ফাঁকা মাঠে গোল ও বর্তমান অবস্থা

Spread the love

লেখার কেন এমন শিরোনাম দিচ্ছি, সেটা নিয়েই শুরুতে একটু ব্যাখ্যা দিতে চাই। প্রধানমন্ত্রী শনিবার বিজয় দিবস উপলক্ষে তার দল আওয়ামী লীগের এক আলোচনায় বলেছেন, খালি মাঠ গোল তো হবেই। বিএনপি নির্বাচনে আসেনি বলেই তার দল ও জোট ৩০০ আসনের জাতীয় সংসদের ১৫৪টি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। আমার লেখার বিষয়বস্তু ঠিক ওই প্রশ্নের জবাবদানের জন্য নয়। বরং দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করেই কিছু কথা বলার প্রয়োজন মনে করছি।

আওয়ামী লীগ নামের দলটি সাড়ে ছয় দশক আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দলটি তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ উভয় আমলে কোনো সময়েই দলটি প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। সবসময় তাদের উপস্থিতি নজরে পড়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই দলটি বেশিরভাগ সময় থেকেছে বিরোধী দলে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা তাদের হাতেই এবং এ জন্য তারা দেশবাসীকে প্রস্তুত করতে পেরেছিল পুরোপুরিভাবে। ১৯৭০-৭১ সালে আমাদের এই ভূখণ্ডের প্রায় সব মানুষকে তারা স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করতে পেরেছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার এ দলটি গঠন করেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে।

কিন্তু স্বাধীনতা অর্জনের পর গত চার দশকে এ দলটি বেশিরভাগ সময় থেকেছে বিরোধী দলে। এ সময়ের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখি, দলটি ক্ষমতায় থাকলে এক চরিত্র এবং বিরোধী দলে থাকাকালে ভিন্ন চরিত্র। ২০০৮ সালে দলটি তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসে এবং টানা ৫ বছর ক্ষমতায় থাকে। এর আগে তারা ১৯৭১ সালে প্রথম সরকার গঠন করে এবং দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করে ১৯৯৬ সালে। আগেও লক্ষ্য করেছি এবং এবারে লক্ষ্য করছি আরও প্রকটভাবে_ আওয়ামী লীগ যেন আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশের একটি ডকট্রিন আঁকড়ে ধরেছে। এর সার কথা হলো_ যদি তুমি আমার সঙ্গে না থাক এবং আমার সব কাজ পুরোপুরি সমর্থন না করো, তাহলে তুমি আমার শত্রুর দলে। কেবল এখানেই তারা থেমে থাকেনি, যারা পক্ষে নয় তাদের রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে প্রয়োজনে হেনস্তা-হয়রানিও করা হচ্ছে। রাষ্ট্রযন্ত্র পক্ষে থাকার কারণেই হয়তো এটা এভাবে সম্ভব হচ্ছে। এভাবে বিরোধী মত দমিয়ে রাখার চেষ্টা অতীতে এ দলটি তেমনভাবে করেছে বলে মনে পড়ে না।

আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলে বড় বড় আন্দোলন সংগঠিত করেছে, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেটা আমাদের স্মরণ করতে তেমন বেগ পেতে হয় না। তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। বড় বড় জমায়েত করেছে। হরতাল-অবরোধে গিয়েছে। নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। সামরিক শাসকদের চ্যালেঞ্জ করেছে। নির্যাতন সহ্য করেছে; কিন্তু গণতন্ত্রের পক্ষে ছিল অবিচল।

১৯৮১ সালের সামরিক শাসন জারির সময়টা অবশ্য ব্যতিক্রম। সে সময়ে একটি নির্বাচিত সরকারকে বলপ্রয়োগে উচ্ছেদ করে এইচএম এরশাদ ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এ অভ্যুত্থানের সময় বলতে গেলে আওয়ামী লীগ নীরব ছিল। কিন্তু পরে তারা অবস্থান পরিবর্তন করে। প্রথমে তারা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে সমর্থন দেয় এবং পরে বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলে। আশির দশকের এ আন্দোলনের একটি প্রধান দিক হচ্ছে ,দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ। এর মাধ্যমে তারা সরাসরি সামরিক শাসনের অবসান ঘটাতে সক্ষম হয়।

ওই সময়ে আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হচ্ছে, বড় দুটি দল একত্র থাকলে সামরিক বাহিনীকে রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ থেকে সরে যেতে হয়। তারা একজোট থেকে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এইচএম এরশাদকে ক্ষমতাচ্যুত এবং অবাধ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ সুগম করে। কিন্তু এরপর বিএনপি সঠিক পথে চলেনি বলেই ১৯৯৪ সালে মাগুরার উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি হয়। এতেও তারা থেমে থাকেনি। তারা ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফাভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। আমরা বলতে পারি, তারাও ফাঁকা মাঠে গোল দিয়েছিল। কিন্তু জনগণ তা মেনে নেয়নি। এ সময়ে আওয়ামী লীগ সঠিকভাবেই রাজপথে সক্রিয় ছিল এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করে নিয়ে একই বছরের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে।

কিন্তু স্বাধীনতার পর যেমন_ ১৯৯৬ সালেও দেখা গেল দলটি ক্ষমতায় থাকলে চরিত্র অনেক বদলে যায়। ২০০৮ সালের পরও সেটাই দেখছি। এর কারণ কী, সেটা সমাজবিজ্ঞানীরা ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। কিন্তু সাদা চোখে আমার কয়েকটি বিষয় মনে হয় এবং এখানে সেটাই বলছি। প্রথমত, দলে গণতন্ত্র চর্চার প্রকট অভাব। আমাদের প্রধান দলগুলোর প্রতিটিতেই এ অবস্থা। আওয়ামী লীগের প্রধান পদে কে থাকবেন, সেটা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নির্ধারিত হয়ে আছে। সাধারণ সম্পাদক পদে তারই পছন্দের কেউ এসে যান। যদি ধরেও নিই যে, এ দুটি পদে দলের সবার পছন্দের সাধারণ মিল রয়েছে এবং সেটা সর্বসম্মত হতে পারে। কিন্তু অন্য পদগুলোতে দেখা যায়, দলের প্রধান ও সাধারণ সম্পাদকের ওপরে কাউন্সিল থেকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রশ্ন হতেই পারে_ এত বড় দলে এতগুলো পদে কেবলই শীর্ষ পর্যায় থেকে যাদের বাছাই করে দেওয়া হয়, তার বাইরে আর কোনো প্রার্থী নেই? এই দলের গঠনতন্ত্রে কোথাও হাত তুলে নির্বাচনের কথা নেই। কিন্তু বছরের পর বছর সেটাই ঘটতে দেখছি। এমনকি দলের কাউন্সিলে নীতি ও কর্মকৌশল নিয়ে আলোচনা হতেও আমরা দেখি না।
দলের আয়-ব্যয় নিয়েও কাউন্সিলে কোনো আলোচনা হয় না। এ সমস্যা বিএনপিসহ অন্যান্য দলেও প্রকট। এ ক্ষেত্রে কে আগে এবং কে পেছনে, সেটা বলা যায় না। তবে বলা যায়, কেউই স্বচ্ছতায় উৎসাহী নয়।

দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কী হবে, সেটাও দলের কর্মী-সমর্থকদের মতামতের ওপর নির্ভর করে না। পশ্চিমা গণতন্ত্রে এর ব্যবস্থা রয়েছে এবং সেটাকেই আমরা গণতন্ত্রসম্মত বলে মানি। কিন্তু বাংলাদেশে তেমনটি ঘটে না। আমরা দেখি, দলে হঠাৎ করেই ক্ষমতাবান দ্বিতীয় ব্যক্তির উত্থান, যারা এমনকি বেশিদিন দলের সাধারণ সদস্যও ছিলেন না। তাদের আন্দোলনের মাঠে থাকতে হয় না, সাংগঠনিক কাজে অংশ নিতে হয় না। শীর্ষ নেতার আশীর্বাদেই নেতৃত্ব পেয়ে যান। এখন বর্তমান সরকারি দল যে কঠিন সময় অতিক্রম করছে, তার পেছনে নেতৃত্ব নির্বাচনে এ ধরনের নীতি অনুসরণের ভূমিকা কাজ করছে বলেই আমার ধারণা। এখন আমরা দেখছি, দলের নীতি ও কর্মসূচি নির্বাচনে এমনকি কেন্দ্রীয় নেতাদের চেয়েও উপদেষ্টাদের ভূমিকা বেশি। এসব উপদেষ্টার কেউ সক্রিয়ভাবে আওয়ামী লীগ করেননি। কেউ হয়তো ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগে সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু পরের জীবন কেবলই পেশাজীবী বা আমলার। এখন সব ব্যাপারেই তারা সর্বেসর্বা। তাদের দাপট নানাভাবে দৃশ্যমান। তারা একাধিক বিষয়ে সরকারি দলকে সমস্যায় ফেলেছেন। এমনকি জনপ্রিয়তার ওপরেও তার প্রভাব আমরা লক্ষ্য করছি। পদ্মা সেতু, শেয়ারবাজার, হলমার্ক স্ক্যাম, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন_ এ ধরনের আরও কয়েকটি বড় বড় ইস্যুর কথা আমরা এ প্রসঙ্গে বলতে পারি।

দ্বিতীয় একটি কারণ বলব_ ক্ষমতায় সাবেক ব্যর্থ-বাম রাজনীতিকদের উপস্থিতি। তারা নিজ নিজ দলকে এগিয়ে নিতে সফল হননি। জনগণের কাছাকাছি পেঁৗছাতে পারেননি। মনমানসে তারা স্তালিনবাদী। তারা গণতন্ত্র নিয়ে তেমন উদ্বিগ্ন মনে হয় না। এখন সরকারি জোটের উচ্চ পর্যায়ে থেকে নিজেদের ধ্যান-ধারণা প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন।

তৃতীয় আরেকটি বিষয় বলব_ রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী মহলের আঁতাত। গত কয়েকদিন ধরে ক্ষমতাসীন জোটের অনেক নেতার সম্পদের পরিমাণ নিয়ে সংবাদপত্রে প্রতিবেদন দেখছি। ক্ষমতায় থাকা মানেই নিজের ও পরিবারের সম্পদ অনেক অনেক বেড়ে যাওয়া। ক্ষমতা মানেই অঢেল সুযোগ। তারা কখনোই শীর্ষ নেতার কোনো কাজের ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেন না। এমনকি চোখের সামনে মন্দ কিছু ঘটতে দেখলেও আপত্তি করেন না। এর প্রধান কারণ নিজেদের ট্রাক রেকর্ড। তাদের প্রত্যেকের ‘ফাইল’ থাকে শীর্ষ পর্যায়ের নজরে। যখনই ভিন্ন মত প্রকাশ করবেন, ফাইল নিয়ে টানাটানি শুরু হবে এবং তাতে মন্দ পরিণতি হতেই পারে। তার চেয়ে যেমন আছি ভালোই আছি, কী দরকার ঝামেলায় গিয়ে_ এমন অবস্থানই শ্রেয়।

ক্ষমতায় থাকার সময়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা উপেক্ষিত হন_ এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তারা জনগণের কাছাকাছি থাকেন। রাজপথে নামার যখন প্রয়োজন পড়ে, ঝাঁপিয়ে পড়েন দ্বিধাহীন চিত্তে। নির্যাতন ভোগ করেন। দলের নীতি-আদর্শ প্রচার করেন। দলকে ভুল করতে দেখলে নানাভাবে নিজের মত ব্যক্ত করতে থাকেন। ক্ষমতাসীন অবস্থায় যারা উপদেষ্টা হয়ে আসেন, তাদের অনেকেই এই বিশাল কর্মী-সমর্থক বাহিনীর মনমেজাজের খবর রাখেন না।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে_ উত্তরণের পথ কী? যে ধরনের নির্বাচন হচ্ছে সেটা কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। আওয়ামী লীগের তৃণমূলের কাছে তো হবেই না। তারা ভোটের পার্টি। নির্বাচনী মাঠে তারা লড়তে চায়। এখন যে নির্বাচন হচ্ছে, সেটা শেষ না হতেই একাদশ সংসদ নিবাচনের কথা বলা হচ্ছে। আজ, কাল বা পরশু এটা হবেই। আওয়ামী লীগকে অবশ্যই জনগণের কাছে যেতে হবে। তাদের রায় নিতে হবে। তাহলে কেন ফাঁকা মাঠের এ আয়োজন? ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। সেখানের জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি। যারা নির্বাচিত হয়েছে তারা বলবেন, প্রতিদ্বন্দ্বী নেই, তো কী করব। কিন্তু যদি ‘না’ ভোট প্রদানের বিধান থাকত, তাহলে বোঝা যেত তাদের গ্রহণযোগ্যতা। অন্য কথায় এই ১৫৪ জন জনগণের ভোটে নয়, একটি নীতির কারণে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু তাদেরও তো এক সময়ে সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে শামিল হতে হবে। তখন কী জবাব দেবেন? এখন যে অস্থির ও সহিংস পরিস্থিতি, সেটা কেন হলো_ তারই-বা কী ব্যাখ্যা দেবেন? এর দায় কি উপদেষ্টা কিংবা ব্যর্থ-বামেরা অথবা ব্যবসায়ী-রাজনীতিকরা নেবেন?

অনেকে বলেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। কিন্তু আমি বলব_ রাজনীতিতে জনগণই শেষ কথা। জনগণ ভুল করতে পারে। কিন্তু কেন তারা ভুল করল সেটা খতিয়ে দেখতে হবে রাজনীতিকদেরই এবং তাদের সঠিক পথে আনার জন্য উপযুক্ত কর্মপন্থা তৈরি করতে হবে। এ জন্য পরিশ্রম করতে হবে। জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার কোনোভাবেই কেড়ে নেওয়া যায় না। এটা ঘটলে গণতন্ত্র থাকে না। আর গণতন্ত্র না থাকলে সমাজে নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, যা রাজনীতিকদের কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

23 December 2013

সমকালের প্রকাশিত

Leave a Reply