মোদি ও বিজেপির রাজনৈতিক উত্থান: ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের রাজনৈতিক লাভক্ষতি বিশ্লেষণ

Spread the love

১৬ মে ২০১৪ তারিখে ভারতের রাজনীতিতে যেন একটি বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়ে গেল। যদিও বিজেপির বিজয় ও কংগ্রেসের পরাজয় অনুমিত ছিল, কিন্তু বিজেপির এতটা ভূমিধ্বস বিজয় সম্ভবত কট্টর বিজেপি সমর্থকেরও কল্পনার বাইরে ছিল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বিজেপি কেবল জিতেছে তাই নয় বরং ১৯৮৪ সালের পর এই প্রথমবার কোন রাজনৈতিক দল হিসেবে বিজেপি একক-সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দিল্লীর সরকার গঠন করতে চলেছে। বিজেপির এই উত্থান ভারতের রাজনীতির বহু হিসেব-নিকেশ উল্টে দিয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে এবং আরও স্পষ্ট করে বললে ভূ-রাজনৈতিক কারণে ভারতের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে পড়া অবশ্যম্ভাবী। বিজেপি ও নরেদ্র মোদীর উত্থানকে তাই সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ ও সঠিক বিশ্লেষণ করাটা জরুরি।

ভারতের সুযোগ

ভারতে গত দুই দশক ধরে আঞ্চলিক দলগুলোর প্রতিপত্তি ক্রমাগত বেড়েই চলছিল। বিপরীত দিকে কেন্দ্রীয় দলগুলোর প্রভাব ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছিল। এই বিপরীতমূখী ধারা ভারতের রাষ্ট্র ও সমাজ কাঠামোয় এক অভূতপূর্ব ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল যেখানে কেন্দ্র দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও আঞ্চলিক দলগুলোর মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ছিল। এটি রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছিল। আঞ্চলিক দলগুলোর এই শক্তি সঞ্চয়ের ধারা অব্যাহত থাকলে নিশ্চিতভাবে তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতিও এক সময় হুমকি হয়ে দেখা দিত। গত এক দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন পরাশক্তি যেভাবে ভারতের আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছিল তাতে স্পষ্ট যে ভারতের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে মেরুকরণ ঘটছিল। নরেদ্র মোদীর হাত ধরে বিজেপির বিজয় এবং প্রকারান্তরে দলটির সর্বভারতীয় দল হয়ে ওঠা তাই ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থের পন্থী। একটি শক্তিশালী সর্বভারতীয় দলের উত্থান তাই ভারতের রাষ্ট্রীয় সংহতির জন্য সুখবর। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর সীমাহীন দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়নের এই সময়ে দেশে দেশে যেখানে চরমপন্থী মতবাদগুলো ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করছে, ধর্মীয় পরিচয়-ধারী দলগুলো উন্নত-অনুন্নত দেশ নির্বিশেষে ক্ষমতার লড়াইয়ে ফিরে আসছে, সেখানে ”হিন্দু ভারতের” শ্লোগান ১০০ কোটি হিন্দু জনগোষ্ঠীর দেশে অনেক বেশি আবেদনময়ী হিসেবে আবির্ভুত হবে সেটিই হয়তো স্বাভাবিক! নিশ্চিতভাবেই হিন্দুত্বের শ্লোগানই বিজেপির সর্বভারতীয় হয়ে উঠার বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।  ভারতের পক্ষে এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোতে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখার সুযোগ এসেছে। আঞ্চলিক দলগুলো কেন্দ্রকে যথেচ্ছভাবে এখন আর ব্ল্যাকমেইল করতে পারবে না। এগুলো যদি সম্ভাবনার কথা হয়, তবে বিজেপির বিজয়ের আশংকাও রয়েছে।

বিজেপির বিজয় ও ভারতের আশংকা

নরেদ্র মোদীর বিজয়কে যদিও অনেকে উন্নয়ন, সুশাসনের পক্ষে ও দুর্নীতির বিপক্ষে জনগণের আকাঙ্ক্ষার জয় বলে দাবি করলেও সমগ্র বিষয়টি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। প্রথমত নরেদ্র মোদী ও তার তথাকথিত গুজরাট মডেল এই বিজয়ের আপাতঃ নিয়ামক মনে হলেও এটি যে দল হিসেবে বিজেপির মূল এজেন্ডা নয় সেটি সময়ই বলে দেবে। নরেদ্র মোদির মূল এজেন্ডা কারা নির্ধারণ করে? অবশ্যই বিজেপি। বিজেপির রাজনৈতিক ব্যাকবোন কারা? শিবসেনা, আরএসএস, বজরং দলের মতো সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। তথাপি, বিজেপি ও তার জোট এই নির্বাচনে সাকুল্যে ৩১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার এই সরকারকে ভোট দেয়নি। সুতরাং আপাতঃদৃষ্টিতে বিজেপির সাফল্যের অন্যতম নিয়ামক ছিল বিরোধী ভোটকে বিভক্ত রাখতে পারা। দল হিসেবে বিজেপির একটি নিজস্ব সাম্প্রদায়িক ভোট-ব্যাংক রয়েছে। কিন্তু সেটি জয়ের জন্য মোটেই যথেষ্ট ছিল না। আবার সাম্প্রদায়িক বিভাজনে ভোট চাইলে সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী সবাই একজোট হয়ে যাওয়াটাও অস্বাভাবিক ছিল না। এক্ষেত্রে বিজেপির মোক্ষম বিষয়কে সামনে নিয়ে এসে তার সাম্প্রদায়িকতার কালো দিক ঢেকে দিতে চেয়েছে এবং সাফল্যজনকভাবে পেরেছেও। তারা উন্নয়ন ও ব্যক্তি নরেদ্র মোদীকে সামনে রেখে ভোট চেয়েছে। মোদিকে সামনে রেখে নিজেদের মুখোশ ঢেকে রাখলেও শিবসেনা, আরএসএস, বজরং দল এরাই মূলত এই ভোটের মূল বিজয়ী। এই সংগঠনগুলো চরম মৌলবাদী এবং সাম্প্রদায়িক। তারা “হিন্দুত্ববাদী ভারতের” স্বপ্ন দেখে। সারা ভারতেই এই চরমপন্থী গ্রুপগুলোর সংগঠন রয়েছে। এরাই সারা ভারতে মোদী ও গুজরাট মডেলকে ব্র্যান্ড হিসেবে উপস্থাপন করে তৃণমূল ভোটারদেরকে সংগঠিত করেছে। নরেদ্র মোদী নতুন কোন কর্মী-বাহিনী গড়ে তুলেন নি যারা “মোদী সরকার” এর জন্য ভোট চাইবে। মোদীর ভোট বাক্স পূরণে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে তারা এই বিজেপি, শিবসেনা, আরএসএস, এবং বজরং দলেরই তৃণমূলের কর্মী-বাহিনী। নরেদ্র মোদী ও গুজরাট মডেল এই চরমপন্থী দলগুলোর সাম্প্রদায়িকতা চরিত্রে উন্নয়নের মুখোশ মাত্র। এ গোষ্ঠীর ক্ষমতায় আরোহনই ভারতে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদীর পক্ষে এই রাজনৈতিক ব্যাকবোনের বাইরে চিন্তা করা অত্যন্ত কঠিন, যদিও অসম্ভব নয়। সেজন্য একদিকে সর্বভারতীয় দল হিসেবে বিজেপির উত্থান ভারতের জাতীয় সংহতির জন্য আপাত কল্যাণকর হলেও, সাম্প্রদায়িকতার যে দৈত্যের ঘাড়ে চেপে নরেদ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন সেটিকে যদি তিনি বোতল বন্দী করে রাখার মতো প্রায় অসম্ভব কাজটি করতে না পারেন এই সম্ভাবনাগুলো সমূহ আশংকায় পর্যবসিত হতে পারে।

বিজেপির উত্থান এছাড়াও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তির প্রতি এক প্রচণ্ড চপেটাঘাতও। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে চরমপন্থী শক্তি হিসেবে নিজের উত্থানকে ও বর্হিবিশ্বে ঠেকানোও তাই ভারতের জন্য এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের আশংকা

আপাতঃদৃষ্টিতে ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য সরাসরি লাভ-ক্ষতির কিছু বয়ে না আনলেও সেখানকার পরিবর্তনের একটি প্রচ্ছন্ন প্রভাব বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে রয়েছে। মোদী ভোটের জন্য বাংলাদেশ-বিরোধী যেসব বাগাড়ম্বরের আশ্রয় নিয়েছিলেন সেগুলোরও একটি রাজনৈতিক পরিণতি থাকবেই। মোদী বলেছিলেন [আরও অনেক বাগাড়ম্বরের মধ্যে] তিনি জিতলে ভারতের মাটিতে থাকা অবৈধ বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের বের করে দেবেন। এটি কি পদ্ধতি, কিভাবে করা হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত না বললেও অথবা এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয় অনেকের এমন দাবী মেনে নিলেও বলতে হবে এ ধরনের রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরের প্রভাব মাঠ পর্যায়ে থেকে যাবেই। এবং মাঠ পর্যায়ে যেসব নেতা-কর্মী এ জাতীয় বাগাড়ম্বর ব্যবহার করে ভোটারদের একটি শ্রেণিকে উদ্বুদ্ধ করেছিলো সেটি রাতারাতি হাওয়া হয়ে যাবে না। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এর ফলে জাতীয় উগ্র-জাতীয়বাদী মনোভাব বৃদ্ধি পাবে এবং তার প্রভাবে একজন বাংলাদেশীকেও যদি জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয় সেটি বাংলাদেশের শাসকদের উপর আভ্যন্তরীণ উগ্র জাতীয়বাদী চাপ সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট। এছাড়া নরেদ্র মোদীর দাঙ্গাবাজ ইতিহাসের যদি সামান্যতমও পুনরাবৃত্তি ঘটে সেটি বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা উস্কে দেবে।

বাংলাদেশের সুযোগ

বাংলাদেশের বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর শীর্ষ-নেতৃত্বের সাথে কংগ্রেসের শীর্ষ-নেতৃত্বের সম্পর্ক অনেকটা পারিবারিক পর্যায়ে ছিল বলে বিভিন্ন দিক থেকে বলা হয়। বিজেপির বিজয়ের ফলে এবং সে ‘বিশেষ’ সম্পর্কের আর কোন প্রভাব ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণে না থাকায় যদিও অনেকে বলছেন বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, সেটি আমার বিবেচনায় আপেক্ষিক এবং বিভিন্ন শর্ত-সাপেক্ষ। বাংলাদেশের যারা দাবি করেছিলেন যে কংগ্রেস সরকার এখানকার শাসকদের টিকিয়ে রেখেছেন আমার বিবেচনায় এখন পরীক্ষাটা তাদেরই। কারণ কংগ্রেস যেহেতু এখন আর ভারতের রাষ্ট্র ক্ষমতায় নেই, বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো এখন সরকারের উপর কতটুকু চাপ সৃষ্টি করে সরকারকে দাবি আদায়ে বাধ্য করতে পারেন সে পরীক্ষাটা এখন তাদেরকেই দিতে হবে। যদি তারা এটি করতে পারে এবং ভারতের পরিবর্তিত নেতৃত্বকে এ চাপ-সৃষ্টির জন্য তাদের পাশে পায় সেটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবাদ নিষ্পত্তির একটি সুযোগ তৈরি করলেও করতে পারে।

এটি কোনভাবে না হলে ভারতের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট থেকে বাংলাদেশের কি কোন কিছুই নেওয়ার সুযোগ নেই? আমি মনে করি রয়েছে। যদি উপরের যাত্রায় ফল নাও আসে সেক্ষেত্রে কংগ্রেসের সাথে এখানকার শাসকগোষ্ঠীর ‘বিশেষ’ সম্পর্কের অজুহাত আর দেওয়া যাবে না। বর্তমান সরকার দীর্ঘমেয়াদে টিকে গেলে প্রমাণিত হবে সমস্যাটা বাংলাদেশের একান্তই নিজস্ব [যেটি আমরা দাবি করে আসছি] এবং এখানকার সামরিক-বেসামরিক মেরুকরণেও আভ্যন্তরীণ সামাজিক-আদর্শিক দ্বন্দ্বই মূখ্য। এহেন পরিস্থিতিতে সরকার নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত টিকে গেলে তাদের জন্য মোদীর সরকারের সাথে আরও ভারসাম্যপূর্ণভাবে দরকষাকষির ক্ষেত্র উন্মুক্ত হবে। এটি সত্য যে কংগ্রেসের সাথে বাংলাদেশের শীর্ষ-নেতৃত্বের তথাকথিত ‘বিশেষ’ সম্পর্কের কারণে তাদের পক্ষে সেই সম্পর্ককে ঝুঁকিগ্রস্ত করে ভারতের সাথে একটি পরিপূর্ণ পেশাদারিত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা কঠিন ছিল। কংগ্রেস ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় সেই ঝুঁকিটি হ্রাস পেয়েছে। শাসকদের পক্ষে এখন অনেক বেশি দরকষাকষি ও পরিপূর্ণ পেশাদার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা তুলনামূলক সহজ হবে। যদিও বাংলাদেশ-ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্ক অপ্রতিসম এবং পারস্পরিক দরকষাকষির ক্ষমতায় ভারত ভূ-রাজনৈতিক কারণেই বাংলাদেশের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে, কিন্তু বাংলাদেশের সাথে একটি পরিপূর্ণ পেশাদার সম্পর্ক ভারতের স্বার্থেই আবশ্যক। ভারতের নিজের হটকারিতা, অবিমৃশ্যকারিতা, এবং পেশাদারিত্বের ঘাটতিতে বাংলাদেশে চীন বা অন্য কোন বড় দেশের কৌশলগত উপস্থিতির সুযোগ তৈরি হলে সে দায়ও ভারতকেই নিতে হবে। চীনের উপস্থিতির কারণেই বাংলাদেশ-ভারতের দরকষাকষির সম্পর্ককে পেশাদারিত্বের মোড়ক দেওয়া বাংলাদেশের পক্ষে খুবই সম্ভব। ভারতে কংগ্রেস সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের বর্তমান শাসকদের পক্ষে সেই ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করার এখনই সময়।

সবমিলিয়ে ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন একেবারেই জিরো-সাম (zero-sum) নয়। এটি একইসাথে ঝুঁকি ও সম্ভাবনা দুটোরই সুযোগ তৈরি করেছে। এ যাত্রায় ভালো ও মন্দ উভয় ফল আসতে পারে। তবে এটি নির্ভর করবে উভয় দেশের শাসকদের প্রজ্ঞা, দূরদৃষ্টিতা, ও পেশাদারিত্বের মনোভাবের উপর।

Leave a Reply