অপহরণ ও জন-উদ্বেগ

Spread the love

বাংলাদেশে অপহরণ, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা যে এক অভূতপূর্ব অবস্থায় উপনীত হয়েছে, তা অস্বীকার করার আর কোনো উপায় নেই। কয়েক বছর ধরেই আমরা তা প্রত্যক্ষ করেছি এবং এ বিষয়ে সচেতন মানুষ ও দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো বারবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছে; এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় কী, সে বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে এগুলোকে কখনো অস্বীকার করা হয়েছে, কখনো বা এর সপক্ষে সাফাই গাওয়া হয়েছে।

অপহরণের ঘটনাবলি যে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা মঙ্গলবারের প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় চোখ রাখলেই বোঝা যায়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সূত্রে আমরা জানতে পারি যে ২০১০ থেকে ২০১৩ সালে মোট ২২৯ জন ব্যক্তি অপহূত হয়েছিলেন, আর এই বছরে চার মাস না পেরোতে সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩, যা ২০১০ সালের সারা বছরের চেয়েও বেশি। আমার মনে হয় না এই সংখ্যাগুলো সম্পূর্ণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানবাধিকার সংগঠনগুলো নির্ভর করে গণমাধ্যমের রিপোর্টের ওপরে এবং দেশের অনেক খবরের মতো অপহরণের খবরও সবগুলো গণমাধ্যমে এসে পৌঁছায় না।

কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা হলো আমরা তো কতগুলো সংখ্যা নিয়ে কথা বলছি না; আমরা কতগুলো মানুষের কথা বলছি, তাঁদের পরিবারের কথা বলছি, তাঁদের স্বজন-সন্তানদের কথা বলছি। আমার-আপনার কাছে যা কেবলই একটি পরিসংখ্যান, তা কারও জন্য জীবন-মরণের বিষয়, কারও কাছে জীবন বদলে দেওয়ার ঘটনা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সাল থেকে এ বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত যে ২৬৮ জন অপহূত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে ২৪ জনকে অপহরণকারীরা ছেড়ে দিয়েছে; ১৪ জনকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে এবং ৪৩ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। বাকি ১৮৭ জনের কোনো সংবাদ মেলেনি। আপনি একবার ভেবে দেখুন যে আপনি সেই ২১১টি পরিবারের সদস্য, যাঁদের মৃতদেহ পাওয়া গেছে কিংবা এখনো নিখোঁজ। ভেবে দেখুন, আপনার পরিবারের একজন যদি তাঁদের কেউ হন, তবে এগুলো আপনার কাছে কেবল পরিসংখ্যান মনে হবে কি না।

আমাদের এটাও মনে রাখা দরকার যে এসব ঘটনার প্রভাব কেবল যে পরিবারের ওপরেই পড়ে, তা তো নয়, এসবের প্রভাব তার চেয়েও বেশি। বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী আচিন ভানায়িক বলেছেন, যেকোনো ভায়োলেন্স আসলে একধরনের থিয়েটার; থিয়েটার এই অর্থে যে এই ভায়োলেন্সের প্রত্যক্ষ শিকার যিনি হলেন, তিনিই কেবল এর শিকার নন এবং তিনিই ভায়োলেন্সের একমাত্র লক্ষ্যবস্তু নন। যাঁরা একে প্রত্যক্ষ করলেন, তাঁরাও এর শিকার। এর মাধ্যমে অন্যদেরও তাঁদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে জানান দেওয়া হয়। প্রতিটি সহিংসতার ঘটনাই একটি বার্তা। নারায়ণগঞ্জে সাতজনের অপহরণের ঘটনার পর সোমবার সেখানকার যে অবস্থা পত্রপত্রিকায় বর্ণনা করা হয়েছে, তাতে এক আতঙ্কিত জনপদের চেহারাই ফুটে উঠেছে। সহিংসতার আসল কাজই হচ্ছে আতঙ্ক তৈরি করা। সেই সহিংসতা হরতালের নামে ট্রেনে আগুন দিয়েই হোক, কোনো জনপদে বাড়িতে বাড়িতে হামলা চালিয়েই হোক, সংখ্যালঘুর উপাসনালয়ে আগুন জ্বালিয়েই হোক, কিংবা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করেই হোক। ব্যক্তি বা দল বা রাষ্ট্র যে-ই করুক না কেন, আসল লক্ষ্য হলো মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলা, ভীত মানুষেরা দুর্বল হয়। ভীত মানুষেরা নীরবে অন্যায়কে মেনে নেয় আর তা স্থিতাবস্থার অনুকূলেই যায়। ইতিহাসের দিকে তাকালেই তার অসংখ্য উদাহরণ পাওয়া যাবে। যে দেশে, যে সমাজে ভয়ের আবহ তৈরি করা গেছে, সেখানেই আমরা দেখেছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার মানুষের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। অন্যায়কারীদের বিজয় সেখানেই।

দেশে অপহরণ ও গুম এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যে সরকারের একজন শীর্ষস্থানীয় নীতিনির্ধারক এবং সরকারি দলের উপদেষ্টা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, ‘গুম ও অপহরণ সীমা অতিক্রম করেছে।’ কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এমনকি অগণতান্ত্রিক দেশেও গুম ও অপহরণের কোনো গ্রহণযোগ্য মাত্রা নেই বা থাকতে পারে না। প্রথম যে গুমের বা অপহরণের ঘটনা ঘটেছিল, সেটা যেই সরকারের আমলেই ঘটুক না কেন, সেদিনই আসলে সীমা অতিক্রান্ত হয়েছে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সেটা নিশ্চয় জানেন। আওয়ামী লীগের নেতা গুমের কোনো সহনীয় সীমা নির্ধারণ করতে চান কি না, সেটা আমার কাছে বোধগম্য নয়। বিপরীতক্রমে, আমরা একে কেবলই কথার কথা বলে এড়িয়ে যাব কি না, সেটা যার যার নিজস্ব বিবেচনার বিষয়। একসময় গুমের ঘটনাকে সাজানো বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা হয়েছে। ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য বিএনপি-জামায়াত যে ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে, এটা তারই অংশ।’

নিকট অতীতেই আমরা একজন মন্ত্রীকে বলতে শুনেছি যে তথাকথিত ক্রসফায়ার গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং সন্ত্রাস নির্মূলের জন্য ক্রসফায়ারের কিছুটা প্রয়োজন আছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘দেশে ক্রসফায়ারে খুবই কম মানুষ মারা যাচ্ছে। বেশির ভাগই মারা যাচ্ছে বন্দুকযুদ্ধে। যারা মারা যাচ্ছে, তারা মূলত পলাতক আসামি। গ্রেপ্তারের সময়ই তারা বন্দুকযুদ্ধে মারা যায়। এগুলো ক্রসফায়ার নয়।’ এই কথা থেকে এমন মনে হওয়া বিচিত্র নয় যে কম মানুষ মারা গেলে সেটা গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত। এসব কথাবার্তা আসলে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেয়। একধরনের আইনবহির্ভূত আচরণকেই উসকে দেয়, তাকে স্বাভাবিক ঘটনা বলে প্রতিপন্ন করে।

শুধু যে সরকারের মন্ত্রী বা দলের নেতারাই এ ধরনের কথা বলছেন তা নয়, শুধু যে তাঁদের আচরণের মধ্যেই আইনবহির্ভূত ব্যবস্থাকে গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে, তা নয়। যাঁরা কোনো অপহরণের পর অপহূত ব্যক্তি বা তাঁদের পরিবারের ঠিকুজি নিয়ে তাঁদের ‘অপরাধের’ তালিকা তৈরি করার চেষ্টা করেন, তাঁরাও কার্যত অপহরণ, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেন। কেউই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন, কিন্তু কোনো ব্যক্তির সমালোচনার আড়ালে আইনবহির্ভূত কার্যকলাপকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টাকে আর যা-ই হোক, গণতান্ত্রিক বা আইনের শাসনের অনুকূল বলে বিবেচনা করা যায় না।
কয়েক বছর ধরে গুম ও অপহরণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পরও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তদন্তের কোনো লক্ষণ যে দেখা যায়নি, সেটা খুবই উদ্বেগজনক। কেন, কারা, কী উদ্দেশ্যে অপহরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে, তা নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এই কথার সঙ্গে দ্বিমতের অবকাশ নেই যে, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক “দেখি নাই”, “জানি না”, “বুঝি না”—এগুলো বললে চলবে না। এটা কোনোভাবে আইনি শাসন নয়। এর পেছনে যারা আছে, তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।’ কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেটা করার জন্য দেশের নাগরিকদের আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে। ২০০৯ সালের আগেও গুমের ঘটনা আছে, অপহরণের ঘটনা আছে। কিন্তু ২০১০ সাল থেকে এসব ঘটনার ব্যাপক বৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও কী করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘জানি না’, ‘দেখি নাই’ বলে পার পাচ্ছে, তার ব্যাখ্যা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দেননি। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুমের সঙ্গে র‌্যাব ও অন্যান্য বাহিনীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ দেশের ও দেশের বাইরের মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রায়ই করে থাকে। কিন্তু সেসব বিষয়ে সরকারের টনক নড়ে না।

সরকারের অনীহার পাশাপাশি প্রশ্ন ওঠে দেশের মানবাধিকার কমিশন নিয়েও। মনে পড়ে, ২০১১ সালে কমিশনের প্রধান ড. মিজানুর রহমান এই রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে কমিশন এক বা একাধিক গুমের ঘটনাকে বেছে নিয়ে তদন্ত করবে। সে প্রতিশ্রুতির পর প্রায় তিন বছর পার হয়েছে, কিন্তু এখনো সে রকম কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। কমিশনের কার্যকলাপের ইতিহাস এমন আশা তৈরি করে না যে ভবিষ্যতে সেই রকম কিছু তারা করতে পারবে। কিন্তু দেশের নাগরিক সমাজের সদস্যরা কি নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে তদন্ত করার চেষ্টা করতে পারেন? অন্তত একটা-দুটো অপহরণের বা গুমের ঘটনার ক্ষেত্রে? রহস্যের জাল ছিন্ন করতে না পারুন, সুতা টান দিয়ে দেখুন কত দূর যায়।

প্রথম আলো, এপ্রিল ৩০ এ প্রকাশিত

Leave a Reply