দিয়ে সমাজকে সংকটাপন্ন করে তুলতে কোন বিচারকই চাইবেন না। তাছাড়া, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ক্ষমতার বিপরীতে আইন কখনো শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারে না।

এত গেল কারাদণ্ডের কথা- কিন্তু এক কোটি টাকা অর্থদন্ড কেন? কোন বিচারে? কারাদণ্ডের পাশাপাশি অর্থদণ্ডের বিধানইবা কেন রাখা হয়েছে? আমাদের দণ্ডবিধির অন্তর্গত কিছু কিছু অপরাধের শাস্তির সাথে অর্থদণ্ড রাখার পেছনে ব্রিটিশ শাসকদেরইবা কি যুক্তি বা উদ্দেশ্য ছিল? আমার জানামতে, কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড রাখার পেছনে যুক্তি ছিল- যদি কোন ব্যক্তি বিচার শেষে দোষী সাব্যস্ত হন এবং বিচারক সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় কারাদণ্ড মওকুফ করে কেবল অর্থদণ্ড বহাল রাখেন সেক্ষেত্রে অপরাধী অর্থদণ্ড ভোগ করবেন, অন্যথায় নির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড ভোগ করবেন। ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে আর্থিক সুবিধা আদায়ের মাধ্যমে সামাজিক সাম্যতা বিধানই ছিল এর ভিত্তি। কিন্তু, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা এতটাই অব্যর্থ যে, এতে কারো নির্দোষ প্রমাণ হওয়ার সুযোগই নেই। কেননা, যেহেতু আইনে অপরাধ নির্দিষ্ট নয় তাই এতে মনগড়া যেকোন বিষয়কে বিচারের শেষ পর্যায়ে পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত করে সাজা দেয়া সম্ভব। তাছাড়া, পুলিশ যখন মনে করবে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তখনই তার বিরুদ্ধে অপরাধ আমলে নেয়া হবে, তাই এতে অপরাধ না করার যুক্তি কোন ধোপে টিকবে না। তবে ৫৭ ধারা মতে কেউ যদি অন্য কারো দ্বারা ইন্টারনেটে কিংবা অন্য কোন ইলেক্ট্রনিক বিন্যাসে কিছু প্রকাশ কিংবা সম্প্রচারের কারণে নীতিভ্রস্ট হন বা অসৎ হন তাহলে তিনি কিভাবে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন? মানহানিও এই ধারার অন্তর্গত বিষয়- যেখানে বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে ৫০৫ ও ৫০৫ক ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে- এরূপ ক্ষেত্রে অপরাধী সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৩ ধারা মতে বিদ্যমান আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন এই আইনের বিধান প্রয়োজ্য হবে। আর কেইবা চাইবে এক কোটি টাকা আর ৭ থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ডের সুযোগ না নিয়ে কেবল দুই বছরের বিধান সম্বলিত ধারায় মামলা করতে?

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় যিনি অভিযোগ আনছেন তাকেই অপরাধ প্রমাণ করতে নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে তিনি নিরপরাধ তা প্রমাণ করার বাধ্যবাধকতা নেই। মামলার অভিযোগের সাথে যেসকল বর্ণনায় অভিযোগ আনায়ন কিংবা দালিলিক প্রমাণাদি উপস্থাপন করা হবে, তা কীভাবে হবে তা এই আইনে কোথাও সুস্পষ্ট করে বলা হয় নি। আমার জানা মতে, ডিজিটাল এভিডেন্স হিসেবে যদি কোন তথ্য ওয়েবসাইট থেকে মামলার সাথে সংযুক্ত করতে হয় তাহলে তা হুবহু অনুলিপি রেকর্ড করতে হবে এবং এর একটি কপি অভিযুক্তকেও দিতে হবে। আমার অভিজ্ঞতা বলে- এযাবৎ কালে এধারায় যত মামলা হয়েছে তার কোনটাতেই এ নীতি অনুসরন করা হয়নি। ফলে দালিলিক প্রমাণসমুহের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

এই আইনের ৬৯(৬) ধারা অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল পেশকৃত আবেদনের প্রেক্ষিতে বা নিজ উদ্দ্যেগে কোন পুলিশ কর্মকর্তা বা ক্ষেত্রমত নিয়ন্ত্রণ বা এতদুদ্দেশ্যে নিয়ন্ত্রকের নিকট হতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তাকে এই আইনের অধিনে সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট যে কোন মামলা পুনঃতদন্তের এবং তদকর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিপোর্ট প্রদানের নির্দেশ প্রদান করতে পারবে। এটি ফৌজদারি বিধানে সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধিতে অধিকতর তদন্তের বিধান থাকলেও পুনঃতদন্তের কোন বিধান নেই। সাইবার অপরাধের পুনঃতদন্ত হলে অন্যান্য অপরাধের পুনঃতদন্ত নয় কেন? এই বিধান সংযুক্ত করার ফলে বিচার ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

গত অগাস্টের সংশোধনীর ফলে ৮০ ধারায় আমুল পরিবর্তন এসেছে। পূর্বে অপরাধ আমলে নেয়ার ক্ষেত্রে সেটি প্রকাশ্য স্থানে সংঘটনের বাধ্যবাধকতা ছিল কিন্তু বর্তমানে প্রকাশ্য কিংবা গপনে যেখানেই অপরাধ হোক না কেন, পুলিশ তা আমলে নিতে পারবে। অথচ আমাদের পাশের দেশ ভারতে ৬৬(ক) ধারায় পুলিশকে আপত্তিকর মন্তব্যের জন্য যেকাউকে গ্রেফতার করার বিধান থাকলেও এবছরের শুরুর দিকে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে তা খর্ব করা হয়। বর্তমানে শহর হলে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ আর জেলায় হলে ডেপুটি কমিশনার অভিযোগ আমলে নিতে পারবেন। পরবর্তীতে সেদেশের সুপ্রিম কোর্টও এই নির্দেশের পক্ষে সায় দিয়েছে। কিন্তু, আমাদের দেশে পুলিশের ক্ষমতা আরও বাড়ানো হয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে নাগরিকের জীবনে পুলিশের হস্তক্ষেপ যত কম হয় সেদেশে নাগরিক-অধিকার আরও সুসুংহত হয়। আমাদেরতো কথায় কথায় লাঠির বাড়িই নগদ প্রাপ্তি!

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা ব্যতীত অন্য কোন ধারায় এপর্যন্ত কোন মামলা দায়ের হওয়ার বিষয়ে শোনা যায়নি। সাম্প্রতিক দুটো মামলায় আমার আইনজীবী হিসেবে কাজ করার সুবাদে এর প্রায়োগিক কিছু অসুবিধাও উপলব্ধি করেছি, যেমন- এখন পর্যন্ত এই আইনের অধীনে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে বলে জানা যায় নি। মাঝে একবার সংবাদপত্রে এ নিয়ে রিপোর্ট পড়লেও বাস্তবে এর অস্তিত্ব এখনো দেখা যায় নি। মহানগর দায়রা জজ এই আইনের বিধান মতে বিচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু তাকে সাইবার অপরাধের বিচার চালানোর জন্য কোন আলাদা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। সাইবার অপরাধ বিষয়টিই যেখানে নতুন সেখানে এর বিভিন্ন দিক নিয়ে অস্পষ্টতা কিংবা বিভ্রান্তি থাকা খুবই স্বাভাবিক। আমাদের দেশে যে বয়সে একজন বিচারক “জেলা জজ” হন তাঁরা সবাই তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করেন কিংবা এই বিষয়ে সব কিছু জানেন, এমনটি ভাবার কোন কারন নেই। দু’একজন ব্যতিক্রম হয়ত থাকতে পারে। এত গেল বিচারকের কথা, আমাদের আইনজীবীদের মধ্যে কত পারসেন্ট তথ্য প্রজুক্তি ব্যবহার করেন কিংবা বোঝেন? তাঁদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাইবা কে করবেন? বার কাউন্সিল হয়ত এ ব্যাপারে ভাবতে পারেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত সেরকম কিছু নেই। এর ফলে দেখা যাচ্ছে, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হচ্ছে তিনি সঠিক আইনি সহায়তা ও বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা কোন অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা আমাদের সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদের বিধান মতে, অর্থাৎ “রাষ্ট্র এই ভাগের কোন বিধানের সহিত অসমঞ্জস কোন আইন প্রণয়ন করিবেন না এবং অনুরুপ কোন আইন প্রণীত হইলে তাহা এই ভাগের বিধানের সহিত যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ ততখানি বাতিল হইয়া যাইবে।” আমাদের প্রাগ-ঐতিহাসিক ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থারই যেখানে আমুল পরিবর্তন ও সংস্কার দরকার সেখানে আরও একটি নিবর্তনমূলক আইন আমাদের নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে। বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির কল্যাণে এমনিতেই শাসক ও শাসিত এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে দূরত্ব প্রকট- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন সেই দূরত্ব বাড়াতে রসদ যোগাবে। তাই এই আইনের সংস্কার নয় বাতিল করাই হবে একমাত্র সমাধান। একটি আইনে যে পরিমাণ ভুল সন্নিবেশিত হয়েছে তা ঠিক করতে গেলে “ঠগ বাছতে গাঁ উজাড়” হবার জোগাড় হবে।

[বণিক বার্তায় প্রকাশিত]

Leave a Reply