হিংসাশ্রয়ী রাজনীতি জনসমর্থন পায় না

Spread the love

http://www.bangladeshonline24.com/wp-content/uploads/2013/02/Rajshahi-Hartal-10.jpg

 

গত ২২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ঢাকায় ধর্মীয় স্লোগান ও কর্মসূচি নিয়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশ-মিছিল থেকে ইসলাম ধর্মের নবীর (সা.) অসম্মান এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত দেওয়ার প্রতিবাদ করা হয়। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক বায়তুল মোকাররমসহ আরও কয়েকটি মসজিদ থেকে জুমার নামাজ শেষে জঙ্গি মিছিল বের করে এবং পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা উপেক্ষা করে রাজপথে ভাংচুর চালায়। তারা পুলিশের ওপরেও হামলা চালাতে ছিল তৎপর। এ ধরনের প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে এবং আরও বেশ কিছুদিন এর প্রভাব থাকবে বলে ধারণা করা হয়। বিশেষভাবে শুক্রবারে জুমার নামাজের দিনগুলো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে থাকতে পারে।

লক্ষণীয় যে, আগের দিন ২১ ফেব্রুয়ারি ছিল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ দিন বিকেলে রাজধানীর শাহবাগ চত্বরে তরুণ প্রজন্মের আহ্বানে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের কঠোর দণ্ডের দাবিতে বিপুলসংখ্যক লোক সমবেত হয়েছিল। তারা অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের জন্য স্লোগান দেয়। এর বিপরীতে ২২ ফেব্রুয়ারির সমাবেশ ও মিছিলে ধ্বনিত হয় উগ্র ধর্মান্ধদের বিভিন্ন দাবির স্লোগান। যেসব ইসলামী দল এর পেছনে ছিল তারা অভিযোগ করে যে, শাহবাগে সক্রিয় ব্লগারদের কেউ কেউ ইসলাম ধর্মের অবমাননা করে লেখালেখি করছে।

আবার অন্য পক্ষের কেউ কেউ বলছে যে, এ অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। শাহবাগে তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনকে হেয় ও ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে এটা করা হয়েছে। আন্দোলনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য এটা হীন অপচেষ্টা। হ্যাকিং কী এবং কীভাবে তা করা যেতে পারে, সেটা বায়তুল মোকাররম এবং আরও অনেক মসজিদে নামাজের জন্য সমবেত হওয়া মুসলি্লদের জানার কথা নয়। তাদের বোঝানো হয়েছে যে, ব্লগারদের কেউ কেউ ইসলাম ধর্মবিরোধী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে এবং এজন্য দাবি তোলা হয়েছে জড়িতদের কঠোর শাস্তি প্রদানের।

ব্লগে যে লেখার জন্য শাস্তি দাবি করা হচ্ছে তা হঠাৎ দেখা যায়নি। বেশ আগে থেকেই ছিল এবং অনেক লোক তা দেখেছে। কিন্তু এতদিন কেউ সেটা নিয়ে কথা বলেনি। এসব লেখার ওপর একাধিক জনের মন্তব্যও প্রচারিত হয়েছে। এতদিন এগুলোকে কেউ দোষের বলে মনে করেনি। অথচ এখন কিছু লোক বলছে যে, এসব অন্যায় এবং সেটা বিশ্বাস করে আরও কিছু লোক ক্ষিপ্ত হয়ে কেবল প্রতিবাদ নয়, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর মতো কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। কেন এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, সেটা নিয়ে আলোচনা চলছে। সরকারের অবশ্যই দায়িত্ব ছিল। তারা সময়মতো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখায় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারত। তাদের নিজস্ব গণমাধ্যম রয়েছে। বিশেষভাবে বলা যায়, বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের কথা। বহুকাল সরকারের পক্ষে একতরফা প্রচারের কারণে এ দুটি প্রচারমাধ্যমের ওপরে জনগণের খুব একটা আস্থা-ভরসা নেই। যখন যে দল ক্ষমতায়, তারাই এ মাধ্যমের অপব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখন বেসরকারি গণমাধ্যম সংখ্যা অনেক। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংবাদপত্র-টেলিভিশন চ্যানেল-বেতার কেন্দ্র বেসরকারিভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং তাদের ওপর জনগণের আস্থা যথেষ্ট। সরকার বিভ্রান্তি ও অপকৌশল মোকাবেলায় তাদের সহায়তা গ্রহণ করতে পারত।

দেখা গেছে, সরকারের মন্ত্রী ও দায়িত্বশীল কেউ কেউ হ্যাকারদের ওপরে দায় চাপিয়েই নিশ্চিন্ত থাকতে চেয়েছেন। তারা আরও বলেছেন যে, ব্লগ থেকে উস্কানিমূলক বক্তব্য সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে প্রচার করা আইনের লঙ্ঘন এবং এ জন্য কঠোর শাস্তি হতে পারে। এ কাজ জামায়াতে ইসলামীর মতো দলের হয়ে কেউ করতে পারে বলেও বলা হয়। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে জনগণের একাংশের মনে যে সংশয় সৃষ্টি হয়, সেটা দূর করার প্রতি তেমন মনোযোগ দেওয়া হয়নি।

আবার এটাও কেউ কেউ বলতে চাইছেন যে, বাংলাদেশে ব্লগ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সরকার ও প্রধান বিরোধী দল খুব একটা খুশি হয়নি। সামাজিক এ মাধ্যম তাদের অতীত ও বর্তমানের অনেক কাজের সমালোচনা করছে এবং সেটা বিশ্বাসযোগ্যও হচ্ছে। তাদের প্রতিও সন্দেহের আঙুল তোলা হচ্ছে। এভাবে হ্যাকিং করে কে কী ধরনের রাজনৈতিক ফায়দা তোলায় লিপ্ত, সেটা এ মুহূর্তে বলা কঠিন। তবে এর সূত্র ধরে যে ব্যাপক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। আর এর সুযোগ নিয়ে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত দল জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি আরও কয়েকটি ইসলামী দল রাজপথে নেমে এসেছে। তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্যে ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু যে সময়ে এবং যে বক্তব্য নিয়ে তারা মাঠে নেমেছে সেটা সরকারকে চিন্তায় ফেলেছে। শাহবাগের গণজাগরণের সঙ্গে যুক্তদেরও যথেষ্ট সমস্যায় ফেলেছে। অথচ এ প্রজন্মের আন্দোলন ধর্মেরও আন্দোলন। তারা ন্যায়বিচার চাইছে। একাত্তরে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠনে জড়িতদের শাস্তি দাবি করছে। তাদের কর্মকাণ্ড কোনোমতেই ধর্মবিরোধী হতে পারে না।

নতুন প্রজন্মের এ আন্দোলনের প্রতি সমাজের বিভিন্ন অংশের ব্যাপক সমর্থন প্রকাশের পর থেকে তাদের প্রতি একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তির মনোযোগ পড়া স্বাভাবিক। সরকার আন্দোলনকে নিজের দিকে টানার চেষ্টা করছে বলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এ আন্দোলনের কারণে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জামায়াতে ইসলামী অভিযোগ করছে। তারা বলছে, যেহেতু নির্বাচন সামনে এবং কোন ধরনের সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সেটা অনিষ্পন্ন_ এ কারণেই সরকার পরিকল্পিতভাবে এসব করাচ্ছে। আওয়ামী লীগ একতরফাভাবে নির্বাচন করাতে পারে বলেও বিএনপির সন্দেহ। তাদের ধারণা, নির্বাচনী রাজনীতির স্বার্থে সরকার শাহবাগের সেন্টিমেন্ট কাজে লাগাতে পারে।

তরুণ প্রজন্ম কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ে সন্তুষ্ট হয়নি। তারা কেবল জেগে ওঠেনি, বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিয়েছে। তারা মনে করেছে যে ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ঘাটতি রয়েছে। কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। কেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয়নি, সেটা নিয়ে তাদের মনে সন্দেহ জেগেছে যে এর মধ্যে রাজনীতি ঢুকে পড়েনি তো? সামনে রয়েছে সাধারণ নির্বাচন এবং এ সময়ে অনেক হিসাব বিভিন্ন দলের মধ্যে থাকতে পারে। কেউ কেউ মনে করতে পারে যে সরকারি দলের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কোনো আঁতাতের সম্ভাবনা নেই তো?

অপরদিকে তরুণরা মাঠে নেমে পড়ার পর বিএনপি হতচকিত হয়ে যায়। তারা প্রথম থেকেই ধরে নিয়েছে যে এটা আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র। তারা জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাচনে মিত্র হিসেবে রাখতে চায়। কিন্তু সন্দেহ রয়েছে_ এ দলটি আওয়ামী লীগের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নির্বাচনে চলে যাবে না তো? বিএনপি বয়কট করল অথচ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনে গেল_ এমন পরিস্থিতি বিএনপি নেতাদের কাম্য নয়। আশির দশকের মাঝামাঝি এইচএম এরশাদের আমলে তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচনে গিয়েছিল, যদিও বিএনপি বয়কট করেছিল।

এ বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহের দুঃখজনক ঘটনাবলির মধ্য দিয়ে দুটি দল অবশ্য কাছাকাছি চলে এসেছে। বিএনপি শাহবাগের আন্দোলনের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছে এবং জামায়াতে ইসলামীর মিছিল-সমাবেশে পুলিশের হামলায় উল্লেখযোগ্য লোকের মৃত্যুকে ‘গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেছে। জামায়াতে ইসলামীর টানা দুই দিন হরতালের সঙ্গে মিলিয়ে তারা আরও একদিন হরতাল ডেকেছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এই রাজনীতির মধ্যে পড়ে গেছে কি-না। আইন নিজস্ব গতিতে চলবে এবং সেভাবেই রায় হবে_ এটা প্রত্যাশিত। এর পেছনে কারণ খোঁজা অনুচিত। নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে অনিশ্চয়তার সময় যত বিলম্বিত হতে থাকবে, তত এ ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়বে। এটাও মনে রাখতে হবে যে, জঙ্গিপনা দিয়ে কোনো উদ্দেশ্য হাসিল করা যাবে না। জামায়াতে ইসলামী হিংস্র হয়ে উঠছে, এমন অভিমত রয়েছে। তারা অরাজক অবস্থা সৃষ্টি করতে চাইছে। আমরা অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে, কোনো দল চোরাগোপ্তা হামলার পথে গেলে তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নকশাল আন্দোলন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি সত্তরের দশকের শুরুতে তরুণ সমাজের মধ্যে সাড়া জাগাতে পেরেছিল। কিন্তু তাদের শ্রেণী সংগ্রামের নীতি ও কৌশল জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে সরকারের পক্ষে সহজেই তাদের দমন করা সম্ভব হয়। এখনও কোনো দল যদি মনে করে যে, হিংসা ও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে তারা জনগণকে পক্ষে টানতে পারবে, সেটা ভুল ধারণা। নিজের রাজনৈতিক ভিত বাড়াতে হলে জনগণের কাছে যেতে হবে এবং সেজন্য গণতান্ত্রিক পন্থা অনুসরণ করতে হবে। শাহবাগের আন্দোলন থেকে এ জন্য ভালো শিক্ষা গ্রহণ করা যায়। এ আন্দোলনে কোনো সুসংগঠিত শক্তি ছিল না, কিন্তু দ্রুতই জনগণের ব্যাপক সমর্থন পাওয়া যায়।

সবার জন্য আরও একটা সতর্কবার্তা হচ্ছে_ রাজনীতিতে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি থাকলে একাধিক শক্তি তার সুবিধা নিতে পারে। বিশেষ করে সেসব মহল সক্রিয় হবে, যারা আদৌ গণতন্ত্র চায় না।

প্রথম প্রকাশঃ দৈনিক সমকাল, মার্চ ৪, ২০১৩।

ব্যবহৃত ছবির উৎসঃ http://www.bangladeshonline24.com/wp-content/uploads/2013/02/Rajshahi-Hartal-10.jpg

Leave a Reply